আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে যশোরঞ্চলের তাপমাত্রা কমতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।
জানা গেছে ইতোমধ্যে প্রচন্ড গরমের কারণে যশোরঞ্চলের অনেক রাস্তার পিচ উঠে গেছে। আর বিদ্যুৎতের ঘনঘন লোডশেডিং যেন মরার উপর খাড়ার ঘা।
ভুগর্ভস্ত পানির স্তর নামার কারনে খাবার পানি বর্তমানে তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে। চলতি বছরে তাপপ্রবাহ শুরু হওয়ার আগেই এসব এলাকার অধিকাংশ পাম্প ও নলকূপে পানি উঠছে না। সুপেয় ও গৃহস্থালির কাজে পানির সংকটে এসব এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বেশির ভাগ পুকুর ও জলাশয় ভরাট, বহুতল ভবন নির্মাণ ও অপরিকল্পিত সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে ক্রমেই নিচে নামিয়ে দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
যশোরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে গত কয়েক বছর ধরেই। চলতি বছর গরম শুরু হওয়ার আগে ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই পানির স্তর নীচে নামতে শুরু করে। যা চলতি এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে ভয়াবহ রুপ নিয়েছে।
যশোর পৌরসভার পানি বিভাগের সুপারভাইজার ইসাহক হোসেন বলেন, এ বছর পানি পরিস্থিতি অন্যান্য বছরের চেয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সাধারণত পৌরসভা এলাকায় পানির স্তর ২০ ফুটের নিচে নামলে হস্তচালিত নলকূপ থেকে পানি ওঠে না। যদি তা ২২ থেকে ২৩ ফুটের নিচে নেমে যায়, তাহলে বাসাবাড়িতে মোটর (সাধারণ পাম্প) দিয়ে পানি তোলাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ এই মুহূর্তে পৌরসভার স্থিতি ওয়াটার লেভেল রয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ ফুট। যা নিশ্চয় হতাশাজনক।
যশোর পৌরসভায় গভীর উৎপাদন নলকূপ রয়েছে ২৮টি। তারমধ্যে ১০টি রয়েছে ত্রুটিযুক্ত। ত্রুটিযুক্ত এই ১০টি উৎপাদন গভীর নলকূপ পুনঃখনন জরুরি। শহরে ফুল তারা টিউবওয়েল ১৫০টি ও ৫০টি সেমি তারা টিউবওয়েল রয়েছে। আপাতত এসব টিউবওয়েলে পানি উঠলেও সহসা বড় ধরনের বৃষ্টি না হলে সংকট আরও ঘণীভূত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী বিএম কামাল হোসেন বলেন, এই সময়ে প্রতিবছরই পানির ভূগর্ভস্থ স্তর নেমে যায়। এটি সামনে আরও প্রকট হবে বলে তিনি জানান।পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ার কারণে এবছর অনেক আগে থেকেই ভূগর্ভস্থ পানির স্তুর নামতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে বিএডিসি সেচ বিভাগের দেওয়া সেচ পাম্প এলাকায় পানির লেভেল ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ মিটার বলে তিনি জানান। আর এক থেকে দুই মিটার নিচে নেমে গেলে এসব সেচ যন্ত্রে পানি ওঠা দুষ্কর হয়ে পড়বে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, তার সেচের আওতায় এলএলপি গভীর নলকূপ রয়েছে ১২৮টি ও গভীর নলকূপ রয়েছে ১২০টি। তাছাড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে ১৭৮১টি গভীর নলকূপ, ৫০২৬৭ টি অগভীর নলকূপ ও সৌর বিদ্যুৎ চালিত ১৩টি অগভীর নলকূপ। এসব গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি তুলতে কৃষকদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্যমতে, সাধারণত পানির স্তর ২২ থেকে ২৫ ফুটের নিচে নেমে গেলে যশোরের শহর ও গ্রামাঞ্চলে নলকূপে পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এবছর এই মুহূর্তে জেলার ৮ উপজেলাতেই পানির স্তর নেমে গেছে ৩৫-৩৮ ফুট। যেকারণে অধিকাংশ টিউবওয়েলেই পানি উঠছে না যশোরের অনেক উপজেলাতে টিউবওয়েল সাথে ১ বা ২ হর্স পাওয়ার মোটর লাগিয়ে পানি তোলা সম্ভব হচ্ছে না।যেকারণে শহর অঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি গ্রামের অঞ্চলের মানুষের মানুষকে সুপেয় ও ব্যবহৃত পানি পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদ পারভেজ বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ওয়াটার টেবিলের লেয়ার নিম্নমুখী। ওয়াটার লেভেল নেমে যাওয়ার কারণে সুপেয় পানির যাতে সঙ্কট না হয় সে জন্য উপজেলা পর্যায়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর সাবমারসিবলের পানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান জেলায় ১২,হাজার ৫০০টি সাবমারসিবল পাম্পযুক্ত নলকূপ চালু আছে। এই মুহূর্তে যশোর সদর উপজেলায় পানির স্থিতিতল ৩৪ ফুট,বাঘারপাড়ায় ২৭ ফুট, ঝিকরগাছায় ২২ ফুট, চৌগাছায় ৩২ ফুট, শার্শায় ৩৪ ফুট, অভয়নগরে ১৮ ফুট, মনিরামপুর উপজেলায়৩০ ফুট ও কেশবপুর উপজেলায় ২৩ ফুট বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ৩০ ফুটের নিচে পানির স্তর নেমে গেছে সেখানে ৬নং হ্যান্ড পাম্মযুক্ত নলকূপ এবং সেন্ট্রিফিউগাল পাম্পযুক্ত নলকূপের পানি উত্তোলনে অসুবিধা হচ্ছে বলে তিনি জানান।এদিকে পানির ভূগর্ভস্থ স্তর দ্রুত নেমে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ চরমে উঠেছে।
যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার বাড়ীয়ালী গ্রামের নূরুল ইসলাম জানান, তার বাড়িতে ২ নলকূপ ও ১টি গভীর নলকূপ আছে। তার গভীর নলকূপটির ৫৮০ ফুট গভীরতা যা অত্র ইউনিয়নের গভীরতম নলকূপ। তারপরও তিনি প্রয়োজনমত পানি উত্তোলন করতে পারছে না।
পাশ্ববর্তী দশপাখিয়া গ্রামের বাসিন্দা বখতিয়ার সরদার জানান, গত ১৫ দিন ধরে তাদের টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। আধাঘন্টা ধরে চাপাচাপি করার পর সামান্য পানি উঠলেও তা কাজে আসে না। যেকারণে বাধ্য হয়ে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়েছি। ফলে তার মহল্লার খাবার পানির কিছুটা হলেও সামাল হচ্ছে।
যশোর সদরে উপজেলার ঝাউদিয়া গ্রামের মোখলেছুর রহমান জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। যাদের সামর্থ আছে তারা সাবমারসিবল মোটর বোরিং করে পানি তুলছে। আর যারা পারছেন না তারা এসব বাড়িতে গিয়ে পানি আনতে বাধ্য হচ্ছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে বোরো আবাদে সেচ দিতে। বিশেষ করে যারা স্যালো মেশিনে সেচের কাজ করছেন তারা বিপাকে পড়েছেন।
জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার বাসিন্দা বাবলুর রহমান জানান, তাদের এলাকায় অধিকাংশ স্যালো মেশিনে পানি তুলতে কষ্ট হচ্ছে। পানি উঠলেও তার পরিমাণ কম। এর কারণে সেচ খরচ বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন। সবকিছু মিলিয়ে নাজেহাল অবস্থায় জীবন যাপন করছে যশোরবাসী।