চীনের মহামারীর রূপ এখন ইতালিতে। করোনাভাইরাসের ছোবলে দেশটি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। দিন দিন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। এখন পর্যন্ত মারা গেছেন দুই হাজার ১৫৮ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ২৪ হাজার ৭৪৭ জন। সব মিলিয়ে পুরো ইতালি এখন মৃত্যুপুরী। সেখানকার হিউম্যানিটাস গাভাজেনি হসপিটালের ডা. ডেনিলে ম্যাকিনি ফেসবুকে দীর্ঘ এক স্ট্যাটাসে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই, ভয়ংকর মৃত্যুর বর্ণনা, এ রোগের লক্ষণ ও অবহেলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করেছেন।
তিনি লিখেছেন, আমাদের দেশে এখন ঘটে চলছে ভয়াবহ এক ট্রাজেডি। বৃদ্ধ রোগীরা মারা যাবার আগে চোখের পানি ফেলছেন। কাছের মানুষদের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার সৌভাগ্যও তাদের নেই। তারা একা একা মরতে চাননি কিন্তু তাদের বিদায় জানাতে হচ্ছে ক্যামেরায়। তারা সজ্ঞানে, সমস্ত কষ্টকে সহ্য করতে করতে মারা যাচ্ছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রী একইদিনে মারা যাচ্ছেন। বৃদ্ধ দাদা-দাদি, নানা-নানীর তাদের নাতিদের মুখ শেষবারের মতও দেখতে পাচ্ছেন না। এই রোগ ফ্লু'র চাইতেও ভয়াবহ।
বিশ্বাস করুন, ফ্লু'র চাইতে অনেক ভিন্নরকমের অসুখ এটি। এই রোগকে দয়া করে তাই ফ্লু বলবেন না। জ্বর অসম্ভব বেশি। রোগীর দম এমনভাবে বন্ধ হয়ে আসতে চায় যেন সে ডুবে যাচ্ছে। রোগীরা হাসপাতালে আসতে চায় না। শুধু একটু অক্সিজেন পাবার জন্য তারা বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এই রোগের বিরুদ্ধে খুব সামান্য কিছু ওষুধ কাজ করে। আমরা সাহায্য করার সাধ্যমত চেষ্টা করে যাচ্ছি কিন্তু সবকিছুই নির্ভর করছে রোগীর অবস্থার উপর। বৃদ্ধ রোগীরা এই রোগের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে উঠছেন না।
আমরা কাঁদছি। আমাদের নার্সরা কাঁদছে। সবাইকে বাঁচিয়ে তোলার সামর্থ্য আমাদের নেই। চোখের সামনে মেশিনে তাদের জীবন থেমে যেতে দেখছি প্রতিদিন। প্রচুর রোগী আসছে। অতি দ্রুত আমাদের আরো বেডের প্রয়োজন হবে। সবার একই সমস্যা। সাধারণ নিউমোনিয়া। প্রচন্ড শক্তিশালী নিউমোনিয়া। আমাকে বলুন কোন ফ্লু এই ট্রাজেডির জন্ম দেয়?
এই ফ্লু অত্যন্ত সংক্রামক। এই ভাইরাসটি একেবারেই অন্যরকম। কোন কোন মানুষের জন্য ভয়ংকর। আমাদের দেশে ৬৫ ঊর্ধ্ব বৃদ্ধদের প্রায় প্রত্যেকের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিংবা কোন না কোন রোগ রয়েছে। কোন কোন তরুণদের জন্যও এই রোগ ভয়ংকর। এইসব তরুণ রোগীদের দেখলে কোন তরুণই নিজেকে নিয়ে নিশ্চিন্তবোধ করতে পারবেন না।
আমাদের হাসপাতালে কোনো সার্জারি হচ্ছে না। বাচ্চাদের জন্ম, চোখের অপারেশন, কিংবা ত্বকের চিকিৎসা। কেননা সার্জারি রুমগুলো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রূপান্তর করা হয়েছে। সবাই যুদ্ধ করছি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। প্রতি ঘণ্টায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। ক্রমাগত হাতে আসছে টেস্ট রেজাল্ট। সব পজিটিভ। পজিটিভ। পজিটিভ!
সব রোগীর এক রকমের অভিযোগ: ১. অসম্ভব জ্বর ২. শ্বাস কষ্ট ৩. কাশি ৪. ডুবে যাবার মত দমবন্ধ অনুভূতি
প্রায় সবাই ইনটেনসিভ কেয়ারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। কেউ কেউ অক্সিজেন মাস্কের নিচেও শ্বাস নিতে পারছেন না। অক্সিজেন মেশিন এখন সোনার চাইতেও দামি।
বিশ্বাস করতে পারছি না, কি দ্রুত এসব ঘটে গেল! আমরা সবাই ক্লান্ত। কিন্তু কেউ থামতে চাইছি না। সবাই মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করছি। ডাক্তাররা নার্সদের মত অবিরাম কাজ করে চলছেন। দুই সপ্তাহ ধরে আমি বাসায় যাই না। আমার পরিবারের বয়স্ক সদস্যদের জন্য আমি শংকিত। সন্তানদের সঙ্গে ক্যামেরা ব্যবহার করে কথা বলছি। মাঝে মাঝে আমি স্ত্রীর ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদি। আমাদের কারো কোনো দোষ নেই। যারা আমাদের বলেছিল এই রোগটি তেমন ভয়ংকর নয়, সমস্ত দোষ তাদের। তারা বলেছিল এটি সাধারণ এক ধরনের ফ্লু। কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর এখন অনেক বেশি দেরি হয়ে গিয়েছে।
দয়া করে ঘরের বাইরে বের হবেন না। আমাদের কথা শুনুন। শুধুমাত্র জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না। সাধারণ মাস্ক ব্যবহার করুন। প্রফেশনাল মাস্কগুলো আমাদের ব্যবহার করতে দিন। মাস্কের অভাবে আমাদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে। কোন কোন ডাক্তার এখন আক্রান্ত। তাদের পরিবারের অনেকেই জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাই নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করুন।
বয়স্ক পরিবার পরিজনকে ঘরে থেকে বের হতে দেবেন না। আমাদের পেশার কারণে আমরা ঘরে থাকতে পারছি না। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমরা রোগীদের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। দূর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা নিজেদের শরীরে অসুখ ও ভগ্নহৃদয় নিয়ে ঘরে ফিরছি। যাদের বাঁচাতে পারছি না তাদের শরীরের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করছি। কাল সব ঠিক হয়ে গেলে আমাদের কথা সবাই ভুলে যাবে। আমরা ডাক্তারদের এটাই পেশা। তাই মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি।
ভাইরাসটির সংক্রমণ থেকে সাবধানে থাকুন। জনসমাগম থেকে দূরে থাকুন। সিনেমা হলে যাবেন না, মিউজিয়ামে যাবেন না, খেলার মাঠে যাবেন না। দয়া করে বৃদ্ধ মানুষগুলোর দুঃখ অনুভব করার চেষ্টা করুন। তাদের জীবন আপনাদের হাতে এবং আপনারা আমাদের চাইতে বেশি জীবন বাঁচাতে সক্ষম। আপনারাই তাদের রক্ষা করতে পারেন।
লেখাটি শেয়ার করুন। যেন পুরো ইতালি এই চিঠিটি পড়তে পারে। সমস্ত কিছু শেষ হবার আগেই যেন পড়তে পারে।