|
অপরাধমূলক সংবাদের অতিরিক্ত বর্ণনা ও নারীর প্রতি সহিংসতা
লাবণী খাতুন
|
![]() লাবণী খাতুন, এম.ফিল. গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়নকর্মী। মূলধারার সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক তথাকথিত নতুন ধরনের “মিডিয়া” দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। এসব প্ল্যাটফর্মের অনেকগুলোই নিবন্ধনবিহীন, দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং পেশাগত নৈতিকতার পরিবর্তে মূলত ক্লিক, ভিউ, শেয়ার ও অর্থনৈতিক লাভের ওপর নির্ভরশীল। প্রচলিত সংবাদমাধ্যম সাধারণত সম্পাদকীয় নীতি ও আইনি জবাবদিহিতার আওতায় পরিচালিত হলেও, এসব অনলাইন পেজ ও চ্যানেল জনদৃষ্টি আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় প্রায়ই ভয়াবহ ঘটনার গ্রাফিক বিবরণ, ব্যক্তিগত তথ্য, উদ্বেগজনক দৃশ্য এবং আবেগপ্রবণ শিরোনাম প্রকাশ করে থাকে। বহু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নিয়মিত সহিংসতামূলক বিষয়বস্তুর সংস্পর্শ মানুষকে ধীরে ধীরে সংবেদনহীন করে তুলতে পারে যেমন, “Enduring Themes and Silences in Media Portrayals of Violence Against Women”, “The Impact of Electronic Media Violence”, “Comfortably Numb: Desensitizing Effects of Violent Media on Helping Others”এই গবেষণাগুলো দেখায় যে, সহিংস ঘটনার অতিরিক্ত ও বিশদ বর্ণনা একসময় সহিংসতাকে স্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান করতে শুরু করে। যখন মানুষ বারবার নাটকীয়ভাবে উপস্থাপিত নৃশংস ঘটনার মুখোমুখি হয়, তখন সহিংসতা তার সামাজিক অনুভূতি হারাতে থাকে। নারীর প্রতি সহিংসতা বা ক্ষতিগ্রস্থের যন্ত্রণা তখন একটি গুরুতর মানবাধিকার ইস্যু হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন অনলাইন ভোগ্যবস্তু হিসেবে প্রতিভাত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অনেক সংবাদমাধ্যম নৈতিক দায়বদ্ধতার চেয়ে “ব্রেকিং নিউজ”-কে অধিক গুরুত্ব দেয়। ভুক্তভোগীর সম্মতি বা যথাযথ যাচাই ছাড়াই তারা ব্যক্তিগত ছবি, পারিবারিক তথ্য কিংবা ব্যক্তিজীবনের সংবেদনশীল বিষয় প্রকাশ করে। এর ফলে বেঁচে থাকা ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার দ্বিতীয় দফা সহিংসতার শিকার হয়, যা জনসম্মুখে অপমান এবং ডিজিটাল উন্মোচনের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সহিংসতার প্রতি কম প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। বিশেষত যেসব সমাজে লিঙ্গবৈষম্য ও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা গভীরভাবে প্রোথিত, সেখানে এই স্বাভাবিকীকরণ নারীদের জন্য আরও ক্ষতিকর। সংবাদ পরিবেশনের অতিরিক্ত বিশদ বিবরণ কখনও কখনও সম্ভাব্য অপরাধীদের কাছে অপরাধ সংঘটনের পদ্ধতি, প্রেরণা এবং মনোযোগ আকর্ষণের কৌশল সম্পর্কে ধারণা প্রদান করতে পারে। কিছু অপরাধী কুখ্যাতি অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ হতে পারে; আবার সহিংস ঘটনার ধারাবাহিক বর্ণনায় প্রভাবিত হয়ে মানসিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিরাও অনুরূপ আচরণে উৎসাহিত হতে পারে। “Copycat Violence” শীর্ষক গবেষণাসহ অপরাধমূলক আচরণ ও অনুকরণমূলক অপরাধসংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় এ প্রবণতার উল্লেখ পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পরিস্থিতিকে আরও ত্বরান্বিত করে, কারণ সেখানে নৈতিক সীমারেখা ছাড়াই নারীবিদ্বেষী বক্তব্য, হয়রানি এবং সহিংস চিত্র দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে নারীদের ওপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ নারী সংস্থা (UN Women)-এর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সহিংসতার ভয় নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য, চলাফেরা এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। নারীরা নিজেদের ঘর, কর্মক্ষেত্র, জনপরিসর, ইন্টারনেট এমনকি যাতায়াত ব্যবস্থাকেও অনিরাপদ বলে মনে করতে শুরু করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় পরিবারগুলো প্রায়ই সহিংসতার মূল কাঠামোগত কারণ মোকাবিলা করার পরিবর্তে নিরাপত্তার অজুহাতে নারীদের স্বাধীনতা ও চলাচলের ওপর আরও বিধিনিষেধ আরোপ করে। ফলে ভয় নিজেই এক ধরনের সামাজিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিণত হয়। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত চাঞ্চল্যকর বিষয়বস্তুকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। কোনো শিরোনাম বা ভিডিও যত বেশি বিস্ময়কর বা উত্তেজনাপূর্ণ হয়, তত বেশি মানুষের সম্পৃক্ততা অর্জন করে। এর ফলে কনটেন্ট নির্মাতারা অধিক অনুসারী, বিজ্ঞাপন আয় এবং সামাজিক দৃশ্যমানতা অর্জনের লক্ষ্যে ক্রমশ আরও চরম ও উত্তেজনামূলক বিষয়বস্তু তৈরিতে উৎসাহিত হন। এভাবে মনোযোগনির্ভর অর্থনীতিতে সহিংসতা লাভজনক পণ্যে পরিণত হয়। দুঃখজনকভাবে, অনেক সংবাদমাধ্যম এখনো কাঠামোগত সমস্যার পরিবর্তে চাঞ্চল্যকর বিবরণকেই অগ্রাধিকার দেয়। পিতৃতন্ত্র, পৌরুষবাদ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা কিংবা সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো মূল কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে তারা প্রায়ই এমন নাটকীয় উপস্থাপনাকে বেছে নেয়, যা ক্লিক, রেটিং এবং শেয়ার বৃদ্ধিতে সহায়ক। তবে গণমাধ্যমের ইতিবাচক পরিবর্তন সৃষ্টির ক্ষমতাও অপরিসীম। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা সহিংসতাকে পুনরুৎপাদন না করে বরং তার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। নৈতিক সাংবাদিকতার অর্থ হলো ভুক্তভোগীর পরিচয় সুরক্ষিত রাখা, অপ্রয়োজনীয় গ্রাফিক বর্ণনা পরিহার করা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করা এবং বিচার, প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করা। গণমাধ্যম নারীদের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে পারে, সহায়তামূলক ব্যবস্থাগুলোকে সামনে আনতে পারে এবং লিঙ্গসমতা ও মানবাধিকারের বিষয়ে জনআলোচনা সম্প্রসারিত করতে পারে। নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নয়; এটি অসম ক্ষমতাবিন্যাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি গভীর সামাজিক সংকট। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো সেই বাস্তবতাকে উদ্ভাসিত করা, মানবিক দুর্ভোগকে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করা নয়। এমন এক সময়ে, যখন মানুষের মনোযোগ নিজেই একটি মূল্যবান মুদ্রায় পরিণত হয়েছে, তখন গণমাধ্যমকে একটি কঠিন কিন্তু অত্যন্ত জরুরি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে: আমরা কি সত্যিই সমাজকে সচেতন করছি, নাকি ধীরে ধীরে তাকে সহিংসতার সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত করে তুলছি? লেখক, লাবণী খাতুন এম.ফিল. গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্নয়নকর্মী। Email: laboni.du09@gmail.com
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
