|
জলবায়ু কূটনীতিতে উচ্চকণ্ঠ, বাস্তবায়নে ধীর বাংলাদেশ
সায়ীদ আবদুল মালিক
|
![]() জলবায়ু কূটনীতিতে উচ্চকণ্ঠ, বাস্তবায়নে ধীর বাংলাদেশ বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো কনভেনশনের আওতায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্স অব দ্য পার্টিস (কপ) সম্মেলনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে কপ২৬, কপ২৭ ও কপ২৮-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা জলবায়ু ন্যায়বিচার, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন ব্যয় বহনে উন্নত দেশগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর প্ল্যাটফর্মেও বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশটির ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে একটি তিগ্রস্ত হলেও সচেতন ও সক্রিয় রাষ্ট্র হিসেবে। কিন্তু এই কূটনৈতিক সাফল্যের বিপরীতে দেশের অভ্যন্তরে বাস্তব চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশে একাধিক নীতি, কর্মপরিকল্পনা ও অভিযোজন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে ধীরগতি, সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে বহু প্রকল্প থাকলেও বাস্তবে সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠী কাক্সিত সুরা পাচ্ছে না। নদীভাঙন রোধ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, সুপেয় পানির ব্যবস্থা কিংবা কৃষি অভিযোজন, এসব েেত্রই দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন তহবিল থেকে অর্থ এলেও তার ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাঝে প্রশাসনিক জটিলতা, তদারকির ঘাটতি এবং দ জনবল সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে যে অর্থ জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরায় ব্যয় হওয়ার কথা, তার পূর্ণ সুফল অনেক েেত্রই মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না। এদিকে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ জলবায়ু ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, খাল-জলাশয় দখল এবং সবুজায়নের অভাব নগরবাসীকে নতুন ধরনের পরিবেশগত সংকটে ফেলছে। অথচ নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এখনো বেশি। ফলে একদিকে বাংলাদেশ জলবায়ু তির শিকার, অন্যদিকে নির্গমন কমাতে বাস্তব উদ্যোগে পিছিয়ে, এমন দ্বৈত চিত্র আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে কিছুটা দুর্বল করছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে জোরালো বক্তব্য দিলেই হবে না; সেই বক্তব্যের পে দেশের ভেতরে সফল বাস্তব মডেলও দাঁড় করাতে হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা, উপকূল রা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে না পারলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে শক্ত থাকবে না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসে কর্মরত সিনিয়র অপারেশনস অফিসার ইফফাত মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির শিকার দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বমঞ্চে সুপরিচিত হলেও বাস্তব সমাধানে এখনও কাক্সিত সাফল্য আসেনি। তবে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং আগামী দিনে প্রতিশ্রুতির প্রমাণ মাঠপর্যায়ে দেখাতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশ চাইলে শুধু ভুক্তভোগী নয়, জলবায়ু মোকাবিলায় সফল উদাহরণ হিসেবেও বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সে জন্য প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য। অন্যথায় বিশ্বমঞ্চে উচ্চকণ্ঠ থাকার পরও বাস্তবতার বিচারে বাংলাদেশ পিছিয়েই থাকবে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
