ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ৪ বৈশাখ ১৪৩৩
শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন একটি স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন
নুরে আলম তালুকদার
প্রকাশ: Wednesday, 8 April, 2026, 8:30 PM

শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন একটি স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন

শিক্ষা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন একটি স্থায়ী স্বাধীন শিক্ষা কমিশন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আগামী বাংলাদেশের প্রগতি ও লক্ষ্য অর্জনের একটি ধাপ সম্পন্ন হলেও মূলত একটি জাতির উত্থান বা পতন তার শ্রেণিকক্ষে নির্ধারিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ধ্রুব সত্যটি বর্তমানে এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা, ঘনঘন নীতি পরিবর্তন এবং গুণগত মানের নিম্নগামিতা দেখা দিচ্ছে, তা নিরসনে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ 'জাতীয় শিক্ষা কমিশন' গঠন এখন আর কেবল অ্যাকাডেমিক বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক বহুমুখী সংকটে নিমজ্জিত। প্রথমত, কারিকুলাম নিয়ে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেট থাকলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার (Skill-set) অভাবে শিক্ষিত বেকারের হার বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। তৃতীয়ত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার যে ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা, গবেষণায় দেখা গেছে সেখানে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ন্যূনতম ভাষাগত ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৪% থেকে ৬% অথবা মোট জাতীয় বাজেটের ১৫% থেকে ২০% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা উচিত। অথচ বাংলাদেশে এই বরাদ্দ গত কয়েক বছর ধরে জিডিপির মাত্র ১.৭৬% থেকে ২% এর আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এই হার অত্যন্ত নগণ্য। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশীয় বা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব না কেন? অন্যদিকে কেবল বাজেট বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে শিক্ষা বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণ (ভবন তৈরি) এবং বেতন-ভাতায়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষার মানোন্নয়নে যে খাতে ব্যয় হওয়া উচিত ছিল—যেমন গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং ডিজিটাল কনটেন্ট—সেখানে বরাদ্দ থাকে যৎসামান্য।  এ অবস্থায় একটি স্থবির ও লক্ষ্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল করতে বিচ্ছিন্ন কোনো সংস্কার নয়, বরং প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের পথ নকশা করার জন্যই প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কমিশন।
বিগত দিনের অভিজ্ঞতা বলে, কেবল আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কোনো কমিশনকে সফল করতে পারে না। একটি কার্যকর শিক্ষা কমিশনে থাকতে হবে বৈচিত্র্য ও মেধার সমন্বয়, কমিশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হতে হবে এমন যারা বিগত দিনে শিক্ষা নিয়ে গভীভাবে ভেবেছেন ও এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিক্ষার মানোন্নয়নে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট ভূমিকা পালন করেছেন। কমিশনের প্রধান হিসেবে এমন একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষা অনুরাগীকে প্রয়োজন, যিনি দেশীয় সংস্কৃতির সাথে বৈশ্বিক মানদণ্ডের মেলবন্ধন বোঝেন। কেবল তাত্ত্বিক নয়, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারে শিক্ষাবিদ, শিক্ষা বিষয়ক গবেষকও বাংলাদেশ ছাত্রকল্যান ট্রাস্টের মতো শিক্ষার মানোন্নয়নে বদ্ধপরিকর এমন প্রতিষ্ঠান মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। একইসাথে কমিশনে শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা বোঝার জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণের পরিবর্তন পর্যালোচনার জন্য শিশু মনোবিজ্ঞানী, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোডিং-এআই- ডাটা সায়েন্সকে কীভাবে প্রাথমিক স্তর থেকে সমন্বিত করা যায় তার জন্য দক্ষ প্রযুক্তিবিদদেরও রাখা যেতে পারে।
শিক্ষা কমিশন গঠন করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না, যদি না এর সুপারিশ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। অতীতে অনেক কমিশনের রিপোর্টই হিমাগারে আড়ালে হারিয়ে গেছে। এবারের কমিশনকে হতে হবে স্বাধীন, যাতে তারা কোনো রাজনৈতিক আদর্শের তোষণ না করে কেবল জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারে। বিগতদিনে বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্ট শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার সাথে নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন, শিক্ষা ভাবনা ও শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট সুধী জনের সমন্বয়ে নানা সভা সমাবেশ ও মাঠপর্যায়ে দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। নির্বাচন পূর্ব সময়ে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজন করা হয় 'নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা' বিষয়ক গোল টেবিল বৈঠক যা দেশব্যাপী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা দলগুলোর আগামীর শিক্ষাভাবনা ও পরিকল্পনাকে জনগণের সামনে তুলে ধরে। এমতাবস্থায়, ট্রাস্টের পক্ষ থেকে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের দাবি এবং এই কমিশনের একটি গুরত্বপূর্ণ ভূমিকায় অংশীজন হওয়া বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ পথচলাকে আরো মসৃণ ও কন্টকহীন করবে, এমনটাই আশা করা যায়।

​পরিশেষে বলতে হয়, আমরা যদি একটি মেধাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করতে চাই, তবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো আধুনিকায়ন করতে হবে। নবগঠিত সরকার যত দ্রুত একটি শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন করবে, জাতি হিসেবে আমরা তত দ্রুত আমাদের কক্ষপথে ফিরব। নতুবা সময় বয়ে যাচ্ছে, শিক্ষা কমিশন বিষয়ক যেকোন সিদ্ধান্তহীনতার মাশুল হয়তো দিতে হতে পারে আগামী প্রজন্মকে।

লেখকঃ প্রিন্সিপাল নুরে আলম তালুকদার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ছাত্রকল্যাণ ট্রাস্ট।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status