ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ৩ জুন ২০২৬ ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে সবার কেন শ্যেনদৃষ্টি?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Wednesday, 3 June, 2026, 1:52 PM
সর্বশেষ আপডেট: Wednesday, 3 June, 2026, 1:54 PM

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে সবার কেন শ্যেনদৃষ্টি?

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে সবার কেন শ্যেনদৃষ্টি?

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং পাঁচ দিনের সফরে ভারতে গেছেন। সেখানে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের আলোচনায় গুরুত্ব পায় ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার মতো বিষয়গুলো।

এ বছরের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটিই মিন অং হ্লাইংয়ের প্রথম বিদেশ সফর। ২০২১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলেছে। এরপর একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতায় আসে। তাই আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো এই সরকারের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক রাখতে চায়, তা বোঝার জন্য সবাই এই সফরের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে।

মিয়ানমার ও ভারতের মধ্যে ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটারের (১ হাজার ২১ মাইল) সীমান্ত রয়েছে। তাই এক দেশে কিছু ঘটলে অন্য দেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়। ওই এলাকার নিরাপত্তা, অভিবাসন ও সীমান্ত-বাণিজ্য প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের পরিস্থিতির ওপর নিবিড়ভাবে নির্ভরশীল।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইং ক্ষমতা দখল করেন। অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল ভোটে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরপরই উৎখাত হয় ওই অভ্যুত্থানে।

সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পরপরই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে এটি সশস্ত্র আন্দোলন থেকে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাড়িছাড়া হয়েছে। দেশের বড় একটি অংশ এখন আর সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেই।

এই সংঘাতের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও গিয়ে পড়ে। মিয়ানমারের চিন জাতিগোষ্ঠীর অনেক মানুষসহ হাজার হাজার নাগরিক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিজোরাম ও মণিপুরে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে সেনাসমর্থিত দল বিপুল জয় পায়। তবে অনেক বিরোধী দলকে এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি এবং সংঘাতপূর্ণ বড় এলাকাগুলোর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এরপর সেনা–নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্টে গত এপ্রিলে মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রে ফেরার একটি পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছিল। তবে বিরোধী দল, পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা এই নির্বাচনের কড়া সমালোচনা করেছেন। সমালোচকদের যুক্তি, এই পরিবর্তন সামরিক বাহিনীর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ কমাতে খুব সামান্য ভূমিকাই রাখবে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ নিজেদের দাবিতে অটল থাকে যে ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মাঝামাঝি সময়ে মিন অং হ্লাইং রাশিয়া ও চীন সফর করেন। তবে এপ্রিলে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতই হলো তাঁর বিদেশ সফরের প্রথম গন্তব্য।ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সর্বশেষ ২০১৭ সালে মিয়ানমার সফর করেছিলেন।

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, মোদি ও মিন অং হ্লাইংয়ের আলোচনায় মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়টিও উঠে আসে।

বিক্রম মিশ্রি আরও জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রতিবেশী দেশটির গণতন্ত্র সম্পর্কিত আরও বিস্তৃত বিষয়গুলো উত্থাপন করেছেন এবং অং সান সু চিকে নিয়েও আলোচনা করেছেন, যিনি বর্তমানে গৃহবন্দী আছেন।

ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বলেন, মিয়ানমারে স্থায়ী শান্তি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রক্রিয়াকে ভারত সব সময় সমর্থন করে। দিল্লির মতে, সম্পর্ক ছিন্ন করার চেয়ে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমেই পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সবচেয়ে ভালো সুযোগ রয়েছে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত ইংরেজি পত্রিকা দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এমন কোনো কাজে মিয়ানমারের মাটি যেন ব্যবহার করা না হয়, সে বিষয়ে দুই দেশই জোর দিয়েছে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভারতের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো কাজে মিয়ানমারের মাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে মিন অং হ্লাইং নয়াদিল্লিকে আশ্বস্ত করেছেন। অন্যদিকে মিয়ানমারের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতার প্রতি ভারত সমর্থন দিয়ে যাবে বলে মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

গত ৩০ মে ভারতে পৌঁছানোর পর মিন অং হ্লাইং বুদ্ধগয়ায় যান। সেখানে তিনি মহাবোধি মন্দিরে প্রার্থনা করেন। বলা হয়, এই স্থানেই বুদ্ধ দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন।

এরপর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিতে দিল্লিতে যান মিন অং হ্লাইং। সেখান থেকে মুম্বাই গিয়ে তিনি ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে দেখা করেন। দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা বাড়ানো ও বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজতে এই বৈঠক হয়।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মিয়ানমারের সরকারের জন্য এই সফরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও নিভৃতে থাকার পর দেশটি এখন অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে চাইছে।

মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজীব ভাটিয়া  বলেন, এটি মিয়ানমারের জন্য বড় একটি কূটনৈতিক অর্জন। কারণ, এই সফরের মাধ্যমে তাদের প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের স্বীকৃতি পাচ্ছেন।

মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারতের আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে মিন অং হ্লাইং এই অঞ্চলে এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বে আরও বেশি সম্মান আদায়ের চেষ্টা করছেন।

ভারতের জন্য এই সফর একটি দীর্ঘদিনের দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিফলিত করে যে নে পি দোর সরকারের প্রকৃতি যেমনই হোক না কেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মিয়ানমারে দিল্লির কৌশলগত স্বার্থ।

রাজীব ভাটিয়া বলেন, মিয়ানমারে ভারতের প্রধান তিনটি স্বার্থ রয়েছে। এগুলো হলো—নিজেদের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত স্থিতিশীল রাখা, অ্যাক্ট ইস্ট নীতির (দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে গৃহীত ভারতের একটি অন্যতম প্রধান পররাষ্ট্রনীতি) সফলতা এবং সেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলা।

ভারতের আঞ্চলিক কৌশলে মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়ে রয়েছে। কারণ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের একমাত্র সদস্য হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গেই ভারতের স্থলসীমান্ত রয়েছে।

ভাটিয়া বলেন, এই সফর আসিয়ান দেশগুলোর ওপর একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এই দেশগুলো মিয়ানমার প্রশ্নে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করছে।

ভারত ও চীনের মধ্যকার বড় কৌশলগত প্রতিযোগিতায় মিয়ানমারের গুরুত্বের কথাও তুলে ধরছেন বিশ্লেষকেরা।

মিয়ানমারের মাধ্যমে চীন সহজেই বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সুযোগ পায়। এর ফলে ব্যবসা ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য মালাক্কা প্রণালির ওপর চীনের নির্ভরতা কমেছে।

গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে মিয়ানমারে চীন তার প্রভাব অনেকটাই বাড়িয়েছে। নিজেদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চীন এখন মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের বেশ খোলামেলাভাবেই সমর্থন দিচ্ছে।

মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের এই ভারত সফরটিও এমন এক পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বহু পশ্চিমা দেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে।

২০২১ সালের সেনা অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার বেশ কয়েকটি মিত্রদেশ মিয়ানমারের সামরিক নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল।

তবে গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে দেশটির প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ দেখাননি। মিয়ানমারের শরণার্থী এবং বিরোধী দলগুলোর জন্য সহায়তা ছাড়াও ট্রাম্প প্রশাসন তাদের অনেক বিদেশি সাহায্য স্থগিত করে দিয়েছে।

রাজীব ভাটিয়ার মতে, কোয়াড ভুক্ত দেশগুলোও (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) মিয়ানমারে শান্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের ভেতরের সংঘাত ভারতের সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতিও বদলে দিয়েছে।

গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, গত কয়েক মাসে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পূর্ব ও উত্তরের সশস্ত্র আন্দোলনকারীদের বেশ কোণঠাসা করে ফেলেছে। তারা এখন পশ্চিম সীমান্তের দিকে কড়া নজর রাখছে। তাই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চলমান এই সশস্ত্র আন্দোলন দমাতে তারা ভারতের সহযোগিতা চাইবে, এমন সম্ভাবনাই বেশি।

রাজীব ভাটিয়া মনে করেন, ভারত শেষ পর্যন্ত চায় এই সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি শান্ত ও স্থিতিশীল মিয়ানমার গড়ে উঠুক। তিনি বলেন, স্পষ্টত, ভারত একটি অধিক স্বাধীন মিয়ানমার দেখতে চায়।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status