আড়াইশ’ শয্যা বিশিষ্ট জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের রোগীদের খাদ্যপণ্য কেনা হচ্ছে দ্বিগুণ মূল্যে। উচ্চ মূল্যে খাদ্যপণ্য কেনা হলেও রোগীদের খাদ্য তালিকা থেকে খাসির মাংস ও মাছ বাদ দিয়ে প্রতিদিন দেয়া হয় ফার্মের মুরগির মাংস।
উচ্চ মূল্য ও রোগীদের খাবার নিয়ে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা ক্ষুব্ধ হলেও কর্তৃপক্ষ বলছেন, টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্যপণ্য কেনা হচ্ছে। আর প্রতিদিন ফার্মের মুরগি দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করছেন কর্তৃপক্ষ।
বাজারে ফার্মের মুরগির কেজি ১১০ টাকা, সবরি কলার হালি ২০ টাকা, সাগর কলার হালি ১০ থেকে ১২ টাকা, ডিমের হালি ৩০ টাকা ও সিদ্ধ চাল (২৮ জাতের) ৩৫ টাকা হলেও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ফারহান এন্টারপ্রাইজ ফার্মের মুরগি ৩০০ টাকা, ডিম ৫৬ টাকা হালি, কলা ৪৫ টাকা ও সিদ্ধ চাল ৬০ টাকা কেজি দরে সরবরাহ করছে। যা বর্তমান বাজার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ।
রোগীদের খাবার তালিকায় দুপুর ও রাতে সপ্তাহে দুই দিন খাসির মাংস, দুইদিন মাছ, তিনদিন ফার্মের মুরগির থাকলেও প্রতিদিনই দেয়া হয় ফার্মের মুরগির মাংস। সকালের নাস্তায় রয়েছে ডিম, কলা পাউরুটি। হাসপতাল কর্তৃপক্ষের যোগসাজসে ঠিকাদার মাছ ও খাসির মাংস না দিয়ে উচ্চ মূল্যে সরবরাহকৃত ফার্মের মুরগি, কলা, ডিম প্রতিদিন সরবরাহ করে আসছে।
হাসপাতালের ভর্তি রোগীরা বলছেন, প্রতিদিন ফার্মের মুরগি ও মাঝে মধ্যে রাতে ডিম দেয়া হয়। অভিযোগ, ফার্মের মুরগি খেতে না পারায় বাইরের খাবার খেয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। আবার অনেকেই নিরুপায় হয়ে খেতে বাধ্য হচ্ছেন।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি একজন রোগী জানান, তিনি ১৯ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। ১৯ দিনের মধ্যে মাত্র দুই দিন তাদের খাসির মাংস দেয়া হয়েছে বাকি ১৭ দিন ধরে ফার্মের মুরগি খাচ্ছেন।
গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি একজন নারী রোগী জানান, তিনি পাঁচ দিন যাবত ভর্তি আছেন। তিনি ফার্মের মুরগি না খাওয়ায় প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কিনে খেয়ে থাকেন।
অর্থোসার্জারি ওয়ার্ডের পুরুষ বিভাগে ভর্তি হতদরিদ্র এক রোগী জানান, হাসপাতালের খাবার খুবই নিম্নমানের। তবুও কোনো উপায় না থাকায় তিন দিন যাবত তিনি ফার্মের মুরগি খেয়ে আসছেন।
মাছ মাংস না দিয়ে প্রতিদিন ফার্মের মুরগি দেয়ার বিষয়ে খাবার দায়িত্বে থাকা হাসপাতালের ষ্টুয়ার্ড লিটন চন্দ্র সুত্রধর বলছেন, রোগীদের অভিযোগ ঠিক নয়। তালিকা অনুযায়ী খাবার দেয়া হয়। তবে ফার্মের মুরগি একটু বেশি দেয়া হয়।
একজন রোগীর জন্য প্রতিদিন ১৬৮.৭৩০ গ্রাম ফার্মের মুরগির বরাদ্দ হওয়ায় ২৫০জন রোগীর জন্য দিনে ৪২.১৮২ কেজি এবং বছরে ১৫৩৯৬.৬১২৫ কেজি ফার্মের মুরগির প্রয়োজন হয়।
হাসপাতালের টেন্ডার কমিটির নির্ধারিত ক্রয় মূল্য অনুযায়ী এর মূল্য ৪৬ লাখ ১৮ হাজার ৯শ ৮৩ টাকা। তবে ১১০ টাকা কেজি হিসাবে জেলার বাজারে এর স্বাভাবিক মূল্য ১৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬২৭ টাকা। এতে বাজার মূল্যের সঙ্গে টেন্ডার কমিটির ক্রয় করা মুরগির মূল্যের ব্যবধান ২৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৫৬ টাকা।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানিয়েছেন, রোগীদের খাবারের জন্য প্রতিদিন ৩০-৩৫ কেজি ফার্মের মুরগি কেনা হয়।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মো. জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, প্রতিদিন নিম্ন মানের ফার্মের মুরগি দেয়া হচ্ছে। ১০০ টাকা কেজির মুরগির দাম ধরা হচ্ছে ৩০০-৩৫০ টাকা। এতে বছরে প্রায় ২৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা লুট হচ্ছে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. ফেরদৌস হাসান জানান টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুযায়ী ঠিকাদার এ মূল্যে খাদ্য সরবরাহ করে থাকেন।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও টেন্ডার কমিটির সভাপতি ডা. হাবিবুর রহমান ফকির এমন উচ্চ মূল্যে খাদ্য পন্যের দাম নির্ধারণের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হয়নি।
২০১৯-২০ অর্থবছরে রোগীদের খাদ্যপণ্য ও পথ্য বাবদ খরচ হয় ১ কোটি ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা।