ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬ ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রাকৃতিক বিপর্যয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনমনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা: দুর্যোগে এইচএসসি পরীক্ষা এবং বিপন্ন ছাত্র-নিরাপত্তা
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান
প্রকাশ: Tuesday, 14 July, 2026, 7:36 PM

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনমনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা: দুর্যোগে এইচএসসি পরীক্ষা এবং বিপন্ন ছাত্র-নিরাপত্তা

প্রাকৃতিক বিপর্যয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনমনীয়তা ও রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা: দুর্যোগে এইচএসসি পরীক্ষা এবং বিপন্ন ছাত্র-নিরাপত্তা

রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা ক্রাইমোলজি বা অপরাধবিজ্ঞানের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট থিওরি’ বা সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের মূল ভিত্তি। অথচ সমকালীন বাংলাদেশে চরম প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দেশব্যাপী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়া ইমার্জেন্সির মধ্যে যেভাবে জোরপূর্বক উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে, তা এই সামাজিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক অবিবেচক সিদ্ধান্ত নয়, বরং অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে রাষ্ট্র কর্তৃক শিক্ষার্থীদের জীবনকে এক চরম কাঠামোগত নিরাপত্তা ঝুঁকির (Structural Vulnerability) মুখে ঠেলে দেওয়ার শামিল বলা চলে।

পরিসংখ্যানের বাস্তবচিত্র এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ভোগঃ
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির আনুষ্ঠানিক তথ্যানুযায়ী, গত ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ষষ্ঠ দিনে বৈরী আবহাওয়ার কারণে দেশের ১০টি শিক্ষা বোর্ডে মোট ১৯ হাজার ৫৯২ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে কেবল ঢাকা বোর্ডেই সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী কেন্দ্রে উপস্থিত হতে পারেননি। ওপেন সোর্স এবং বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের সচিত্র প্রতিবেদন ও সোশ্যাল মিডিয়ার নির্ভরযোগ্য উপাত্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার শিক্ষার্থী কোমর সমান পানি এবং অবিরাম বর্ষণ ডিঙিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে বাধ্য হয়েছেন। কারও প্রবেশপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে, আবার অসংখ্য পরীক্ষার্থী সম্পূর্ণ ভেজা পোশাকে টানা তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়েছেন। শত শত শিক্ষার্থী তীব্র মানসিক ট্রমা ও শারীরিক অবসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং পরদিনই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিভাবক মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে সমাজের আপামর জনসাধারণের যে কাণ্ডজ্ঞান রয়েছে, তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত থাকা চরম দুঃখজনক।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ (Criminological Perspective)ঃ
অপরাধবিজ্ঞানের ‘ভিকটিমোলজি’ (Victimology) এবং ‘স্টেট ক্রাইম’ (State Crime) তত্ত্বের নিরিখে যখন একটি রাষ্ট্রযন্ত্র প্রতিকূল পরিস্থিতি জেনেও কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় এবং তার ফলে সেই জনগোষ্ঠী শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তা এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা হিসেবে গণ্য হয়।

কাঠামোগত সহিংসতা (Structural Violence)ঃ দুর্যোগের মধ্যে শিক্ষার্থীদের জেনেশুনে নদীমাতৃক এবং জলাবদ্ধ জনপদে যাতায়াতে বাধ্য করা তাদের জীবনের অধিকারকে (Right to Life) ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এটি শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ত্রুটি ও জবাবদিহিতার সংকটঃ
যে আমলাতান্ত্রিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী (ডিসি, এসপি) অতীতে জনআকাঙ্ক্ষা বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষায় চরম বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছে, তাদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে জননিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ের মূল্যায়ন করা এক প্রকার কৌশলগত দেউলিয়াত্ব। তৃণমূলের প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি না করে দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন সংবেদনশীল পরীক্ষা চালু রাখা নীতিনির্ধারকদের চরম নৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।

মানসিক ও শারীরিক ট্রমাঃ 
পরীক্ষা কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয় যে, সেখানে জীবন বাজি রেখে ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ প্রমাণ করতে হবে। অসুস্থ শরীরে বা ভেজা পোশাকে কোনো শিক্ষার্থীর পক্ষেই তার মেধার যৌক্তিক ও স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব নয়।

বিদ্যমান সংকট থেকে উত্তরণে আমাদের করণীয়ঃ
তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষক হিসেবে এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে রাষ্ট্র এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি:

পরীক্ষার তাৎক্ষণিক পুনঃতফসিলিকরণ (Rescheduling)ঃ
আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক জারিকৃত ‘আবহাওয়া ইমার্জেন্সি’ চলাকালীন সময়ে চলমান সমস্ত পরীক্ষা অনতিবিলম্বে স্থগিত করা হোক। বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দেশব্যাপী পরীক্ষা গ্রহণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে হবে।

বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় প্রশাসনের স্বায়ত্তশাসনঝঃ
কেন্দ্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দুর্যোগের তীব্রতা অনুযায়ী জেলাভিত্তিক শিক্ষা বোর্ডগুলোকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া উচিত।

অনুপস্থিত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ মূল্যায়নঃ
বৈরী আবহাওয়ার কারণে যে ১৯ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাদের জীবন থেকে একটি বছর ঝরে যেতে দেওয়া যাবে না। তাদের জন্য বিকল্প প্রশ্নপত্রে পুনঃপরীক্ষা অথবা বিশেষ সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মূল্যায়নের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।

শিক্ষার্থীবান্ধব দুর্যোগ নীতিমালা প্রণয়নঃ
ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট ও সংবেদনশীল স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরি করা জরুরি, যেখানে রাষ্ট্র বা পরীক্ষা পদ্ধতির চেয়ে শিক্ষার্থীর জীবন ও স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ও যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলা। মেধা মূল্যায়নের পদ্ধতি যদি শিক্ষার্থীর জন্য জীবননাশের বা দীর্ঘমেয়াদী ট্রমার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই ব্যবস্থার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আশা করি, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা প্রশাসন বাস্তবতার নির্মম সত্য অনুধাবন করবেন এবং আমলাতান্ত্রিক অহমিকা পরিহার করে অনতিবিলম্বে শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে ও সুরক্ষায় প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

লেখকঃ - প্রফেসর ড. আসিফ মিজান উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status