|
রমনার বটমূলে বর্ষবরণ স্মৃতিপটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান
রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী
|
![]() রমনার বটমূলে বর্ষবরণ স্মৃতিপটে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কালের সাক্ষী ইতিহাস থেকে জানা যায়, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সবসময়ই বাঙালি সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করতো। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ও কবিতা প্রকাশ করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রতিবাদে ১৯৬৫ সালে (১৩৭২ বঙ্গাব্দে) ছায়ানট রমনা পার্কে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসব পালনের আয়োজন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'এসো হে বৈশাখ এসো, এসো' সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তারা স্বাগত জানাতে শুরু করে নতুন বছরকে। রমনার বটমূলে বর্ষবরণ উৎসব জাতীয়ভাবে উদযাপনের স্বীকৃতি পায় স্বাধীনতার পর, যা দিনে দিনে বাঙালির অন্তরে গেঁথে গেছে। কোটি কোটি বাঙালি এখন প্রতীক্ষায় থাকে কখন আসবে বর্ষবরণ উৎসব। অর্থাৎ শুভ নববর্ষ। পহেলা বৈশাখের দিন ভোরেই শুরু হয় বিভিন্ন স্থানে উন্মুক্ত বাউল, লোকগীতি, পল্লীগীতি লালন, মুর্শেদী, জারি-সারি ইত্যাদি গানের আসর। বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পান্তা- ইলিশ। পান্তা-ইলিশ না হলে যেন বাঙালির আমেজই জমে ওঠে না। সাথে কাঁচামরিচ তো থাকতেই হবে। রমনার লেকের পাড়ে অগণিত মানুষ সারি সারি বসে পড়ে পান্তা-ইলিশ খেতে। বাঙালিয়ানা ফুঁটে ওঠে সকল জাতি ধর্ম-বর্ণ, গোত্র বলে আলাদা কিছু নেই। বাঙালি কিনা? সাক্ষ্য দেয় যেন রমনার বটমূল। বৈশাখী মেলায় শুধু শিশুরাই নয় বরং বড়রাও নাগরদোলায় চড়ে বসে। আবেগ তাড়িত হয় সকল বাঙালি। গ্রামীণ রীতিতে ভোরে কৃষকেরা নতুন জামা গায়ে দিয়ে পরিবারের সাথে নানান রকমের ভর্তা দিয়ে পান্তাভাত, পিঠাপুলি, মিষ্টি খেয়ে দিনটি শুরু করে। কখনো একটি গ্রামে এককভাবে আবার কখনো কয়েকটি গ্রাম মিলে বৈশাখী মেলার আয়োজন করে। সেখানে ব্যবসায়ীরা নানা রকমের পণ্য নিয়ে যেমন- কেউ মাছ, কেউবা খেলনা, কেউ শাড়ি চুড়ি, চুলের ফিতা, কুটির শিল্প, মাটির খেলনা, বিভিন্ন রকমের লোকজ উপাদান নিয়ে পসরা বসান। কেউ কেউ পুরনো খাতা বাদ দিয়ে হালখাতা খুলে বসেন। কেউবা হালখাতা বৈশাখ মাসের অন্য কোনো তারিখেও করে থাকেন। সম্রাট আকবরের সময়ে একটি বিষয় ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, তা হলো মাসের প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা নাম ছিল। যা কি না প্রজাসাধারণের মনে রাখা খুবই কষ্টসাধ্য বিষয়। বিশেষজ্ঞদের সহাযোগিতায় ইংরেজি সাত দিনের নামের কিছুটা আদলে বাংলায় সপ্তাহের সাত দিনের নামকরণ করা হয়। বর্ষবরণের প্রবর্তিত রূপ: একেবারে শুরুর দিকে শুধু খাজনা আদায়ের প্রথা থাকলেও, সময়ের পরিক্রমায় বাংলা নববর্ষ হয়ে ওঠে জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক উৎসব। মোগল আমল থেকেই সৌর পঞ্জিকানুসারে বৈশাখ উদযাপিত হতো। এই পঞ্জিকার প্রচলন ছিল গ্রেগরীয় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে (মতান্তরে ৫ ই নভেম্বর ১৫৫৬) বাংলার কৃষকদের জন্য কৃষি কর আদায়ের সম্প্রদায়ের হাতে। সৌর বছরের প্রথমদিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মনিপুর, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু ও ত্রিপুরায় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ সর্বজনীন সামাজিক উৎসব হিসেবে উদযাপিত হয়, এমনটি হতো না। তখন নববর্ষ বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষি কাজ। কারণ প্রযুক্তির প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদেরকে ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো। বৈশাখে বাংলা সংস্কৃতির লোকায়ত চিত্রকে তুলে ধরা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে খৃস্টাব্দ অনুযায়ী ১৪ এপ্রিলে নতুন বর্ষবরণের উৎসব পালন করা হয়। বাংলা নববর্ষ দেশের তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির উপজাতিদেরও ঐতিহ্যবাহী উৎসব উদযাপনের দিন। সমতলের মতো পার্বত্য অঞ্চলেও নববর্ষ আসে ভিন্ন আবহে, ভিন্ন ঐতিহ্যে। পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালি ও তিন প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী - চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা-তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে উদযাপন করে বাংলা নববর্ষ। বিজু সাংগ্রাই ও বৈসু-এই তিন উৎসবের সম্মিলিত রূপই “বৈসাবি', যা পার্বত্য চট্টগ্রামের নববর্ষ উদযাপনের এক অনন্য, সমন্বিত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। বাংলা নববর্ষের বিবর্তন: ভারতের অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রচলিত বাংলা দিনপঞ্জির উৎস ছিল সংস্কৃত গ্রন্থ। প্রক্রিয়া সহজ ও সুশৃঙ্খল করতে হিজরি চান্দ্র বর্ষপঞ্জি ও বাংলা সৌর বর্ষপঞ্জির সমন্বয়ে এই সনের প্রবর্তন করেন সম্রাট আকবর। শুরুতে এর নাম ফসলি সন থাকলেও সময় গড়িয়ে এটি বঙ্গাব্দ বা বর্ষ পঞ্জি হিসেবে পরিচিতি পায়। উৎপত্তির সময়কাল: ১৫৮৪ খৃস্টাব্দের ১০/১১ ই মার্চ। তবে কার্যকর করা হয় ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ তারিখ থেকে। কৃষকদের কাছ থেকে স্বচ্ছভাবে কর আদায়ের সুবিধার্থে এটি উদ্ভাবিত হয়েছিল। আদিনাম : ফসলি সন। সম্রাট আকবরের আমল থেকেই পয়লা বৈশাখে বৈশাখী মেলার প্রচলন। বাংলা মাসের নামকরণ: বাংলা মাসগুলোর নাম এসেছে বিভিন্ন নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে। বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক ইত্যাদি। প্রথমাবস্থায় বছরের শুরু ধরা হতো অগ্রহায়ণ মাস থেকে, কারণ এই সময়ই ধান কাটার মৌসুম শুরু হতো। “অগ্র” মানে প্রথম, “হায়ণ” মানে বছর। এ রকমভাবে নামকরণ হয়েছিল অগ্রহায়ণ। বাংলা একাডেমির নির্ধারিত পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল উদযাপন করা হয় পয়লা বৈশাখ। অর্থাৎ শুভ নববর্ষ। বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে হিজরি ও খ্রস্টীয় সনের মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। হিজরি সনের নতুন তারিখ শুরু হয় সন্ধ্যায় নতুন চাঁদের আগমনের মধ্য দিয়ে, ইংরেজি দিন শুরু হয় মধ্যরাতে আর বাংলা সনের শুরু হয় ভোরের সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। বাংলাদেশে বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস হাজার বছরের অধিককাল পুরনো ঐতিহ্য। এ দেশে পয়ল বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার মুসলিম মাহিফরাস এখানেই পাওয়া যায় সংস্কৃত শব্দের বাংলা বারো মাসের নাম। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বাংলা দিনপঞ্জির সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়। সংশোধিত পঞ্জিকায় প্রথম পাঁচ মাস এ- ৩১ দিন আর বাকি সাত মাসে ৩০ দিন নির্ধারিত হয়। অধিবর্ষের ক্ষেত্রে ফাল্গুন মাসটিতে একটি অতিরিক্ত দিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ১৯৮৭ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিনপঞ্জি গৃহীত হয়। তখন থেকে প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ ১৪ এপ্রিলে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন হয় বাংলা পঞ্জিকা। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাপী গৃহীত গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির সঙ্গে বাংলা দিনপঞ্জির বিশেষ দিনগুলোর সামঞ্জস্য বিধান। সারমর্ম হিসাবে বলা যায়, পুরনো সব ভুল, গ্লানি মুছে যাক, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হোক। এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন, সৌহার্দ্যকে দৃঢ় করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত নয়। বৈশাখী উৎসব আমাদের শেকড়ের সন্ধানকে মনে করিয়ে দেয়। মহামিলনের বার্তা বয়ে আনে। হৃদয়কে নতুন উদ্দীপনায় উজ্জীবিত করে। মনেপ্রাণে ধারণ করি সবার আগে বাংলাদেশ। লেখক : রাজনীতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠক। সাবেক সভাপতি, জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস। সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বিএনপি।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
