ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ২০ জুলাই ২০২৬ ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
নবাব ফয়জুন্নেছার শিক্ষা প্রসার বনাম বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণ
এম এস দোহা
প্রকাশ: Sunday, 19 July, 2026, 1:36 PM

নবাব ফয়জুন্নেছার শিক্ষা প্রসার বনাম বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণ

নবাব ফয়জুন্নেছার শিক্ষা প্রসার বনাম বেগম রোকেয়ার নারী জাগরণ

বেগম রোকেয়ার জন্মের ৭ বছর পুর্বে ১৮৭৩ সালে নারী শিক্ষা প্রসারে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেও ঐতিহাসিক স্বীকৃতি লাভে উপেক্ষিত নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী।

তৎকালীন কোলকাতা কেন্দ্রীক বুদ্ধিজীবীরা যথাযথভাবে নারী শিক্ষার অগ্রদূত মহীয়সী এই নবাবের ইতিবাচক মূল্যায়ন না করায় তিনি পর্দার অন্তরালে রয়ে যান। 

পরবর্তীতে মিডিয়ার প্রচারণায়  নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্হান করে নেন বেগম রোকেয়া। কিন্তু নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেছার স্বীকৃতির   বিষয়টি এখনও অমীমাংসিত।

 কুমিল্লা শহরের বাদুরতলায় ১৮৭৩ সাল  প্রতিষ্ঠিত নবাব ফয়জুন্নেছা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটি এখন নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় হিসেবে বহুল পরিচিত।  একই সময়   কুমিল্লা শহরের নানুয়ার দিঘির পাড়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নারী শিক্ষার অগ্রদূত মহীয়সী নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরীরাণী।

১৮৭৪ সালে তিনি 'সুর লহরী' ও 'সংগীত সার' নামক দুটি বই বুলেটিন আকারে প্রকাশ করেন। ১৮৭৬ সালে 'রুপ জালাল' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে সাড়া জাগান তিনি। মহিলা কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে স্থান করে নেন ইতিহাসের পাতায়। উল্লেখ্য 'রূপ জালাল' কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের ৪ বছর পর ১৮৮০ সালে বেগম রোকেয়া জন্ম গ্রহণ করেন।

উল্লেখ্য, বিশ্বের একমাত্র মুসলিম মহিলা নবাব,  নারী শিক্ষার অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা  চৌধুরাণী কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার পশ্চিমগাঁয়ে  ১৮৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
অত্যান্ত রক্ষণশীল, ধর্মভিরু, চারটি ভাষায় পারদর্শী কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তিনি। 

নবাব ফয়জুন্নেচ্ছার পিতা জমিদার আহমেদ আলী চৌধুরী ও মাতা আরাফাতুন্নেছা চৌধুরানী।  যক্ষা আক্রান্ত পিতাকে মাত্র ১০ বছর বয়সে হারিয়ে এতিম হন তিনি।  গৃহ শিক্ষক মৌলভী তাইজউদ্দীন ফয়জুন্নেছাকে গড়ে তোলেন একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে। নবাব ফয়জুন্নেছার যখন ১৬ বছর বয়স অর্থাৎ ১৮৫০ সালে কলকাতায় লড ডালহৌসি কতৃক বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ভর্তির শর্ত ছিলো নো মুসলিম ও নো মহিলা। গৃহ শিক্ষক মৌলভী তাজউদ্দীনের কাছে বিষয়টির গভীরতা জেনে নবাব ফয়জুন্নেছার মনে দারুণ পীড়া দেয়। 

১৮৬০ সালে ২৬ বছর বয়সে ফুপাতো ভাই জমিদার  গাজী চৌধুরী সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। ১১ বছর তাদের দাম্পত্য জীবনের এক পর্যায়ে মান অভিমান ও শর্ত ভঙ্গের কারণে দূরত্ব সৃষ্টি হয় । প্রতারনায় মাধ্যমে  সতীনের সংসারে ১৫ দিনের বসবাস ও বড় মেয়ে আরশাদুন্নেছাকে জোরকরে কেড়ে নিঃসন্তান সতীন নাজমুনন্নেছাকে দেওয়ার বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি তিনি। 

৫ বছর পশ্চিমগায়ে ৩২ চালা ঘরে তাদের দাম্পত্যজীবন সুখময় ছিলো। কিন্তু পরবর্তী ৬ বছর ছিলো অম্লমধুর। একপর্যায়ে তাদের  মধ্যে আলাদা বা সেপারেশন হলেও তালাক হয়নি। এমনকি দেন মোহরের জন্য মামলা মোকদ্দমা করার বিষয়টিও সঠিক নয়। 

বিয়ের ১০ বছর পর  স্বামী গাজী চৌধুরীর সাথে মনমালিন্যের চরম পর্যায়ে মাতা ও ভাইদের উৎসহে ১৮৭০ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। মেধা ও দক্ষতার সাথে সকল কর্মকান্ড পরিচালনার পাশাপাশি  শিক্ষাপ্রসার,জনকল্যণ ও শিল্প- সাহিত্য প্রসারে মনোনিবেশ করেন তিনি।

উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিশাল ভূ-সম্পত্তি ও জমিদারীর মালিক নবাব ফয়জুন্নেচ্ছা চৌধুরানী তথাকথিত জমিদারদের মত শোষক ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রজাদরদী প্রজাহিতৈষী ও প্রগতিশীল। 

কখনো পালকিতে কখনো ঘোড়ায় গাড়ীতে চড়ে জমিদারি পরিদর্শনে বের হতেন।প্রজা সাধারণের দুঃখ কষ্ট নিজের চোখে দেখে লাঘবের চেষ্টা করতেন। নারী পুরুষ সবার জন্য তাঁর দানের হস্ত ছিল প্রসারিত। শুধুমাত্র  অর্থকড়ির মধ্যেই তার দান সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মসজিদ, স্কুল,মক্তব, এতিমখানা, পুল কালভাট ও শিল্প সাহিত্যের প্রসারসহ বিভিন্ন  জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে আবদান রেখেছেন। তিনি যেমন ছিলেন ধর্মানুরাগী তেমনি ছিলেন সমাজসংস্কারক। তৎকালীন সময়ে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্করকে উপেক্ষা করে তিনি মানুষকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন একজন নারী তার কর্মের মাধ্যমে কিভাবে বিশ্বজয় করতে পারে। নবাব খেতাব প্রাপ্তির বিষয়টি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। 

তৎকালীন ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) জেলা ম্যাজিস্টেট মিস্টার ডগলাস একটি বিশেষ  জনহিতিকর কাজের জন্য অর্থ ঋণ চেয়ে বিভিন্ন জমিদারদের কাছে চিঠি পাঠান। কিন্তু এতে কেউ সাড়া না দিলেও নবাব ফয়জুন্নেছা ১লক্ষ টাকা দেন। পরবর্তীতে মি ডাগলাস  এই ঋণের টাকা ফেরত দিতে গেলে জমিদার ফয়জুন্নেছা বলেন-- 'ফয়জুন' যা দেয়, তা দান হিসেবে দেয়, কর্জ হিসেবে নয়।  ফয়জুন্নেছার এই উদারতার কথা বৃটেনের রাজপ্রাসাদেও আলোচিত হয়। মহারানী ভিক্টোরিয়া খুশি হয়ে এই মহীয়সীকে ১৮৮৯ সালে ' নবাব ' খেতাবে ভূষিত করেন।

১৮৯৩ সালে হজ্জ পালন করতে গিয়ে মক্কায় মোছপালা মুসাফিরখানা, নাহারে জোবাইদা খাল খনন, মাদ্রাসাই সওলাতিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি মক্কা ও মদিনায় প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৭০০ টাকা  সহযোগিতা পাঠাতেন।

কুমিল্লা শহরে নারীদের  চিকিৎসা সেবা দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জানানা হাসপাতাল। যা এখন কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ফয়জুন্নেছা ফিমেল ওয়্যার্ড হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। 
 লাকসামে প্রতিষ্ঠা করেন দাতব্য চিকিৎসালায়।

নিজ জমিদারির ১৪ টি মৌজায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালুর পাশাপাশি  তিনি কলকাতায় নদিয়ায় একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কথা বহুলভাবে আলোচিত। লাকসামের পশ্চিমগাঁয়ে তার প্রতিষ্ঠিত ফয়জিয়া মাদরাসাটি এখন  নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ হিসেবে ইতিহাসের স্বাক্ষী। 

১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ৬৯ বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। লাকসামের পশ্চিমগায় তাঁর নির্মিত ১০গম্বুজ মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত এই মহীয়সী। 

নবাব ফয়জুন্নেসা জনকল্যাণে নিজ বাড়ি সহ ২৯৭ একর জায়গা ওয়াকফ রাহে লিল্লাহ করে যান। সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে যার অধিকাংশই এখন এখন বেদখল হয়ে গেছেন।

২০১৭ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর পশ্চিম গাঁয়ের বাড়ি সহ ৪.৫৪ একর জায়গা গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। যাতে ২০২৩ সালের ৬ নভেম্বর থেকে জাতীয় জাদুঘরে  ৯ম শাখা হিসেবে নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বাড়ি জাদুঘরে কর্মকান্ড চলমান। 

২০০৪ সালে তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নবাব ফয়জুন্নেছাকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রধান করেন।

মহিয়সী এই নবাবের জীবনী ও সাহিত্য কর্ম পাঠ্য পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত, স্বাধীনতা পদক প্রদান, নবাব ফয়জুন্নেছা দিবস পালন ও নারী শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবী।

লেখক : এম এস দোহা, সহ সভাপতি, কুমিল্লা সাংবাদিক ফোরাম' ঢাকা। কো -অর্ডিনেটর :নবাব ফয়জুন্নেছা জমিদার বড়ী জাদুঘর, লাকসাম।  

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status