|
গণ শুনানি নিয়ে নাগরিক প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
মহিউদ্দিন আহমেদ
|
![]() গণ শুনানি নিয়ে নাগরিক প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা আইন ও নীতিমালার সীমাবদ্ধতা: বাংলাদেশে গণশুনানির কোনো একক আইনি কাঠামো নেই। যে সংস্থাগুলি শুনানি করে, তারা নিজেরা নির্দেশিকা অনুযায়ী তা আয়োজন করে। বাংলাদেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কমিশন হচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এই কমিশন বিগত সরকারের সময় প্রতিবছর বাংলাদেশ টেলিযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ এর ৮৭ এর ধারা অনুযায়ী গন শুনানি অনুষ্ঠিত করেছে। যদিও গন শুনানির ধরন নিয়ে আমাদের অনেক আপত্তি ছিল। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে থাকা কমিশন জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। কিন্তু অতি দুঃখের সাথে আমাদের বলতে হচ্ছে সরকার পরিচালনার ১৫ মাস অতিবাহিত হলো কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন গন শুনানি হলো না। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ টেলিযোগ নিয়ন্ত্রণ পলিসি ২০২৫ ক্যাবিনেটে পাশ হয়েছে। অনেক লেয়ার ইতিমধ্যে এই পলিসিতে বাতিল করে দেয়া হয়েছে। আবার নতুন করে অনেক লেয়ার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইজিডব্লিউ , আইসিএক্স, আইআইজি প্রতিষ্ঠানগুলির মালিক এবং কর্মকর্তার কর্মচারী গণ ইতিমধ্যে আপত্তি জানিয়েছে যে, এই পলিসি বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান হারাবে প্রায় ৫০ হাজার কর্মকর্তা কর্মচারী। অন্যদিকে নাগরিক অর্থাৎ গ্রাহকদের সেবা কিভাবে নিশ্চিত হবে সে ব্যাপারে গ্রাহকরা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। বিটিআরসি ইতিমধ্যে গাইডলাইন প্রণয়নের দিকে হাঁটছে। কমিশনের দুর্নীতি অনিয়ম নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। যদিও বিটিআরসি আইন ২০০১ এ গণশুনানির সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই, শুধু “জনস্বার্থে পরামর্শ” বলেছে। কিন্তু জবাবদিহিতা ছিল না যে সরকারের বলে আঙ্গুলি নির্দেশ করা হয় সে সময় তো লোক দেখানো হলেও গন শুনানি হয়েছে এখন হচ্ছে না কেন? সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সরকারের বিরুদ্ধেও ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কমিশনের উচিত ছিল জন স্বার্থেই অথবা নিজেদের স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গন শুনানি অনুষ্ঠিত করার। একইভাবে পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) বা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (BERC)–এর মতো সংস্থাগুলিতে নিয়ম আছে, কিন্তু সেটিও বাধ্যতামূলক নয়। তবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন এর শুনানি বেশ জনপ্রিয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি এবং সাংগঠনিক ভাবে আমরা নিয়মিতভাবে এই গণ শুনানিতে অংশগ্রহণ করে থাকি। যদিও এ সকল গণ শুনানি নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে, অর্থাৎ, আইন জবাবদিহিতা দাবি করে বটে, কিন্তু তা “বাস্তবায়নের ক্ষমতা ও বাধ্যবাধকতা” নির্দিষ্ট করে না। তাই সংস্থা চাইলে শুনানি করতে পারে, না চাইলে বাদও দিতে পারে — সরকারেরও তেমন তদারকি নেই। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জবাবদিহিতার অভাব: বর্তমান সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোতে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তপ্রধানতা (centralized decision making) এত প্রবল যে, বিভিন্ন কমিশন ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা কার্যত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা নির্ভরতার ফলে, কমিশনগুলোর স্বাধীনতা সীমিত। তারা নিজে থেকে বিতর্কিত ইস্যুতে গণশুনানি আয়োজন করতে সাহস পায় না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাধারণত “সমালোচনা”কে “বিরোধিতা” হিসেবে নেয়, ফলে জনমত শুনতে অনীহা তৈরি হয়। সরকারি কর্মকর্তারা মনে করেন, গণশুনানিতে অংশ নেওয়া মানে নিজের কাজের সমালোচনা শোনা — তাই অনেক সময় তারা এড়াতে চান। এটি জবাবদিহিতার সংস্কৃতি দুর্বল করে। প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা: কিছু বাস্তব কারণও আছে যার ফলে গণশুনানির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় —বাজেট সংকট – শুনানির আয়োজন, প্রচার, তথ্য প্রকাশ ইত্যাদির ব্যয় থাকে। প্রশাসনিক অগ্রাধিকার কম – অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করে, এটি মূল কাজ নয়। রাজনৈতিক প্রভাব – গণশুনানিতে অসন্তোষ দেখা দিলে তা সংবাদমাধ্যমে আসে, সরকার তা এড়াতে চায়। অনলাইন স্বচ্ছতা সীমিত – শুনানির রেকর্ড, প্রতিবেদন বা সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া খুব কম প্রকাশিত হয়। নাগরিক অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণ: যখন সরকার বা কমিশন গণশুনানিকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নেয়, তখন নাগরিকদের আগ্রহও কমে যায়। তার ওপর — শুনানির সময় ও স্থান নির্ধারণে জনগণের সুবিধা বিবেচনা করা হয় না, অনলাইন প্রশ্নের সুযোগ সীমিত, ফলাফল প্রকাশ না হওয়ায় বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। অতএব, নাগরিক অংশগ্রহণ বাস্তবে বাধাগ্রস্ত হয়. কীভাবে এই অবস্থা পাল্টানো যায়: আইনে গণশুনানি বাধ্যতামূলক করা – যেমন ভারত বা নেপালের পরিবেশ আইনে আছে। বিটিআরসি ও অন্যান্য কমিশনের স্বায়ত্তশাসন বাড়ানো – মন্ত্রণালয় থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দিতে হবে। শুনানি পূর্ববর্তী প্রস্তাব অনলাইনে প্রকাশ ও জনমত আহ্বান বাধ্যতামূলক করা। শুনানি-পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ ও কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা রাখতে হবে। মিডিয়া ও নাগরিক সংগঠনকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা, যাতে গণশুনানি সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থের ফোরাম হয়। সংক্ষিপ্ত উপসংহার: বাংলাদেশে গণশুনানি এখনো শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা ছিল— আইনি কাঠামোর মধ্যে নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ও বিটিআরসি-সহ সকল কমিশনে নিয়মিত জবাবদিহিতা তৈরি করা। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অনীহা ও আইনি অস্পষ্টতা মিলিয়ে সেই প্রত্যাশা আজও পূরণ হয়নি। তবুও নাগরিক চাহিদা ও ডিজিটাল সচেতনতা বেড়েছে — ফলে ভবিষ্যতে গণশুনানির প্রতি জনদাবি আরও শক্তিশালী হবে বলেই আশা করা যায়। মহিউদ্দিন আহমেদ সভাপতি, বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
ময়মনসিংহে চাঁদা না পেয়ে ড্রেজার লুট: দুই শতাধিক দুর্বৃত্তের ‘ফিল্মি স্টাইলে’ হামলা
ইতালির যাওয়ার পথে নিখোঁজ মাদারীপুরের যুবক, অবশেষে বাড়িতে এলো নৌকাডুবির খবর
ড্যাজেল মোবাইল শপের মালিক দিদারের বিরুদ্ধে অর্থপাচার–চোরাচালান অনুসন্ধানে দুদক
আপোসহীন মমতাময়ী মা বেগম জিয়ার সুস্থতা দেশের জন্য বড় প্রয়োজন: এমপি প্রার্থী বাপ্পী
