ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ৯ জুন ২০২৬ ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলাদেশের মেধা পাচার ও প্রধানমন্ত্রীর উপলদ্ধি
এম. এস. দোহা
প্রকাশ: Monday, 24 July, 2023, 7:25 PM

বাংলাদেশের মেধা পাচার ও প্রধানমন্ত্রীর উপলদ্ধি

বাংলাদেশের মেধা পাচার ও প্রধানমন্ত্রীর উপলদ্ধি

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপলদ্ধির পর সংবাদ শিরোনাম ‘মেধা পাচার’ ইস্যু। যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনে যুগান্তকারী দিক নির্দেশনা হতে পারে। গত ৬ জুলাই ২০২৩ সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে মেধা পাচার ইস্যু নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত বিকশিত ও আধুনিকায়নভিত্তিক উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে মেধা পাচার রোধ গুরুত্বপূর্ণ। মেধাবী, দক্ষ ও উদ্ভাবনী প্রতিভা সাধারণত কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা, অবকাঠামোগত পরিবেশের অভাবে ভিনদেশে স্থানান্তরিত হয়। ফলে দেশের অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান, পরিবেশ, বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা, লেখাপড়ার পাশাপাশি কাজ ও নাগিরকত্বসহ স্থায়ী বসবাসের সুযোগ হলো মেধা পাচারের অন্যতম কারণ। সরকার এ বিষয়ে সচেতন এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে মেধা পাচার রোধে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সত্যিকার অর্থে মেধা পাচার রোধ দুরূহ ব্যাপার। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশ থেকেই মেধা পাচার হয়ে থাকে। তথাপি সরকারের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও নানাবিধ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশের মেধা পাচার নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রতিবছর এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পর আমরা নতুন করে পরিচতি হই এক ঝাঁক মেধাবীর সাথে। কিছুদিন হৈ চৈ। এরপর খবর নেই। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন না থাকায় ছিটকে পড়ে অনেক মেধাবী। এদের অনেকেরই পরবর্তী গন্তব্য রয়ে যায় অন্ধকারে। এনিয়ে হয়না কোনো পর্যবেক্ষণ।

মেধাবী শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ থাকেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। তাদের উদ্দেশ্য যন্ত্রের মতো কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করে বিত্ত বৈভবের পাহাড় গড়া।
 
বাংলাদেশকে চিরতরে গুডবাই জানিয়ে ইউরোপ আমেরিকা পাড়ি দেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা উচ্চ শিক্ষার সম্মানসূচক ডিগ্রি বা থিসিসের জন্য বিদেশ গেলেও নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরে আসেন না। আর্থিক ও বিশেষ সুবিধার কারণে মেধাবীরা অধ্যাপনা বাদ দিয়ে চলে যান ভিন্ন চাকরিতে। এতে শিক্ষাঙ্গনে যোগ্য শিক্ষকের অভাব লক্ষণীয়। মফস্বলের বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোথাও চাকরী জুটাতে না পেরে কম মেধাবীরাই শিক্ষকতায় জড়িয়ে পড়েন।

এক জরিপ দেখা গেছে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্রদের ৯৯ জনই পরবর্র্তীতে চলে যান বিদেশে। ১ম থেকে ১৫তম স্থান অধিকারী ছাত্রদের অবস্থান বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন, পদার্থ ও পরিসংখ্যানে পাসকৃত মেধাবী ছাত্রদের অধিকাংশই এখন বিদেশে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মেধাবী ডাক্তাররা পাস করার পর উচ্চ শিক্ষা নিতে বিদেশে গিয়ে ফিরছেন এ ধরনের নজির খুব কম।

সম্প্রতি ঢাকা গভ: ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের একটি ডাইরেক্টরিতে মেধা পাচারের উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ১৯৭৩ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা কে কোথায় আছেন তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে এ বিষয়টি ধরা পড়ে। ওই ব্যাচের ৮৪ জন ছাত্রের মধ্যে ৩৫ জনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারণ, তাদের অনেকেই স্থায়ীভাবে বিদেশে অবস্থান করছেন। দেশে অবস্থানকারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন বিদেশে পাড়ি জমাবার।  

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দেশের উন্নয়ন ও জাতি গঠনে মেধার সদ্ব্যবহার অত্যাবশ্যকীয়। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সাফল্যের পেছনে রয়েছে মেধার যথাযথ ব্যবহার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান হতাশাজনক। কারণ, মেধাবীরা কেউ বাংলাদেশে থাকতে রাজী নন। তারা প্রহর গোনেন কখন বাংলাদেশকে গুডবাই জানাবেন। এদেশে ভালো কিছু করা অসম্ভব। মেধার মূল্যায়ণ হবে না। এ ধারণার জন্য বাংলাদেশের প্রতি মেধাবীদের এই অনীহা। মনে হয় এ দেশের ১৬ কোটি লোক যদি আমেরিকা বা কানাডায় গিয়ে ডলার কামিয়ে পাঠাতো খুব ভালো হতো। কিন্তু এসব ডলার কোথায়, কিভাবে ও কারা কাজে লাগাবে এ নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের বিগত চারদশকে সম্ভুক গতির উন্নযনের পেছনে রয়েছে মেধা পাচারের বিষয়টি। আর এখনও চরম মেধা শূণ্যতায় ভুগছে বাংলাদেশ। শিক্ষা, চিকিৎসা, কারিগরি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্য আমরা এখন বিদেশমুখী। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও শিল্প ও শিক্ষাখাতে আমরা আশানুরূপ সফলতা অর্জন করতে পারিনি। বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এখনো অনেক পিছিয়ে। জটিল রোগের জন্য ভারত, থাইল্যান্ড অথবা সিঙ্গাপুরে দৌঁড়াতে হয়। অথচ বাংলাদেশের ছেলেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক হিসেবে সুনাম কুড়াচ্ছেন। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক সময় বেরিয়েছে সত্যেন সেনের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফজলুর রহমানের মতো আর্কিটেক্ট, যিনি নিউইর্কস্থ আমেরিকার সর্বোচ্চ ভবনের নকশা প্রণেতা। ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্র খোকন এখন আমেরিকার নামকারা তিনজন চক্ষু চিকিৎসকের মধ্যে অন্যতম। মার্কিন টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখ মুজিবুর আর সিরাজুল বাংলাদেশেরই সন্তান।

বাংলাদেশের অসংখ্যা মেধাবী এখন ভিন্ন দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। বিদেশে অবস্থানরত এসব মেধাবীদের সাফল্য কাহিনী প্রায় সংবাদ শিরোনাম হয়। তাদেরকে আমরা দেশের জন্য কাজে লাগাতে পারিছি না। প্রতিবছর অসংখ্য মেধাবী উচ্চ শিক্ষার পাঠ চুকিয়েও পান না দেশে কর্মক্ষেত্রের সন্ধান। পারেন না আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেধার স্বীকৃতি আদায় করতে। তাই হতাশাগ্রস্ত হয়েই পাড়ি জমান বিদেশে। আবার অনেকেরই আস্থা নেই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষপটের উপর। তাই দেশে থাকলেও গ্রীনকার্ড ও আমেরিকার রঙ্গিন স্বপ্নে বিভোর থাকেন তারা। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারের মতো একজন মেধাবী ছাত্র তৈরি করতে দেশের ইনভেষ্ট হয় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। কর্মজীবনে তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যবহৃত হওয়ার পরিবর্তে অর্থের বিনিময়ে বিদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করছেন। অথচ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় সাপেক্ষে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ ভাড়া করে আনতে হয়। 

বিশ্বে এখন মেধাবীদের কদর সবার উর্ধ্বে। আগে সমরকৌশলে পেশীশক্তির প্রাধাণ্য দেয়া হতো। কিন্তু এখন বিশ্বে চলছে স্মায়ু যুদ্ধের খেলা। কানাডা, অষ্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপ আমেকিায় মেধাবীদের নাগরিক হিসেবে স্থান দেয়া হয় সবার উর্ধ্বে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেধাবীদের লোভনীয় মাধ্যমে এখনো নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী একবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রবাসী ভারতীয় কমিম্পউটার বিশেষজ্ঞদের সাহায্য চেয়েছিলেন। তাদেরকে যথাযথভাবে মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ব্যাঙ্গালোরে প্রতিষ্ঠা করেন কম্পিউটার পল্লী। যার মাধ্যমে ভারত এখন কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। ভারতের আরেক শিল্পপতি বিড়লার উদাহরণ তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি হার্টের চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন লন্ডনে। চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেখলেন ডাক্তারদের অধিকাংশই ভারতীয়। তিনি উপলব্ধি করলেন এসব চিকিৎসকরা যদি ভারতেই থাকতেন তাহলে এতো দূরে তাকে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আসতে হতো না। সুস্থ হয়ে তিনি ভারতীয় চিকিৎসকদের দাওয়াত করলেন। এসব ডাক্তারকে কলকাতায় অনুরূপ একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অনুরোধ করলেন। মিঃ বিড়লা আশ্বস্ত করলেন, লন্ডনের প্রাপ্ত সুবিধা কলকাতাতেই এসব চিকিৎসা দেয়া হবে। বিড়লার সেই পদক্ষেপ হয়েছে সফল। এখন পৃথিবীর বহু দেশ থেকে হার্টের রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন কলকাতার এই বিড়লা হাসপাতালে। এতে বুঝা যায়, কাজের স্বীকৃতি, সুযোগ-সুবিধা, গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করলে মেধাবীদেরও দেশে ধরে রেখে কাজে লাগানো সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। তিনি পাটের জীন আবিষ্কারক প্রয়াত বিজ্ঞানী মাকছুদুল আলমের মতো মেধাবীদের করেছেন যথাযথ মূল্যায়ন ও সম্মান। মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে করেছেন নবদিগন্তের উম্মোচন। রূপপুর পারমানিক কেন্দ্রের কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে দ্রুতগতিতে। অপর সম্ভাবনা দ্বার বঙ্গোপসাগর তথা সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগাতে নিয়েছেন সময়পযোগী ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এগুলোর সুষ্ঠু তদারকির জন্য দক্ষ ও মেধাবী জনবল প্রয়োজন। তাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অন্য মেধাবীদের আহবান জানিয়েছেন দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে। দিয়েছেন তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও প্রতিশ্রুতি। সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেন, দেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগের কারণে মেধাবীরা দেশেই এখন কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। তা ছাড়া সব সেক্টরে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ফলে বাংলাদেশের মেধা পাচার অনেকটাই রোধ হচ্ছে।

সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ, মেধাবীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি প্রদান, সব নিয়োগপ্রক্রিয়ায় মেধার প্রাধান্য, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশিষ্ট ও মেধাবীদের বিভিন্ন পদক, পুরস্কার ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মূল্যায়নের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেন। যা দেশের উন্নয়ন ও মেধা পাচার রোধে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিষ্ট 
উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক নতুন সময়
E-mail:msdoha1@gmail.com, Cell: 01711-327059

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status