ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ২৭ জুলাই ২০২৬ ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
‘আট বছর ধরে বিচার চাইছি, এবার ন্যায়বিচার চাই’, বললেন একরামের স্ত্রী
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Monday, 27 July, 2026, 12:10 PM

‘আট বছর ধরে বিচার চাইছি, এবার ন্যায়বিচার চাই’, বললেন একরামের স্ত্রী

‘আট বছর ধরে বিচার চাইছি, এবার ন্যায়বিচার চাই’, বললেন একরামের স্ত্রী

‘২০১৮ সালের সেই কালরাতের পর থেকে আমাদের জীবনটা থমকে গেছে। দুই মেয়েকে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতা আর অর্থকষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছি। খুনিরা শুধু আমার স্বামীকে কেড়ে নেয়নি, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমাদের পৈত্রিক জমিজমা ও সম্পত্তি জবরদখল করে নিয়েছে। খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমাদের জমি ফেরত দিতে ট্রাইব্যুনাল যেন প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন, এটাই এখন আমার শেষ চাওয়া।’

কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর এভাবেই নিজের প্রত্যাশার কথা জানান তার স্ত্রী আয়েশা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমি বিচার চাই, আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই, আমার স্বামী একরাম হত্যার সঙ্গে জড়িত সব আসামির বিচার চাই। সাবেক সংসদ সদস্য বদি কর্তৃক আমার পিতার কেড়ে নেওয়া জমিও ফেরত চাই।’

২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কের নোয়াখালিয়া পাড়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় নিহত হন একরামুল হক। গভীর রাতে একটি ফোনকল স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো দেশকে। মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে একরামের মোবাইল ফোনটি চালু ছিল। ওপাশে লাইনে যুক্ত ছিলেন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম এবং তাদের দুই সন্তান। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা সেই কথোপকথন কোনো সাধারণ অডিও নয়; তা ছিল একটি পরিবারের বুকফাটা আর্তনাদ এবং একটি রাষ্ট্রীয় নির্মমতার জীবন্ত দলিল।

সেদিনের সেই অডিও রেকর্ড দেশের বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিয়েছিল। ‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে?’—মেয়ের এই প্রশ্নের জবাবে একরাম বলেছিলেন, ‘না আম্মু, আমি কাঁদছি না।’ সেদিন রাতে স্ত্রী আয়েশা বেগমের সঙ্গেও তার কথা হয়। মোবাইলের অডিও রেকর্ডে শোনা যায় আয়েশা বেগমের আকুতি, ‘ও আল্লাহ! তোমরা ওরে কী করলা? হ্যালো হ্যালো!’ ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসছিল বুটের শব্দ, গাড়ির দরজা খোলার আওয়াজ এবং কিছু কর্কশ নির্দেশ। ‘আমি কোনো অন্যায় করি নাই’—একরামের এই শেষ আকুতি ঢাকা পড়ে যায় বুলেটের নিষ্ঠুর শব্দে। এরপর শোনা যায় দুটি গুলির শব্দ এবং এক মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ। দীর্ঘ আট বছর আগে বন্দুকযুদ্ধের নামে ধামাচাপা থাকা সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে একরামের পরিবার।

আয়েশা বেগমের সেই বুকফাটা চিৎকার আর দুই শিশুর কান্নায় সেদিন টেকনাফের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। একটি সাজানো গল্প দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই থেকে আট বছর ধরে অসহায় পরিবারটির চোখে ঘুম নেই। জরাজীর্ণ বাড়িটি পড়ে আছে। মামলাজনিত জটিলতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিহত একরামের দুই সন্তান ও স্ত্রী আয়েশা বেগম ঠিকমতো বাড়িতে থাকতে পারেননি। চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে তাদের।

যে অডিও রেকর্ড বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়

২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের নামে টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের নোয়াখালিয়া পাড়ায় র‍্যাব-৭-এর একটি দল একরামুল হককে ঠান্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করে। তবে মৃত্যুর ঠিক আগমুহূর্তে একরামের মোবাইল ফোনটি সচল ছিল এবং তার স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে লাইন সংযুক্ত ছিল। পরে সেই ফোনে ধারণ হওয়া কথোপকথন, একরামের গোঙানি, মেয়ের আকুতি এবং র‍্যাব সদস্যদের গুলির শব্দসহ অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাংলাদেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনার জেরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে তৎকালীন সরকার। পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

গত ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর একরামের পরিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচারের আশায় মামলা করে। গত ২৬ জুলাই ২০২৬ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হত্যাকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের আদেশ

রাষ্ট্রপক্ষের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল পলাতক শেখ হাসিনাসহ আট আসামির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে বর্তমানে কারাগারে থাকা তিন আসামিকে ট্রাইব্যুনালে সশরীরে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে মামলার পরবর্তী শুনানির দিন আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, অপহরণ, নির্যাতন এবং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে বদি: চিফ প্রসিকিউটর

চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন টেকনাফের সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। তদন্তে উঠে এসেছে, স্থানীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও জনপ্রিয় নেতা হওয়ায় একরামুল হক বদির একচ্ছত্র আধিপত্যের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এ ছাড়া একরামের পরিবারের মালিকানাধীন কোটি কোটি টাকার মূল্যবান সম্পত্তি গ্রাসের পরিকল্পনাও ছিল। রাজনৈতিক ইন্ধন ও ব্যক্তিগত স্বার্থে র‍্যাবকে ব্যবহার করে এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয় এবং পরবর্তীতে একরামের জমি বিভিন্ন কৌশলে ও ক্ষমতার জোরে আত্মসাৎ করা হয়। বদি বর্তমানে অন্য একটি মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন এবং এ মামলাতেও তাকে নতুন করে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

যারা আসামি

তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও আবদুর রহমান বদি ছাড়াও আসামি করা হয়েছে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি ও র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান, মেজর (অব.) রুহুল আমিন, স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ এবং কমান্ডার মো. আশেকুর রহমান সৈকতকে।

আসামিদের বর্তমান অবস্থা

আবদুর রহমান বদি, কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম বর্তমানে অন্য মামলায় কারাবন্দী রয়েছেন। তাদের এই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে (শোন অ্যারেস্ট) আগামী ২৫ আগস্ট ২০২৬ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনাসহ বাকি আট আসামি পলাতক রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

দীর্ঘ আট বছরের লড়াইয়ের পর ট্রাইব্যুনালে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়াকে দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে একরামের পরিবার। তারা এখন তাকিয়ে আছে আগামী ২৫ আগস্টের দিকে, যেদিন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় উঠবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জবাবদিহিতার প্রশ্ন।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status