|
জঙ্গল থেকে আধুনিক ব্রয়লার হয়ে ওঠার যাত্রা
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
|
জঙ্গল থেকে আধুনিক ব্রয়লার হয়ে ওঠার যাত্রা তবে ‘ফার্মের মুরগি’ বা ‘ব্রয়লার’ যে নামেই বলুন না কেন এই মুরগিরর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস। এটি কোনো কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রাণী নয়, আবার হঠাৎ করেও এর জন্ম হয়নি। হাজার বছরের গৃহপালন, কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী বাছাই করা প্রজননের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে আধুনিক ব্রয়লার মুরগি। জঙ্গলের পাখি থেকে মানুষের ঘরের সঙ্গী মুরগির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। গবেষকদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানুষ প্রথম জঙ্গলি মুরগিকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পালন করতে শুরু করে। তবে শুরুতে মুরগি পালনের উদ্দেশ্য ছিল শুধু খাবার নয়। অনেক অঞ্চলে ধর্মীয় আচার, বিনোদন এবং মোরগ লড়াইয়ের জন্যও মুরগি পালন করা হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বুঝতে পারে, মুরগি শুধু সাংস্কৃতিক বা বিনোদনের অংশ নয়, এটি ডিম ও মাংসের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। এরপর মানুষ এমন মুরগি বেছে নিতে শুরু করে যেগুলো বেশি ডিম দেয়, দ্রুত বড় হয় এবং মানুষের পরিবেশে সহজে মানিয়ে নিতে পারে। এই বাছাই করা প্রজননের ধারাবাহিকতাই ধীরে ধীরে আধুনিক মুরগির বিভিন্ন জাত তৈরি করে। ব্রয়লার মুরগির জন্ম কীভাবে? আধুনিক ব্রয়লার মুরগি মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি একটি জাত। এটি কোনো আলাদা প্রজাতি নয়; বরং নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মুরগিকে বহু প্রজন্ম ধরে বেছে বেছে প্রজননের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এমন মুরগি নির্বাচন করেছেন যাদের শরীর দ্রুত বৃদ্ধি পায়, কম খাবারে বেশি ওজন হয় এবং মাংস উৎপাদনের ক্ষমতা বেশি। ফলে বর্তমানের ব্রয়লার মুরগি মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। তবে দ্রুত বৃদ্ধির পেছনে কোনো জাদু বা গোপন উপাদান নেই। এর মূল কারণ হলো উন্নত জেনেটিক নির্বাচন, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক খামার প্রযুক্তি এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। বিশ্বের বাণিজ্যিক ব্রয়লার শিল্পের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ারের কৃষক সিসিল স্টিল মাংস উৎপাদনের জন্য মুরগি পালন শুরু করেন। তিনি ৫০টি মুরগির বাচ্চার অর্ডার দিয়েছিলেন, কিন্তু ভুলবশত প্রায় ৫০০টি বাচ্চা পান। তিনি সেগুলো পালন করেন এবং সফলভাবে বিক্রি করেন। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, মাংস উৎপাদনের জন্য আলাদাভাবে মুরগি পালন একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত বড় হওয়া ও বেশি মাংস উৎপাদনকারী মুরগি তৈরির গবেষণা শুরু হয়। ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় ‘চিকেন অব টুমরো’ প্রতিযোগিতা। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল এমন একটি মুরগির জাত তৈরি করা, যা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং বেশি পরিমাণে মাংস দেবে। এই গবেষণা পরবর্তী সময়ে আধুনিক ব্রয়লার শিল্পের ভিত্তি তৈরি করে। বাংলাদেশে একসময় মুরগি পালন ছিল মূলত গ্রামীণ পরিবারের একটি ছোট আকারের উদ্যোগ। বাড়ির আঙিনা, উঠান বা খোলা জায়গায় দেশি মুরগি পালন করা হতো। এসব মুরগি ধীরে বড় হতো এবং উৎপাদনও ছিল তুলনামূলক কম। আধুনিক পোলট্রি শিল্পের শুরু হয় উন্নত জাতের মুরগি আনার মাধ্যমে। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে উন্নত জাতের মুরগি নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি গবেষণায় ব্রয়লার নিয়ে কাজ শুরু হয়। পরবর্তীসময়ে আশির দশকে উন্নত ব্রয়লার জাত বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে আর্বার একরস-এর মতো উন্নত ব্রয়লার লাইন এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোগ দেশের পোলট্রি শিল্পের বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। নব্বইয়ের দশকের পর বাংলাদেশে ছোট ও মাঝারি খামারের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ব্রয়লার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যের অংশ হয়ে ওঠে। ফার্মের মুরগি নিয়ে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো এগুলোকে হরমোন দিয়ে দ্রুত বড় করা হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিকভাবে ব্রয়লারের দ্রুত বৃদ্ধির প্রধান কারণ হরমোন নয়। আসলে বিশেষ জাত নির্বাচন, উন্নত খাদ্য, সঠিক পরিবেশ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কারণে ব্রয়লার দ্রুত বড় হয়। আধুনিক পোলট্রি শিল্পে জেনেটিক উন্নয়নই এর সবচেয়ে বড় কারণ। আরেকটি ভুল ধারণা হলো, ব্রয়লার মুরগি সম্পূর্ণ কৃত্রিম। বাস্তবে এটি প্রাকৃতিক মুরগিরই একটি উন্নত রূপ, যা মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী বহু বছরের বৈজ্ঞানিক প্রজননের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পর বাংলাদেশে ছোট ও মাঝারি খামারের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে বর্তমানে ব্রয়লার শুধু একটি খাবারের উৎস নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক খাত। একটি মুরগি বাজারে পৌঁছানোর পেছনে কাজ করেন খামারি, হ্যাচারি মালিক, ফিড প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, ওষুধ কোম্পানি, পরিবহন শ্রমিক এবং বাজারের অসংখ্য মানুষ। বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প এখন লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। ছোট গ্রামের খামার থেকে শুরু করে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান-সব মিলিয়ে ফার্মের মুরগি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জঙ্গলের একটি ছোট পাখি থেকে আজকের আধুনিক ব্রয়লার হয়ে ওঠার এই গল্প আসলে মানুষের প্রয়োজন, বিজ্ঞান এবং কৃষির পরিবর্তনের গল্প। কয়েক হাজার বছরের বিবর্তন আর কয়েক দশকের গবেষণার ফলেই আজকের ফার্মের মুরগি আমাদের খাবারের টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
