কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের এক নারী কারারক্ষীর সঙ্গে কথিত অনৈতিক ও আপত্তিকর ফোনালাপের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটি প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করলে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক (জেল সুপার) মোঃ দিদারুল আলমকে তাৎক্ষণিকভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কারা প্রশিক্ষক পদে বদলি করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) কারা অধিদপ্তরের কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রশাসনিক প্রয়োজন ও শৃঙ্খলা রক্ষার্থে মোঃ দিদারুল আলমকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে একইদিন সকাল ১০টার মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করে কর্মস্থল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে চট্টগ্রাম কারাগারের হসপিটালাইজড প্রিজনার্স সিকিউরিটি ইউনিটের কারা তত্ত্বাবধায়ক মোঃ আনোয়ারুল করিমকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-১ এর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তিনিই কারাগারের প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি করবেন।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের জেল সুপার মোঃ দিদারুল আলম এবং একই কারাগারের এক নারী কারারক্ষীর মধ্যকার কথোপকথন রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
ভাইরাল হওয়া ওই অডিওতে জেল সুপারকে নারী কারারক্ষীর ব্যক্তিগত অবস্থান, রুমে একা থাকা, মোবাইল ফোন ব্যবহারসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন করতে শোনা যায়। একই সঙ্গে তিনি নারী কারারক্ষী ও তার সহকর্মী রোজিনাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন বলেও অডিওতে শোনা যায়।
ফোনালাপ তোলে ধরা হলো, তুমি এখন একা রুমে? নারী কারারক্ষী বলেন জ্বি স্যার। তোমাকে আর রোজিনাকে আগামী সপ্তাহে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাব। তোমরা আগে চলে যাবা তারপরে আমি আসবো। পারবা না? তোমাদের রুমে কি টিভি আছে? নারী কারারক্ষী বলেন না স্যার। তোমাদের ব্যারাকে টিভি দিতে বল নাই? জবাবে নারী কারারক্ষী বলে প্রয়োজন পড়ে নাই তাই বলিনি। জেল সুপার বলে এখন তো এসব লাগেনা ওয়াইফাই দিয়েই সব দেখা যায়। জবাবে নারী কারারক্ষী বলে জি স্যার।
তোমার মোবাইল ফোন কি এন্ড্রয়েড। না স্যার, টাচ, টাচ মোবাইল? নারী কারারক্ষী বলে আমার বাটন ফোন। ও, ফোন কিন নাই কেন? জবাবে নারী কারারক্ষী বলে আমার ফোনটা ভাইয়া নিয়ে গেছে আর ভাইয়ার ফোনটা আমাকে দিয়া গেছে। তোমার সামনে কি রোজিনা আছে? না স্যার, রোজিনা আর ওরা বাজারে গেছে। কোথায় বাজারে গেছে, তুমি যাও না বাজারে? না স্যার আমি ভাত রান্না করছিলাম তো তাই তাদেরকে বললাম বাজারে যাওয়ার জন্য। আগামী সপ্তাহে তোমাকে আর রোজিনাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাব। তোমরা আগে যাইবা তারপরে আমি আসবো।
সন্ধ্যায়, পারবা না? জবাবে নারী কারারক্ষী বলে স্যার আমি ঐসব খায় না তো। কি খাওতে? সাপ খাও? সাপ? না স্যার। কি খাও হ্যাঁ? কি খাও? স্যার আমি ভাত ছাড়া কিছুই খায় না। সমস্যা কি তাহলে হোটেলে ভাত খাইবা। স্যার আমি হোটেলের ভাত খাইতে পারি না। হোটেলের মিষ্টি খাইতে পারো না? ফার্স্ট ফুড খাইতে পারো না? জবাবে নারী কারারক্ষী বলে আমি বাইরের খাবার পছন্দ করি না। তাইলে এমনই যাবা, আমাকে খাওয়াবা। তুমি আর রোজিনা আমাকে খাওয়াবা, পারবা না? জবাবে নারী কারারক্ষী বলে স্যার চেষ্টা করব। তুমি এখন একা রুমে? জ্বি স্যার। রোজিনা কি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছে? স্যার তোমাকে আবার ফোন দিয়েছিল কিনা।
তোমাদের মহিলারা তো অনেক কথা জানতে চায়? না স্যার। স্যার ও তো জানেই না। তোমার সাথে আমার ব্যাপারে ওইসব জানে না তো? না স্যার। না জানাই ভালো, তুমি আর আমি জানবো। আমাদের নিজেদের বিষয়গুলো যেন তৃতীয় ব্যক্তি না জানে, তাইলে ওরা নেগেটিভে নিয়ে যাবে। বুঝতে পারছ। আর এটা আমাদের কারা ডিপার্টমেন্টে সবচেয়ে বেশি হয়। আমার কথা বুঝতেছো তুমি। জ্বি স্যার।
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক পর্যায়ে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি ওঠে। ঘটনার সত্যতা ও ভয়াবহতা বিবেচনা করে পরদিনই তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়। তবে ভাইরাল অডিওটির সত্যতা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ করা হয়নি। কারা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।