|
ব্রহ্মপুত্রের পানি কমায় বিপন্ন প্রাণবৈচিত্র্য, টেকসই ব্যবস্থাপনার জোর দাবি
মোঃ মাহবুবুল হাসান, চিলমারী
|
![]() ব্রহ্মপুত্রের পানি কমায় বিপন্ন প্রাণবৈচিত্র্য, টেকসই ব্যবস্থাপনার জোর দাবি তবে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে মৎস্যসম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নদীর প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর নির্দিষ্ট কিছু গভীর অংশকে সরকারিভাবে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমেও এসব এলাকায় পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত খনন বা ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। পাশাপাশি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক নদীর ওপর নির্ভর না করে মৎস্যজীবীদের সমাজভিত্তিক খাঁচায় মাছ চাষ ও বদ্ধ জলাশয়ে জলবায়ু সহিষ্ণু মাছের জাত চাষে প্রশিক্ষণ প্রদানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে রমনা ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকে জেলেরা বিভিন্ন ধরনের জাল নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের অগভীর অংশে মাছ ধরতে ব্যস্ত। জালে ধরা পড়ছে বৈরালি, কাজলি, টাকি, পুঁটি, টেংরাসহ বিভিন্ন ছোট প্রজাতির দেশি মাছ। পানি স্বচ্ছ ও কম গভীর হওয়ায় মাছের ঘনত্ব বেড়েছে। এতে জেলেরা সাময়িকভাবে লাভবান হলেও বিশেষজ্ঞরা একে দীর্ঘমেয়াদে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। ব্রহ্মপুত্রে মাছ ধরা জেলে আসরাফুল (৫৫) বলেন, “পানি কমলে মাছ ধরা সহজ হয় ঠিকই, কিন্তু আগের মতো বড় মাছ আর পাই না। এখন শুধু ছোট মাছ দিয়েই কোনোমতে সংসার চালাতে হয়।” আরেক জেলে ধলু রাম (৪৯) বলেন, “আগে এই সময়ে নদীতে হাঁটু পানি থাকত না। এখন অনেক জায়গায় নদী শুকিয়ে বালুচরে পরিণত হয়েছে। নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে, মাছের থাকার জায়গাও কমে যাচ্ছে।” নদী আন্দোলন কর্মী জাহানুর রহমান বলেন, “নদীর পানি কমে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় এ ব্রহ্মপুত্র নদেই অর্ধশতাধিক দেশি প্রজাতির মাছ ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক মাছ ভাটির দিকে সরে গেছে, আবার কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে।” তিনি আরও বলেন, “কম পানিতে সহজে মাছ ধরা পড়ায় শুষ্ক মৌসুমে জেলেরা আপাতদৃষ্টিতে লাভবান হলেও এটি একটি ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি সংকেত। এভাবে মা মাছ ধরা পড়ছে, বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে মারাত্মক মাছের সংকট দেখা দিতে পারে।” চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বদরুজ্জামান মিঞা বলেন, “এই সময়ে পানি কমে যাওয়ায় মাছ সংকীর্ণ স্থানে চলে আসে, যা জেলেদের জন্য ইতিবাচক মনে হতে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং উজানের পলি জমে তলদেশ ভরাট হওয়া একটি বড় সমস্যা। এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে, যেন তারা ছোট পোনা মাছ না ধরে এবং ক্ষতিকর ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহার না করে। অন্তত ব্রহ্মপুত্র নদে খণ্ডকালীন ১০টি অভয়াশ্রম স্থাপন করে দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক কলাকৌশল, আইন ও টেকসই মাছ ধরার পদ্ধতি বিষয়ে জেলেদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা জরুরি।” স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে। জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পিত নদী ড্রেজিং ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
