ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ১৫ জুন ২০২৪ ১ আষাঢ় ১৪৩১
মন্ত্রী-এমপির স্বজন তোষণ: রোগ নয় উপসর্গ
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: Thursday, 25 April, 2024, 8:58 AM
সর্বশেষ আপডেট: Thursday, 25 April, 2024, 9:55 AM

মন্ত্রী-এমপির স্বজন তোষণ: রোগ নয় উপসর্গ

মন্ত্রী-এমপির স্বজন তোষণ: রোগ নয় উপসর্গ

বিএনপি ও তার মিত্রদের বর্জনের মুখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যখন একেবারেই নিরুত্তাপ হয়ে পড়ছিল, তখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় নিয়ন্ত্রণ খানিকটা শিথিল করে দলের মনোনয়নবঞ্চিতদেরও স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে উৎসাহ দেয়। এ ব্যবস্থা নির্বাচনের ধ্রুপদি সংজ্ঞাসম্মত নয় বলে এর বিরুদ্ধে অনেকে সমালোচনামুখর হলেও, সাধারণ ভোটারদের উৎসাহে ভাটা পড়েনি। 

এ ধারণা অমূলক নয়, নির্বাচনে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে যে তিন হাজারের বেশি নেতা ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন চেয়েছিলেন; স্বতন্ত্র প্রার্থিতার পক্ষে সময়মতো সিদ্ধান্ত এলে তাদের বড় অংশ সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করত। এতে নির্বাচনটি আরও জমজমাট হতো। আর কিছু না হোক, এর ফলে দুই দফা একতরফা জাতীয় নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের মৌরসিপাট্টা খানিকটা ঝাঁকুনি খেত। হয়তো এ প্রক্রিয়ায় দলের শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটারদের প্রকৃত মনোভাব আঁচ করতে পারতেন।


স্মরণ করা যেতে পারে, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় নেতাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, কেউ যেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হওয়ার সাধ না করে। কিন্তু বহু নেতা নিজেদের আসনে ঢাল-তলোয়ারবিহীন ‘ডামি’ প্রার্থী রেখে নানা অপকৌশল প্রয়োগ করে অন্যদের বসিয়ে দিয়ে এক প্রকার সাজানো নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। উপরন্তু নির্বাচনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগের দিনও আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষস্থানীয় নেতা দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন; তাদের পক্ষাবলম্বনকারী নেতাকর্মীকে হুমকি-ধমকি দিয়েছেন। এসব কারণে দেখা গেছে, সরকারদলীয় বহু নেতা উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত পদ ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও নির্দিষ্ট দিনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। শুধু খোদ প্রধানমন্ত্রী যখন তাদের অবাধ প্রচারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন, তখন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনে একটু বল পান। অবশ্য এত কিছুর পরও আমরা দেখেছি, প্রায় ১০০ আসনে নৌকা ও কথিত বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে জোরদার লড়াই হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের বহু আপাত-অপরাজেয় এমপির সর্বনাশ ঘটিয়ে নজিরবিহীনভাবে ৬২ জন স্বতন্ত্র এমপি পাস করেন।

ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশনের গা-ছাড়া ভাবের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনে ক্ষমতাসীন এমপিদের প্রভাব থাকার পরও একযোগে এতজন নতুন এমপির উত্থান সম্ভবত সরকারপ্রধানকেও চমৎকৃত করেছে। না হলে, একই রেসিপি তিনি চলমান উপজেলা নির্বাচনেও প্রয়োগ করার চেষ্টা করতেন না। লক্ষণীয়, এবার বেশ আগেভাগেই তিনি দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে নির্বাচনকে আক্ষরিক অর্থেই উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন জামানতের টাকা কয়েক গুণ ধার্য করলেও, বিশেষত নির্দিষ্টসংখ্যক ভোটারের সমর্থনসহ মনোনয়নপত্র জমাদানের শর্ত তুলে দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ অবারিত করেছে। নিঃসন্দেহে এসব সিদ্ধান্ত একটা অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় নির্বাচনের জন্য সহায়ক। এমন পরিবেশে প্রতিটি উপজেলায় একাধিক শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নামার কথা। এতে ভোটাররাও পছন্দের নেতা বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতেন। কিন্তু অন্তত প্রথম দুই ধাপের পরিস্থিতি দেখে বলা যায়, সে আশা আপাতত তিরোহিত। 

সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রথম ধাপের ১৫০ উপজেলার মধ্যে অন্তত ৩৩টিতে স্থানীয় এমপির স্বজন চেয়ারম্যান পদে হয় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন অথবা সাজানো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। এর বাইরে ‘মাইম্যান’ বলে পরিচিত বিভিন্ন স্থানে এমপির একান্ত অনুগত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের হিসাবে নিলে প্রথম দু’দফার নির্বাচনে বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন উপজেলার সংখ্যা নিঃসন্দেহে আরও বাড়বে।

উল্লেখ্য, সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক ইতোমধ্যে একাধিকবার প্রকাশ্যে বলেছেন, দলীয়প্রধান মন্ত্রী-এমপির স্বজনকে নির্বাচন থেকে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং সে নির্দেশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-এমপির কাছে পৌঁছেও দেওয়া হয়েছে। তার পরও প্রথম দু’দফার নির্বাচনে পরিস্থিতির তেমন ইতরবিশেষ ঘটেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে, নাটোরের সিংড়া উপজেলার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি না ঘটলে কি উপজেলা নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপির স্বজনের প্রার্থিতার বিষয়টি এতটা আলোচনায় আসত? বিনা ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান হতে আগ্রহী স্থানীয় এমপি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের শ্যালক তার দুলাভাইয়ের প্রভাব খাটিয়ে অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে বসিয়ে দিতে সক্ষম হলেও দেলোয়ার হোসেনকে মনোনয়নপত্র জমাদান থেকে বিরত রাখতে পারছিলেন না। তাই তিনি দেলোয়ারকে গুম করার চেষ্টা করেন। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ঘটনাটা ব্যাপক জানাজানি হলে দলের শীর্ষ মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে শুধু ওই প্রতিমন্ত্রীর শ্যালক নন; সব মন্ত্রী-এমপির স্বজনেরই নির্বাচন করার ওপর দলীয় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। 

লক্ষণীয়, সিংড়ার ঘটনার আগে শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক বিভিন্ন বিভাগের দলীয় নেতাদের সভায় উপজেলা নির্বাচনে মূলত মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে এখন আর কথাই হচ্ছে না। অথচ বিগত প্রায় সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সংশ্লিষ্ট নির্বাচিত বিধি ভেঙে সরকারদলীয় এমপিদের নিজ এলাকায় বশংবদ ব্যক্তিকে জিতিয়ে আনার চেষ্টা।

মোদ্দা কথা, সরকারের আসন্ন উপজেলা নির্বাচনকে অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বিতাময় করার চেষ্টা যে এক প্রকার ভন্ডুল হতে বসেছে, তার মূল কারণ এলাকায় মন্ত্র-এমপির প্রভাব একচ্ছত্র করার চেষ্টা। উপজেলা নির্বাচনে তাদের স্বজনকে যে কোনো মূল্যে বিজয়ী করার প্রয়াস যার একটা উপসর্গ মাত্র। রোগ সারাতে হলে রোগের উপসর্গ নয়, কারণেরই চিকিৎসা করতে হয়– কে না জানে! 

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মন্ত্রী-এমপির স্বজনের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হলে গোড়ায় হাত দিতে হবে। তার জন্য প্রথমেই স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষের ওপর বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অলিখিত সুযোগ বন্ধ করতে হবে। 

আমরা জানি, পূর্বসূরিদের মতো বর্তমান সরকারও থানা এবং মাঠ প্রশাসনকে স্থানীয় বিশেষত সরকারদলীয় এমপির ‘পরামর্শ’ মেনে চলার অলিখিত নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। ফলস্বরূপ একদিকে উপজেলা প্রশাসন এমপির কথার বাইরে যায় না, অন্যদিকে এমপির সম্মতি ছাড়া থানা এমনকি মামলাও নেয় না। রীতিমতো আইন করে স্থানীয় এমপিকে উপজেলা পরিষদের মাথার ওপর বসিয়ে দেওয়ার ফলে তৃণমূলের উন্নয়ন এখন প্রায় পুরোপুরি এমপির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অবশ্য এ কথাও বলা দরকার, এমপি বিরোধীদলীয় হলে তাকে কোণঠাসা করে হয় সংরক্ষিত নারী আসনের সরকারদলীয় সদস্য অথবা স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই সব কাজে প্রাধান্য পান। 

আজকে ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ এমপি যে নিজ নিজ এলাকায় এক প্রকার জমিদারতন্ত্র কায়েম করেছেন, তা কিন্তু সরকারেরই ওই ভুল নীতির ফল। এ ব্যবস্থা আজ এতটাই আগ্রাসী রূপ নিয়েছে, তা বিরোধী দল তো বটেই, বুমেরাং হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নানা গৃহদাহের জন্ম দিয়ে সরকার 

দলীয় সংগঠনকেও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার যত দ্রুত এ বাস্তবতা উপলব্ধি করবে তত দেশের মঙ্গল, দলেরও মঙ্গল।

� পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ �







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: [email protected]
কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status