ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১২ জুন ২০২৬ ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
পৃথিবীটাকে বোঝা চাই, তাকে বদলানোর জন্য
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: Tuesday, 16 April, 2024, 12:57 PM

পৃথিবীটাকে বোঝা চাই, তাকে বদলানোর জন্য

পৃথিবীটাকে বোঝা চাই, তাকে বদলানোর জন্য

সমাজে প্রতিরোধ যে ঘটছে না তা নয়। গণপিটুনির কথা শুনি। তাতে কথিত অপরাধীর (সব সময়ে যে খাঁটি অপরাধী তা অবশ্য নয়) মৃত্যু ঘটে, কিন্তু অপরাধ বিদায় হয় না। মুন্সিগঞ্জের যে ছেলেরা বখাটেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল তাদের একজনকে তো প্রাণই দিতে হলো বখাটেদের ছুরিকাঘাতে। শুনলাম ঢাকার মিরপুর এলাকায় (যেখানে কিশোর গ্যাং খুবই তৎপর) একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন ছাত্রী উত্ত্যক্তকারী এক সহপাঠীকে ধাওয়া করেছে এবং ধরে ফেলে পিটিয়ে দিয়েছে। সাহসী কর্মের দৃষ্টান্ত বটে। তবে সমাধান তো নয়। প্রয়োজন সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ।

সেটাও অবশ্য ঘটছে। গাজাতে ফিলিস্তিনিরা লড়ছে। ইউক্রেনের মানুষ রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দু’বছর ধরে প্রতিরোধ-সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। ভারতে কৃষক-সংগ্রামীরা আবার দিল্লি অভিমুখে রওনা হয়েছে। ইউরোপে আধুনিককালে যা কখনো ঘটেনি তাও ঘটেছে। কৃষকরা চলে এসেছে রাজধানীতে, নিজেদের দাবি আদায় করার লক্ষ্যে। এর আগে শ্রমিকরা এসেছে, ছাত্ররা এসেছে, নারীবাদীরা এসেছে; কিন্তু কৃষক আসেনি। তবে এ সবই হচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। প্রয়োজন হলো সুসংগঠিত, ধারাবাহিক সংগ্রাম এবং তার জন্য আবশ্যক যেমন ঐক্য, তেমনি শত্রুকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিতকরণ। মূল শত্রু কিন্তু পুঁজিবাদ; তাকে পাশ কাটিয়ে গেলে প্রতিরোধের সংগ্রাম তার লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হবে। এবং লক্ষ্য যে, সামাজিক বিপ্লব সেটাও সঠিকভাবে জানা চাই। এমনকি অভ্যুত্থানও কাজ দেবে না, লক্ষ্য স্থির না থাকলে।

অভ্যুত্থান তো আমরাও ঘটিয়েছি। নব্বই সালে অভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারের পতন এবং গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার জন্য। একজন স্বৈরাচারীর পতন ঘটল ঠিকই কিন্তু সত্যিকারের গণতন্ত্র তো প্রতিষ্ঠিত হলো না, বরং দেখা গেল কয়েক বছর জেলে কাটিয়ে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কেবল যে রাজনীতিতেই ফেরত চলে এলেন তা-ই নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারও হতে পারলেন। এর আগে খুব বড় এক অভ্যুত্থান ঘটেছে ঊনসত্তরে। প্রায়-বৈপ্লবিক ঘটনা। আর একাত্তরে তো আমরা অবিশ্বাস্য এক জয়ের মধ্য দিয়ে নতুন একটি রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করে ফেললাম। কিন্তু কই জনগণের মুক্তি তো এলো না।

কেন যে এলো না তার ব্যাপারটা মোটেই জটিল বা অস্পষ্ট নয়। এলো না এই জন্য যে, রাষ্ট্র রয়ে গেল ঠিক সেই আগের মতোই আমলাতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী। শাসক বদলাল কিন্তু শাসন (অর্থাৎ শোষণ) বদলাল না। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচারও আগের মতোই চলতে থাকল। সেই ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় থেকে যে সামাজিক বিপ্লবের জন্য প্রতীক্ষা চলছিল তার অবসান ঘটল না।

সামাজিক বিপ্লবের জন্য কী প্রয়োজন ছিল সেটা লেনিন বুঝেছিলেন এবং জানিয়েও গেছেন। সে তো একশ’ বছরেরও আগের ঘটনা। লেনিনের শিক্ষাটা ছিল এই যে, বিপ্লবের জন্য স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্বতঃস্ফূর্ততা প্রয়োজন হবে, কিন্তু তাকে থাকতে হবে সংগঠনের পরিচালনার ভেতরে। এক কথায়, বিপ্লবের জন্য বিপ্লবী পার্টি চাই। যেটা আমাদের কোনো অভ্যুত্থানেই ছিল না। ছিল না একাত্তরেও। যে জন্য বিপ্লবের সম্ভাবনা ছিনতাই হয়ে গেল, রাষ্ট্র চলে গেল বুর্জোয়াদের দখলে। পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের সরিয়ে দিয়ে তাদের খালি জায়গাটাতে বসে গেল বাংলাদেশের উঠতি বুর্জোয়ারা।

সামাজিক বিপ্লবের জন্য বিপ্লবী পার্টি তো থাকতেই হবে, দরকার হবে বিপ্লবী তত্ত্বেরও। বিপ্লবী তত্ত্ব ব্যাখ্যা করবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে। চিহ্নিত করবে দ্বন্দ্বগুলোকে এবং তাদের মধ্য থেকে বিশেষভাবে চিনে নেবে প্রধান দ্বন্দ্বটিকে। পৃথিবীটাকে বোঝা চাই, তাকে বদলানোর জন্য।

এই বুঝটা কারা দেবেন? দেবেন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীরা। গভীর পণ্ডিত বা প্রাজ্ঞ অধ্যাপকরা পারবেন না দিতে, যদি তারা বিপ্লবী না হন এবং বিপ্লবের প্রয়োজনে বিদ্যমান রাষ্ট্র ও সমাজকে ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ হন। সামাজিক বিপ্লব অবশ্যই পুরাতন বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে রক্ষা করবে না; তাকে ভেঙে ফেলে ক্ষমতার পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাবে।

মূল কাজটা তাই রাজনৈতিক, কিন্তু রাজনৈতিক কাজটা করা সম্ভব হবে না সাংস্কৃতিক কাজ না থাকলে। আজ তাই প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক জাগরণের। সে জাগরণ লক্ষ্যবিহীন হবে না; লক্ষ্য হবে সামাজিক বিপ্লবকে সম্ভব করে তোলা। সামাজিক বিপ্লবের মূল শর্তটা হলো সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গাতে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা। পুঁজিবাদ তার শীর্ষে পৌঁছে গেছে, এখন সে যদি আরও এগুতে চায় তবে নিচে নামা ছাড়া উপায় নেই। পতনের পথ বিপজ্জনক; বলা যায় ধ্বংসাত্মক। ইতিহাসের চাকাকে এখন পরিচালনা করা চাই সমষ্টিগত মালিকানার নতুন পথেÑ কোনো এক দেশে নয়, সব দেশে, পৃথিবীজুড়ে। নইলে ভয়ানক বিপদ অপেক্ষা করছে সামনে।

দুটি ঘটনা একদিনেই ঘটেছে। একটি বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের এক গ্রামে; অপরটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে। একটিতে ঋণগ্রস্ত এক মহিলা আত্মহত্যা করেছেন, অপরটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর একজন সদস্য আত্মাহুতি দিয়েছেন। দুটোই কিন্তু প্রতিবাদ, বিদ্যমান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

বাংলাদেশের মহিলার স্বামী সৌদি আরব গেছেন জীবিকার খোঁজে। যাবার জন্য তাকে ঋণ করতে হয়েছিল ৮ লাখ টাকা। সেই ঋণ তিনি শোধ করতে পারেননি। সুদে-আসলে মিলে অংকটা দাঁড়িয়েছিল ১২ লাখ। ঋণদাতারা প্রতিদিন মহিলার বাড়িতে আসত টাকার জন্য। কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে মহিলা তার পুত্র ও কন্যাকে খাবারের সঙ্গে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন, এবং পরে ঘরের আড়ার সঙ্গে দড়িতে ঝুলিয়ে নিজেকে শেষ করে দিয়েছেন। মার্কিন বিমান বাহিনীর সদস্যটি ফিলিস্তিনিদের উপরে ইসরায়েলি গণহত্যার প্রতি তার দেশের সরকারের পক্ষপাত প্রদর্শন সহ্য করতে পারেননি। প্রতিবাদের জন্য কোনো উপায় দেখতে না পেয়ে নিজের গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছেন ওয়াশিংটনের ইসরায়েলি দূতাবাসের সামনে দাঁড়িয়ে। মৃত্যুর আগে চিৎকার করে তিনি বলে গেছেন, ‘ফিলিস্তিন মুক্ত হোক।’

এসব প্রতিবাদ অত্যন্ত উঁচু মাপের কাজ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এতে তো ব্যবস্থাটা বদলাবে না। তবে এসব প্রতিবাদ এই কথাটাই বলছে যে, অমানবিক ব্যবস্থা বদলানোর জন্য সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় খোলা নেই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status