শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ঘুরে দাঁড়ানো শাপলা খাতুনের গল্প
নতুন সময় প্রতিনিধি
প্রকাশ: Wednesday, 9 March, 2022, 7:54 PM
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ঘুরে দাঁড়ানো শাপলা খাতুনের গল্প
ছোট থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধী, পরিবারে ছিল আর্থিক অনটন৷ অবহেলা-বঞ্চনার শিকার হয়েছেন পদে পদে৷ কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে আজ তিনি সমাজের বোঝা নন৷ উচ্চশিক্ষিত হয়েও ভ্যান চালিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন৷ গ্রাম থেকে গ্রামে, কখনো শহরে ছুটে বেড়াচ্ছেন৷ তিনি শাপলা খাতুন (৩২)৷
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের হরিপুর গ্রামের মন্ডলপাড়ার চাঁদ আলীর মেয়ে শাপলা৷ তার মায়ের নাম জোছনা খাতুন৷ চার ভাইবোনের মধ্যে শাপলা দ্বিতীয়৷ সবার বড় একমাত্র ভাই আর তিন বোনের মধ্যে শাপলা বড়৷ সবার বিয়ে হয়ে গেছে৷
শাপলা ভালোবেসে ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে কুষ্টিয়া শহরের হরিশংকরপুর এলাকার আব্দুস সালামকে বিয়ে করেন৷ প্রতিবন্ধী হওয়ায় শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি৷ তাই বাবার বাড়িতেই থাকেন৷ এক বছর আগে তাদের বিয়ে মেনে নেয় তার শাপলার শ্বশুরবাড়ির লোকজন৷
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রথমে স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন শাপলা৷ তারপর ভর্তি হন হাটশ হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে৷ তারপর বিএম কুষ্টিয়া হাই স্কুল থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাশ করেন৷ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১০ সালে একই কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেন৷
ছোটবেলা থেকেই মেধাবী শাপলা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে গ্রাজুয়েট হওয়ার পরও অনেকভাবে অবহেলার শিকার হয়েছেন৷ সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করেছেন৷ না পেয়ে বেসরকারি চাকরি জন্যেও ঘুরেছেন দ্বারে দ্বারে৷ কিন্তু কোথাও চাকরি পাননি৷ কিন্তু দমে যাননি তিনি৷ প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সেবামূলক কাজ করছেন৷
শাপলা খাতুনের স্বামী আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমার স্ত্রী খুবই পরিশ্রমী মানুষ৷ ফার্নিচার, খাদ্যসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করে৷ সে ব্যবসা করে সফল হয়েছে৷ তাছাড়া সংগঠনের নেতা হিসাবে এলাকার প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে কাজ করছে৷ স্ত্রীকে নিয়ে আমি গর্ব করি৷’
তিনি আরো জানান, চারিদিকে লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা সইতে না পেরে শাপলার জেদ চাপে৷ তখন তিনি ভাবতে থাকেন নিজের পরিবার ও ভবিষ্যতের জন্য কিছু একটা করতেই হবে৷ তখন তার মাথায় ব্যবসার চিন্তা আসে৷ প্রথমে ভ্যান চালানো শেখেন৷ তারপর একটা পুরোনো ভ্যান কেনেন৷ মাত্র ২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২০১৭ সালে চালের ব্যবসা শুরু করেন৷ আজ শাপলা সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন৷ তার এই কর্মপ্রচেষ্টা ও সফলতায় মুগ্ধ স্থানীয় এলাকাবাসি৷
শাপলা খাতুন বলেন, ‘আগে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না৷ অর্থের অভাবে কষ্ট করে পড়ালেখা করতে হয়েছে৷ ডিগ্রি পাশ করেও কোন চাকরি পাইনি৷ তারপর প্রতিবন্ধীদের সংগঠনে প্রজেক্টের মাধ্যমে কাজ শুরুর পর তারা বেতন দিত৷ তাছাড়া কোন মিটিং বা অনুষ্ঠান হলেও টাকা পেতাম৷ এভাবেই শুরুটা৷ সংগঠনের কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন আমি সমাজের অবহেলিত প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে তাদের বিভিন্ন সহায়তা দিই৷’
সরকারি চাকরির জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারি চাকরি কপালে জোটেনি৷ এজন্য ইঞ্জিনচালিত ভ্যান চালানো শিখি৷ তারপর ২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ২০১৭ সালে চালের ব্যবসা শুরু করি৷ কুষ্টিয়া শহর থেকে চাল কিনে এনে বিভিন্ন গ্রামে সেগুলো বিক্রি করি৷ আমার সাথে ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আব্দুল হালিম ভাই যুক্ত আছেন৷ আমরা দুজন মিলে সারাদিন ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত সময় পার করি৷ আস্তে আস্তে আমাদের পুঁজি ও ব্যবসার পরিধি বেড়েছে৷ সবকিছু মিলিয়ে এখন আমরা অনেক ভালো আছি৷’
তিনি আরো বলেন, ‘সফল হতে হলে ধৈর্য আর সাহস লাগে৷ আমি অন্যের উপর নির্ভরশীল নই৷ অনেক বাধা পেরিয়ে আমি সফল হয়েছি৷ ব্যবসা করে টাকা জমিয়েছি, বাড়ি করেছি৷ আগামীতে ব্যবসার পরিধি আরো বাড়াতে চাই৷ আমার মত যারা সমাজে অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার সেসব প্রতিবন্ধীর কল্যাণে কাজ করতে চাই৷’
শাপলা খাতুনের ব্যবসায়িক পার্টনার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আব্দুল হালিম বলেন, ‘পরিশ্রমের মাধ্যমে শাপলা আপা সফল হয়েছেন৷ সকালবেলা ইঞ্জিনচালিত ভ্যান চালিয়ে আপা শহরে যান৷ প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে গ্রামে ফিরে আসেন এবং গ্রাহকদের বাড়ি বাড়ি সেসব পণ্য পৌঁছে দেন৷ পুরোটা সময় আমি আপার সাথে থাকি৷ চারপাশে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে৷ তিনি খুব ভালো মানুষ৷ তার সাথে থেকে আজকে আমিও সফল হয়েছি৷ ভালো আছি৷’
প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে একসময় সমাজে অনেক বিপদে পড়েছেন শাপলার মা৷ নিজের মেয়েকে মানুষ তিরস্কার করত বলে তার চোখে সবসময় ছিল চাপাকান্না৷ কিন্তু আজ যখন দেখেন তার মেয়ে সকল প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সফল হয়েছে তখন পেছনের সকল দুঃখ আর গ্লানি ভুলে যান তিনি৷
শাপলার মা জোছনা খাতুন বলেন, ‘তিন মাস বয়সে শাপলার খুব জ্বর হয়েছিল৷ তারপর থেকে সে পায়ে শক্তি পায়না৷ অনেক চিকিৎসা করিয়েছি, কিন্তু সে সুস্থ হয়নি৷ কিন্তু ছোটকাল থেকে সে ছিল মেধাবী আর পরিশ্রমী৷’ তিনি আরো জানান, আজ ৩২ বছরের শাপলা প্রমাণ করেছে সব প্রতিবন্ধকতাকেই হারিয়ে দেওয়া যায় আত্মবিশ্বাস দিয়ে৷ সেদিন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া মায়ের কাছে আজ তার মেয়ে কোন ব্যর্থতা নয়, গর্ব ও সফলতার প্রতীক৷
স্থানীয় ও প্রতিবেশীরা জানান, প্রতিবন্ধী হলেও অনেক বাধা পেরিয়ে শাপলা খাতুন নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন৷ অন্যের বোঝা না হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন৷ এলাকার অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষদের সহযোগিতা করেন৷ এ কারণে এলাকার মানুষ তাকে খুবই ভালোবাসে৷
হাটশ হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম মুশতাক হোসেন মাসুদ বলেন, ‘শাপলা খাতুন প্রতিবন্ধী নারী হয়েও উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন৷ সেবামূলক নানা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত৷ ইঞ্জিনচালিত ভ্যান নিয়ে গ্রাম থেকে শহরে ছুটে বেড়ান৷ ফার্নিচার ও খাদ্যসামগ্রীর ব্যবসা করেন৷ একজন নারী হয়েও ব্যবসা করে সংসার চালাচ্ছেন, সফলতা পেয়েছেন, এলাকার মানুষের কাছে সুনাম কুড়িয়েছেন এটা সমাজের জন্য একটা দৃষ্টান্ত৷’
কুষ্টিয়া জেলা সমাজসেবা অফিসের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ মুরাদ হোসেন বলেন, ‘শাপলা খাতুন একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী৷ তিনি নিজ উদ্যোগে ব্যবসা করে সফল ও স্বাবলম্বী হয়েছেন৷ পাশাপাশি পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করে আসছেন৷ সব প্রতিবন্ধীর জন্য শাপলা অনুপ্রেরণার নাম৷ আশা করি ভবিষ্যতে তার সফলতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে৷ কুষ্টিয়া সমাজসেবা অফিসের পক্ষ থেকে যে কোন ধরণের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে আমরা হাত বাড়িয়ে দেবো৷’