ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শনিবার ● ৭ নভেম্বর ২০২৬ ● ২২ কার্তিক ১৪৩৩
ক্লাসের ফাঁকে করিডোরে রোদ-বৃষ্টিতে সময় কাটে নারী শিক্ষার্থীদের, নেই পর্যাপ্ত কমনরুম
খাদিজা তুল কোবরা, ইবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: Saturday, 7 November, 2026, 6:26 PM

ক্লাসের ফাঁকে করিডোরে রোদ-বৃষ্টিতে সময় কাটে নারী শিক্ষার্থীদের, নেই পর্যাপ্ত কমনরুম

ক্লাসের ফাঁকে করিডোরে রোদ-বৃষ্টিতে সময় কাটে নারী শিক্ষার্থীদের, নেই পর্যাপ্ত কমনরুম

উচ্চশিক্ষার আলোতে আলোকিত হতে হাজারো শিক্ষার্থী ছুটে আসেন দেশের স্বাধীনতা উত্তর প্রতিষ্ঠিত প্রথম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি)। যেখানে বিভিন্ন কোর্সে পড়াশোনা করছে প্রায় ১৮ হাজার দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী, যার প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী নারী। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবুজ ক্যাম্পাস খ্যাত ইবির মনোরম পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো নারী শিক্ষার্থীর এক নীরব দুর্ভোগের গল্প। সে গল্পের শিরোনাম ‘কমনরুম’। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চলমান ৩৬টি বিভাগের বেশিরভাগ বিভাগেই নেই নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত কমন রুম বা ছাত্রী বিশ্রামাগার। বিভাগভিত্তিক প্রয়োজনীয় কমনরুম না থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী শিক্ষার্থীরা। ক্লাসের ফাঁকে অবসর সময় কাটানো, পরিহিত জামাকাপড় প্রয়োজনে পরিপাটি করা, নামাজ পড়া কিংবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো জরুরি মুহূর্তেও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব যেন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে, আবাসিক হল সংকটের কারণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ শহর থেকে প্রতিদিন বাস বা অন্যান্য যানবাহনে যাতায়াত করেন। ক্যাম্পাস থেকে শহরের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস নির্দিষ্ট সময়ে চলাচল করায় শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়েই ক্লাসের সময়ের অনেক আগেই ক্যাম্পাসে এসে পৌঁছাতে হয়। ক্লাসের মাঝে বিরতিতেও বিভাগের করিডোর কিংবা খোলার মাঠে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই পরবর্তী ক্লাসের জন্য বা ছুটি হলে নির্দিষ্ট শিডিউলে চলা বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

দীর্ঘ সময় বিভাগে উপস্থিত থাকায় ছাত্রীদের নানামুখী সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ক্লাসের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া, ব্যক্তিগত জরুরি প্রয়োজন মেটানো, ধর্মীয় প্রার্থনা কিংবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে একটু নিরিবিলি থাকার মতো ন্যূনতম সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। কমন রুমের তীব্র সংকট নারী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও জানান শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিভাগে কমন রুমের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত অপ্রতুল। ফ্যান, চেয়ার, টেবিল ও বিশ্রামের প্রাথমিক ব্যবস্থা থাকলেও অনেক কক্ষে মুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের নামাজের জন্য আলাদা কোনো জায়গা রাখা হয়নি। কোনো কোনো বিভাগে আবার ওয়াশরুমের পাশের ছোট্ট একটি অংশকে কোনোমতে বসার জায়গা বানিয়ে কমন রুম হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে নাজুক অবস্থা মীর মোশাররফ হোসেন ভবনের। এই ভবনে মোট পাঁচটি বিভাগ পরিচালিত হলেও নিচতলায় রয়েছে মাত্র একটি কমন রুম। সেখানেও রয়েছে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি। উপরন্তু, এই সামান্য সুযোগটুকুও সব বিভাগের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে পাচ্ছে না। পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে অর্থনীতি, উন্নয়ন অধ্যয়ন, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, মার্কেটিং, আইন, ব্যবস্থাপনা, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং, জার্নালিজম, ল' অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসহ আরও বেশ কিছু বিভাগে। এসব বিভাগে কমন রুমের কোনো অস্তিত্বই নেই। এর ফলে নারী শিক্ষার্থীদের বাধ্য হয়ে ক্লাসের ফাঁকে করিডোরে, খালি ক্লাসরুমে কিংবা রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় সময় কাটাতে হয়।

ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান সূচী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিভাগে কমন রুম থাকলে সেখানে ক্লাসের ফাঁকে স্বস্তিতে কিছুটা সময় কাটানো যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় গ্রুপ স্টাডি, অ্যাসাইনমেন্ট ও উপস্থাপনার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়। আমাদের বিভাগে কমন রুম না থাকায় আমরা সবসময় এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’

উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী সৃষ্টি পাল বলেন, ‘আমরা রবীন্দ্র-নজরুল ভবনের ৫ তলার ২ ব্লকে ফার্মের মুরগির মতো হিজিবিজি করে ২টি বিভাগ ক্লাস করি। যেখানে পাশের বিভাগে সেমিনার লাইব্রেরি, কমনরুম, স্পোর্টস কর্নার থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব কিছুই রয়েছে। আর আমাদের এসব তো দূরের কথা, ক্লাসরুম এবং শিক্ষকই নেই পর্যাপ্ত। যার ফলশ্রুতিতে আমরা এখন ইবির সবথেকে সেশনজটযুক্ত বিভাগ। কমনরুম না থাকায় একবার ৫ তলায় সিঁড়ি বেয়ে কষ্ট করে উঠে ক্লাসের ফাঁকে বিভাগের করিডোর ছাড়া আর কোথাও দাঁড়ানোরও জায়গা পাই না। জানি না এ ভোগান্তির অবসান কবে হবে।’

কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম বিভাগের শিক্ষার্থী অনন্যা মিম তুলে ধরেন এক ভিন্ন ও হৃদয়বিদারক বাস্তবতার কথা। তিনি বলেন, ‘গর্ভকালীন অবস্থায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বা কোনো শারীরিক অসুবিধা হলে আমাকে ফাঁকা ক্লাসরুমের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। সন্তান জন্মের পর তাকে কখনো প্রয়োজনে ক্যাম্পাসে আনতে হলে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে ব্রেস্টফিডিংয়ের (মাতৃদুগ্ধ পান) জন্য ফাঁকা ক্লাসরুম বা কর্মচারীদের রুম ব্যবহার করতে হয়। ক্লাস না থাকাকালীন সময়ে বাচ্চাকে নিয়ে বসার মতো কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। ফাঁকা ক্লাসরুমে একা বসে থাকাটা অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই অস্বস্তিকর। কমন রুম থাকলে এই বিড়ম্বনা পোহাতে হতো না, আমিও নির্দ্বিধায় আমার সন্তানকে যেকোনো প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে পারতাম।’

ছাত্রীদের মতে, কমন রুম কেবল বিশ্রামের স্থান নয়; এটি তাদের দৈনন্দিন পড়াশোনা ও ক্যাম্পাসে টিকে থাকার একটি অপরিহার্য সহায়ক ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের দাবি–শুধু দায়সারাভাবে একটি কক্ষ বরাদ্দ করলেই চলবে না; সেখানে পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল, বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নামাজের স্থান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। নারী শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন মৌলিক প্রয়োজন ও নিরাপত্তা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করবে–এমনটি চাওয়া তাদের।

মীর মোশাররফ হোসেন ভবনের রুম বণ্টন কমিটির আহ্বায়ক এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. রোকসানা মিলি বলেন, ‘আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছি মেয়েদের জন্য এই ভবনে একটি চমৎকার কমন রুম নিশ্চিত করতে। এছাড়া বর্তমান যে রুমটি আছে, সেটিতে পর্যাপ্ত সুব্যবস্থা করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যাতে ছাত্রীরা যেকোনো প্রয়োজনে এটিকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আসলে শুধু আমাদের এ ভবন নয়, প্রত্যেকটি বিভাগের মেয়েদেরই সবচেয়ে সাধারণ ও যৌক্তিক দাবি হলো কমনরুম। দীর্ঘদিন ধরে নানা চেষ্টার পরও এটি পূরণ করতে না পারা আমাদেরই ব্যর্থতা। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করতে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মামুন আল রশীদ বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নেওয়ায় কমন রুমের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানি না। যেসব বিভাগে কমন রুম নেই, তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা পেলে আমি উপাচার্য মহোদয়ের সাথে কথা বলব এবং তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

এবিষয়ে বক্তব্য নিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status