|
সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড, ব্যাংক সংস্কারে জোর
সায়ীদ আবদুল মালিক, ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে
|
![]() সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড, ব্যাংক সংস্কারে জোর প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা জানান। আলোচনায় বলা হয়, অতীতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে প্রকৃত সহায়তাপ্রত্যাশীদের অনেকে বাদ পড়েছেন। বিপরীতে, সহায়তা পাওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিদের কেউ কেউ সুবিধা পেয়েছেন। এ ধরনের ত্রুটি দূর করতে তথ্যভিত্তিক উপকারভোগী নির্বাচন, সমন্বিত তথ্যভান্ডার এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। সংস্থাটির হিসাবে, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। ফলে বিদ্যমান কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানো এবং সহায়তা থেকে বাদ পড়া পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে বড় বরাদ্দ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। একই অর্থবছরে ৪২ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনার বিপরীতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি কৃষি উপকরণ ও বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু কার্ড বিতরণ করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করা, একই পরিবারের একাধিক কর্মসূচি থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত সুবিধা নেওয়া ঠেকানো এবং বাদ পড়া দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিগুলোর মধ্যে সমন্বয়, বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচন উন্নত করা এবং ফ্যামিলি কার্ড কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। সমন্বিত তথ্যভান্ডারের প্রয়োজন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়াতে সরকারের ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ ধরনের সমন্বিত তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচনের ত্রুটি কমানো এবং কর্মসূচির বাইরে থাকা দরিদ্র পরিবারগুলোকে শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। এ জন্য ডিজিটাল জনপরিকাঠামো গড়ে তোলা, উপকারভোগীদের তথ্য নিয়মিত যাচাই এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থ বিতরণব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা মানুষ যাতে সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ বাড়ছে, সংস্কারের তাগিদ ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগ বাড়াতে সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থ পাচার ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং তাঁদের সহযোগীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অর্থ লোপাটের পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার বলে যে দাবি করা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব, সময়কাল ও নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি। তাই যাচাই ছাড়া এ অঙ্ককে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে চ্যালেঞ্জ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭—উভয় অর্থবছরেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে সংস্কার এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যভান্ডার এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
