ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬ ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
একটি জার্সির ওজন কত?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 14 July, 2026, 11:36 AM

একটি জার্সির ওজন কত?

একটি জার্সির ওজন কত?

একটি জার্সির ওজন কত? কয়েকশ গ্রাম। সামান্য কাপড়, কিছু সুতা, বুকের ওপর একটি প্রতীক, পেছনে একটি নাম আর একটি সংখ্যা। বিজ্ঞানের হিসাবে উত্তরটা খুব সহজ। একটি দাঁড়িপাল্লায় রাখলেই ওজন জানা যাবে। সেই জার্সি যখন কোনো দেশের জাতীয় দলের, তখন তার ওজন মাপার মতো কোনো দাঁড়িপাল্লা পৃথিবীতে নেই।

ফুটবলার গায়ে জড়ান একটি দেশের ইতিহাস। জাতির যুদ্ধ, স্বাধীনতা, পরাজয়, বিজয়, সংস্কৃতি, কান্না, অহংকার আর কোটি মানুষের স্বপ্ন। বুকের ওপর ছোট্ট যে প্রতীকটি থাকে, সেটি একটি দেশের পরিচয়। পতাকা শুধু কাপড় নয়, জাতীয় দলের জার্সিও শুধু পোশাক নয়। জার্সির রঙের ভেতর লুকিয়ে থাকে স্বাধীনতার গল্প। যুদ্ধের ক্ষত। উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার স্মৃতি। দেশটির পৃথিবীর সামনে মাথা তুলে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা। সেখানে জমা থাকে কয়েক প্রজন্মের অপেক্ষা।

ব্রাজিলের হলুদ জার্সি দেখলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, রোমারিও, রোনালদোদের মুখ। হলুদ রঙের সঙ্গে মিশে আছে সাম্বার ছন্দ, মারাকানার কান্না, পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের উল্লাস।

আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা স্ট্রাইপের জার্সিতে বেঁচে আছেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। আছে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো। ২০১৪ সালের অপূর্ণতা। ২০২২ সালে লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পর একটি দেশের কান্না। আনন্দের কান্না।

প্রতিটি দেশের জার্সির পেছনে আছে এমন হাজার গল্প। কোথাও যুদ্ধ। কোথাও দারিদ্র্য। কোথাও রাজনৈতিক অস্থিরতা। কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা। কোথাও ফুটবলই একটি জাতির সবচেয়ে বড় আনন্দ। একটি শিশু যখন বাড়ির উঠানে বল নিয়ে খেলতে শুরু করে, সে শুধু স্বপ্ন দেখে। একদিন দেশের জার্সি পরবে। জাতীয় সংগীতের সময় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে। গ্যালারিতে উড়বে তার দেশের পতাকা। সেই শিশুটি বড় হয়। কাদামাঠ পেরোয়। ভাঙা বুট পরে অনুশীলন করে। বাড়ি থেকে দূরে থাকে। হারে। দল থেকে বাদ পড়ে। চোটে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থাকে। তারপরেও একটি স্বপ্ন তাকে টেনে নিয়ে যায় দেশের জার্সি।

একদিন ড্রেসিংরুমে তার সামনে রাখা হয় সেই জার্সিটি। পেছনে লেখা নিজের নাম। নিচে একটি নম্বর। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কাপড়টিতে হাত বুলিয়ে দেয়।

হয়ত নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে। মনে পড়ে বাবা-মায়ের কথা। যে মা সন্তানের খেলা দেখতে মাঠের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। যে বাবা নিজের প্রয়োজন কমিয়ে সন্তানের জন্য একজোড়া বুট কিনেছেন। মনে পড়ে প্রথম কোচের কথা। ছোট্ট শহরটির কথা। সেই মাঠটির কথা, যেখানে প্রথম বল ছুঁয়েছিল। সে জার্সিটি গায়ে তোলে। সেই মুহূর্তে কয়েকশ গ্রামের কাপড়টি হঠাৎ অনেক ভারী হয়ে যায়।

ক্লাব একজন ফুটবলারকে বেতন দেয়। খ্যাতি দেয়। ট্রফি দেয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে খেলার সুযোগ দেয়। জাতীয় দল তাকে এমন কিছু দেয়, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না। দেশের হয়ে দাঁড়ানোর অধিকার।

জাতীয় সংগীত বাজে। এগারোজন ফুটবলার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকেন। ক্যামেরা এক মুখ থেকে আরেক মুখে যায়। কেউ চোখ বন্ধ করেন। কেউ আকাশের দিকে তাকান। কেউ ঠোঁট মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়ে যান। কারও চোখে জল। কেন? তার সামনে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে একটি দেশ। হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো গ্রামে হয়ত একটি শিশু তার জার্সি পরে টেলিভিশনের সামনে বসে আছে। কোনো হাসপাতালে রোগীর পাশে বসে একজন মানুষ মোবাইল ফোনে ম্যাচ দেখছেন। কোনো প্রবাসী বহু বছর পর নিজের দেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো বৃদ্ধ হয়ত জীবনের শেষ বিশ্বকাপ দেখছেন। তারা কেউ মাঠে নেই। তবু তারা সবাই সেই এগারোজনের সঙ্গে খেলছেন।

একটি গোল শুধু একটি গোল নয়। একজন স্ট্রাইকার যখন বল জালে পাঠান, স্টেডিয়াম কেঁপে ওঠে না। হাজার মাইল দূরের শহরে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। অচেনা মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে। কোনো শিশু বাবার কাঁধে উঠে নাচে। কোনো বৃদ্ধের চোখে জল আসে। একটি ভুল শুধু একটি ভুলও নয়। একটি পেনাল্টি মিস। একটি ভুল পাস। একটি গোলকিপারের হাত ফসকে যাওয়া বল। কয়েক সেকেন্ডের একটি মুহূর্ত কখনো একজন ফুটবলারের সারা জীবনের সঙ্গী হয়ে যায়।

শেষ বাঁশির পর তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার জার্সি ঘামে ভেজা। চোখে জল। চারপাশে উৎসব কিংবা শোক। জার্সিটি আরও ভারী মনে হয়। কাঁদে একটি দেশ।

জার্সি এমন মানুষকেও পাশাপাশি দাঁড় করায়, যারা অন্য কোনো বিষয়ে একমত নন। রাজনৈতিক মত আলাদা। ভাষা আলাদা। অঞ্চল আলাদা। সামাজিক অবস্থান আলাদা। জাতীয় দল মাঠে নামলে তারা একই রঙের জার্সি পরেন। একই গোলে চিৎকার করেন। একই পরাজয়ে কাঁদেন। পরিচয় একটাই দেশ।

একজন ফুটবলার সেই জার্সি পরে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেন। কখনো ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে যান। কেউ ইতিহাসের নায়ক হন। কেউ ফিরে যান অপূর্ণতা নিয়ে। জার্সিটি থেকে যায়। এক প্রজন্মের হাত থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে।

কোনো বাবার আলমারিতে যত্ন করে রাখা পুরোনো জার্সিটি একদিন তার সন্তান হাতে নেয়। বাবা বলেন, এই জার্সি পরে আমি সেই ম্যাচটি দেখেছিলাম। শুরু হয় একটি গল্প। সেই গল্পে থাকে একটি গোল। একটি হার। একটি রাত। একটি দেশের কান্না কিংবা আনন্দ। বছর চলে যায়। খেলোয়াড় বদলে যায়। নম্বর বদলায়। নকশা বদলায়। জার্সির ওজন বদলায় না। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম তার সঙ্গে যোগ করে নতুন স্বপ্ন। নতুন স্মৃতি। নতুন কান্না। বিশ্বকাপের শেষ রাতে ট্রফি পায় একটি দেশ। বাকিরা ফিরে যায় খালি হাতে। একটি দেশের জার্সি কখনো সত্যিই খালি হাতে ফেরে না। সঙ্গে নিয়ে ফেরে গল্প। কোনো বীরত্বের, কোনো ব্যর্থতার, কোনো অসমাপ্ত স্বপ্নের। একটি জাতীয় দলের জার্সির ওজন কত?

উত্তর কোনো দাঁড়িপাল্লা দিতে পারবে না। তার ওজন একটি দেশের ইতিহাসের সমান। একটি জাতির যুদ্ধের সমান। একজন মায়ের প্রার্থনার সমান। একটি শিশুর স্বপ্নের সমান। কোটি মানুষের অপেক্ষার সমান।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status