|
হাম–উপসর্গের রোগী ৫০ হাজার ছাড়াল, আগে আর কোন কোন দেশে বছরে এত আক্রান্ত ছিল ?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() হাম–উপসর্গের রোগী ৫০ হাজার ছাড়াল, আগে আর কোন কোন দেশে বছরে এত আক্রান্ত ছিল ? গত এপ্রিলে ২০২৬ জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) সভায় বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছিলেন যে হামের প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুকে হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করতে হবে। সেই হিসাবে দেশে গত দেড় দশকে কোনো বছরে হামে এত আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে বিশ্বে মাত্র চারটি দেশে বছরে ৫০ হাজারের বেশি রোগী পাওয়া গেছে। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান, জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, মাত্র দুই মাসের কম সময়ের মধ্যে এত সংক্রমণ সত্যিই মারাত্মক। আমাদের জনসংখ্যার অনুপাতেও যদি অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এর তুলনা করি, তা–ও অনেক বেশি। বাংলাদেশের এবারের হামের রোগীর সংখ্যা আসলেই অনেক বড় কিছু। আড়াই দশকে সর্বোচ্চ সংক্রমণ গত আড়াই দশকে কখনো দেশে হামের সংক্রমণ ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। এর আগে হামের সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০০৫ সালে, ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এর পর থেকে রোগী কমে আসে। ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আগের পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৪) রোগীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথেই হাঁটার মধ্যে এ বছরের শুরুতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং একের পর এক শিশুর মৃত্যুও ঘটত থাকে। এ সংক্রমণের পেছনে গত বছর হামের পর্যাপ্ত টিকা না দেওয়াকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি পুষ্টির ঘাটতিকেও কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা যথাযথভাবে না দিতে পারার জন্যই হামে এত সংক্রমণ ও মৃত্যু। তবে মৃত্যুর দায় বর্তমান সরকারকেও নিতে হবে। তিনি বলেন, সরকার হামকে মহামারি ঘোষণা করতে দ্বিধা করে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা যখন ৫০ হাজারের অতিরিক্ত হয়, তখন তাকে মহামারি না বলার কোনো কারণ নেই। এটা করা গেলে, হামকে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলে ন্যাশনালে গাইডলাইন দিয়ে চিকিৎসা করা যেত, তাহলে এত মৃত্যু হতো না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য ১৫ মার্চ থেকে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যার তথ্য দিচ্ছে। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাম ও হামের উপসর্গে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) দেশে ৯ জন মারা গেছে। তাদের মধ্যে তিনজনের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল। এই সময়ে আরও ১ হাজার ১০৫ জনের দেহে হামের উপসর্গ দেখা দেয়। নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্তের সংখ্যা ৮৭। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৭ হাজার ২৪ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। সর্বশেষ সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে ৪৯ জনের। দেশে এক দশকে হামে এক সপ্তাহে এত মৃত্যু আর ঘটেনি। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাম মহামারি ঘটার বিষয়ে আগের সরকারের অবশ্যই দায় আছে, কিন্তু শিশুমৃত্যু তো নিয়ন্ত্রণ করা যেত। চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, স্তরভিত্তিক চিকিৎসাসেবার নীতি মেনে চললে শিশুমৃত্যু অনেকটা রোধ করা যেত বলে তিনি মনে করেন। চার দেশের পর বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে সদস্যদেশগুলোর বছরভিত্তিক হাম রোগীর সংখ্যা দেওয়া আছে। উপসর্গের রোগীর সংখ্যার হিসাবটি বিবেচনা করলে দেখা যায়, এক বছরে ৫০ হাজারের বেশি রোগী পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পঞ্চম দেশ। এর মধ্যে ভারত, ইউক্রেন ও মাদাগাস্কারে একবার করে রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছিল। একাধিকবার হয়েছে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রতে। তবে যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্ধেক মানুষ টিকাদানের বাইরে। ভারতে গত দেড় দশকে একবারই হামের রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার পার হয়। সেটা ঘটেছিল ২০২৩ সালে, রোগী ছিল ৬৫ হাজার ১৫০ জন। ইউক্রেনে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ৫০ হাজারের বেশি হাম রোগী পাওয়া গিয়েছিল। মাদাগাস্কারে ২০১৯ সালে হাম রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৩ হাজার ২৩১। কঙ্গোতে গত ১০ বছরের মধ্যে সাতবার ৫০ হাজারের বেশি রোগী পাওয়া যায়। এর মধ্যে সর্বাধিক রোগী পাওয়া গিয়েছিল ২০১৯ সালে, ৩ লাখ ৩৩ হাজার ১০৭ জন। ঢাকায় কর্মরত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, কঙ্গোয় সংক্রমণের হার অস্বাভাবিক হওয়ার কারণ দেশটির অর্ধেক অংশ টিকার আওতার বাইরে। যুদ্ধের কারণেই সেখানে টিকাদান সম্ভব হয় না। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
