ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ৭ মে ২০২৬ ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩
নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার নেপথ্যে কী
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Friday, 20 June, 2025, 12:48 AM

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার নেপথ্যে কী

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার নেপথ্যে কী

ছুটির মধ্যেই ভেঙে ফেলা হয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত 'অঞ্জলি লহ মোর' ভাস্কর্যের বেশির ভাগ অংশ। জাতীয় কবির একটি গানকে ভিত্তি করে গত বছর নির্মাণ করা হয়েছিল ভাস্কর্যটি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক সমালোচনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদ ও পুরাতন কলা অনুষদ ভবনের মাঝে পুকুরের কিনারে সাবেক উপাচার্য সৌমিত্র শেখরের আমলে এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের নির্দেশে ভাস্কর্যটি প্রায় পুরো ভেঙ্গে ফেলা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, শিক্ষার্থীদের দাবির ভিত্তিতেই ভাস্কর্যটি ভাঙ্গা হয়েছে। একই সাথে অনুমোদিত মূল নকশায় ফিরে যেতে এই ভাস্কর্য ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এটি ভাঙ্গার বিষয়ে জানতেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ডিন ও শিক্ষকরা।

কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট, ডিনস কমিটি বা প্রশাসনিক কোনো কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে 'আনুষ্ঠানিক' কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।

উপাচার্য জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, তিনি সংস্কৃতি লালনের পক্ষে এবং ভাস্কর্য ভাঙ্গার পক্ষে নন।

মি. আলম বিবিসি বাংলাকে বলেন, " জুলাই - অগাস্ট পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে যে দাবিগুলো করা হয়েছিল, তার মধ্যে ভাস্কর্য সংস্কারের দাবি ছিল। সেসময়ই ছাত্ররা ভাস্কর্যটির দুইটি আঙ্গুল ভেঙ্গেছিল। তবে আমি ভাঙ্গার পক্ষে নয়।"

সৌন্দর্য বর্ধন ও সংস্কারের নামে ভাস্কর্য ভাঙ্গার জন্য 'বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা' কোন লিখিত আবেদন নয় বরং মৌখিকভাবে এই দাবি জানিয়েছিল বলে জানান মি. আলম।

এখন ভাস্কর্যটির দুই হাতের অঞ্জলি পুরোপুরি ভেঙ্গে ফেলার পর গতকাল বুধবার এক জুম মিটিং- এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আপাতত ভাঙ্গার কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে সারা দেশে অন্তত হাজার খানেক ভাস্কর্য, ম্যুরাল, স্থাপনা ও মাজারে হামলা করে ভাঙচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

এমনকি নারী ফুটবলারদের খেলা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে 'তৌহিদী জনতা' র ব্যানারে।

অন্তর্বর্তী সরকারকে এসব ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে কেবলমাত্র বিবৃতি দিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে দেখা গেছে।

সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার সমালোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, "রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনটা যদি এরকম হয় যে, এসব ভাঙচুর কিংবা এসব বিষয়ে যে জায়গাগুলোতে আমার মনে হয় অস্তিত্বের সংকট হয়, সেসব জায়গায় কথা বলবো। আর যে জায়গায় স্বার্থ সিদ্ধি হয় সেসব জায়গায় চুপ থাকব- এরকম পরিস্থিতি হলেতো এসব ঘটনা চলমানই থাকবে। এগুলো থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে।"

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ভাস্কর্য ভাঙা ঠিক কবে শুরু হয়েছে, তা জানাতে পারেননি কেউ। বিদেশে অবস্থানরত উপাচার্যের দাবি, তিনি নিজেও জানেন না, কবে ভাঙা শুরু হয়েছে।

নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদ তার হাতের ছবি থেকে নির্মিত এই ভাস্কর্য ভাঙা প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে গত মঙ্গলবার (১৭ই জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এরপরই এই বিষয়টি আলোচনায় আসে।

তিনি ইংরেজিতে লিখেছেন, " ক্যান এনিওয়ান স্টপ দেম প্লিজ? অর্থাৎ কেউ কি তাদের থামাতে পারেন?"

মিজ আহমেদ লিখেছেন, " নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ম্যুরাল। এটি ভাস্কর্যবিদ মনিন্দ্র পাল করেছিলেন। খুবই দুঃখজনক এই মুহূর্তে সেটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।"

তবে শুধু এই শিল্পীই নন, ছুটির মধ্যে কাউকে না জানিয়ে এই ভাস্কর্য ভাঙার সমালোচনা করে ফেসবুকে সরব হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের বিভাগীয় প্রধান রায়হানা আক্তার ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন।

ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, " ভাঙ্গলেন যেহেতু, বিশ্ববিদ্যালয় খুললে আমাদের চোখের সামনেই গুঁড়িয়ে দিতেন
ছুটির মধ্যে লুকিয়ে ভাঙা তো দরকার ছিলো না!"

এই শিক্ষক লিখেছেন, প্রশাসনের তরফ থেকে ডিনবৃন্দ এবং অনেকের সিদ্ধান্তেই এই কাজ করা হয়েছে বলে তাদের জানানো হয়েছে। কিন্তু শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাতো এ বিষয়ে জানতেন না।।

" এটার নান্দনিকতা নিয়ে আপত্তি থাকলে এটাকে সংস্কার করতে আমাদের চারুকলার শিক্ষকরাই তো যথেষ্ট ছিলেন। আমার-আপনার ট্যাক্সের টাকা দিয়েই তো ভাঙা গড়ার এই মহোৎসব চলছে; পকেট কাদের ভরছে,নতুন করে আর না ই বা বললাম!" এমন প্রশ্নও তোলেন এই শিক্ষক।

জুলাই আন্দোলনের পর অনেক ভাস্কর্য, স্থাপনা ভাঙার কথা ইঙ্গিত করে মিজ আক্তার লিখেছেন " ভাঙলেন তো অনেক
আরেক জুলাই সমাগতকি কি গড়লেন, এবার তারও একটা ফিরিস্তি হোক!"

ইনস্টাগ্রামে বিবিসি বাংলা ফলো করতে ক্লিক/ট্যাপ করুন এখানে

"ভিসিদের ইগোয়িস্টিক বিষয়"বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে মানববন্ধনও করেছে মঙ্গলবার।

'নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন নজরুলের সৃষ্টির অবমাননা', 'সংস্কৃতির উপর আক্রমণ বন্ধ করতে হবে' 'ভাঙনের সিদ্ধান্ত দাতাদের থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় কর' এমন সব লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভাস্কর্যের সামনে মানব বন্ধন করেন।

ফিল্ম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী জিহাদুজ্জামান জিসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, " ১৭ তারিখে সম্ভবত ভাঙার কাজ শুরু হয়। গত তিন – চার মাসেও এই ভাস্কর্য নিয়ে আন্দোলন বা কোনো কিছুই হয় নাই। নতুন প্রশাসন যখনই আসে তখনই এখানে ভাঙা-চোরার খেলা চলে। এখানে ভিসিদের ইগো কাজ করে।"

সাবেক উপাচার্য মোহিতুল আলম এই পুকুরের ওপরে একটা 'সিন্ধু সারস' অর্থাৎ ভাসমান একটি ঘর বানিয়েছিলেন যেটা পরবর্তী উপাচার্য মুস্তাফিজুর রহমান সেটি ব্যবহার করেননি। পরবর্তীতে উপাচার্য সৌমিত্র শেখর এসে ওই 'সিন্ধু সারস' ভেঙে 'অঞ্জলি লহ মোর' ভাস্কর্যটি স্থাপন করেন বলে জানান মি. জিসান।

ক্ষোভ প্রকাশ করে এই শিক্ষার্থী বলেন, " এক প্রশাসনের কাজ আরেক প্রশাসনের চোখের বিষ এরকম একটা বিষয়। এখনকার প্রশাসন এটা ভেঙে আরেকটা তৈরি করবে। জনগণের টাকায় এক ধরনের ভাঙা গড়ার খেলা চলতেছে।"

ভাস্কর্য ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ফোরামে
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন ইমদাদুল হুদা বিবিসি বাংলার কাছে স্বীকার করেন যে, 'অঞ্জলি লহ মোর' ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে 'আনুষ্ঠানিকভাবে' তারা কেউ কিছু জানতেন না।

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো 'আনুষ্ঠানিক' বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়নি।

মি. হুদা  বলেন, " জুলাই অগাস্টের ঘটনার পরে ছাত্রদের নানা ধরনের দাবি ছিল। সে দাবির মধ্যে এটাও একটা দাবি ছিল যে এই ভাস্কর্যটা এখানে বেমানান। এটা সৌন্দর্য বৃদ্ধির বদলে বরং সৌন্দর্য হানি করেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে ফরমাল কোন আলোচনা, কোন ফরমাল মিটিংও করেনি।"

এরই মধ্যে মঙ্গলবার ভাস্কর্যটি ভাঙার খবর ছড়িয়ে পড়লে উপাচার্য, সকল ডিন ও প্রশাসনের সবার সমন্বয়ে জুমে অনলাইনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

এই বৈঠকে পুরোপুরি ভেঙ্গে না ফেলে যতটুকু ভাঙা হয়েছে ততটুকু পর্যন্তই কাজ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে আগামী ২২শে জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস এবং ২৯শে জুন ক্লাস শুরু হবে। ২২শে জুন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। যে বৈঠকে এ বিষয়ে সব কিছু পর্যালোচনা করা হবে।

বর্তমানে ছুটিতে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জাহাঙ্গীর আলম দাবি করেন, পূর্বে ভাস্কর্যটি অনুমোদিত নকশার রূপে ছিল না। তাই ওই রূপে ফিরিয়ে নিতে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যই এই আয়োজন।

শিক্ষার্থীদের মানব বন্ধন
পাঁচই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলায় ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্থাপনা ভাঙা হয়েছে।

এর মধ্যে ঢাকায় ধানমণ্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, বিভিন্ন স্থানে তার ভাস্কর্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংবলিত শিল্পী শামীম সিকদারের ' স্বাধীনতা সংগ্রাম' এবং ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শশীলজে থাকা ভেনাসের ভাস্কর্য ভাঙার খবর নিয়ে বেশ আলোচনা – সমালোচনা হয়েছে।

তবে এসব ঘটনায় সরকার বা আইন – শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে পদক্ষেপ খুবই কম দেখা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদা রওনক খান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সরকারের এরকম উদাসীনতায় এসব ঘটনা বাড়বে বৈ কমবে না।

 মিজ খান বলেন, " দল মত সব কিছু নির্বিশেষে শুধু দেশের স্বার্থ যদি ভাবা হয়, তাহলে হয়তোবা একটা পরিবর্তন আসবে। অথবা যারা এগুলো করছে তারা ভয় পাবে।"

এ ধরনের বিষয়ে সরকারের আরও কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন মিজ খান।

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক হিংসা-প্রতিহিংসা সব সময় থাকলেও অজ্ঞতা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণেই এ ধরনের শৈল্পিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ওপর হামলা করা হয়।

মিজ খান বলেন, "এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনেক সময় আগের জনের কাজ পরের জন ভেঙে ফেলবে, এমন বিষয়ও কাজ করে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত হিংসা - প্রতিহিংসাও কাজ করেছে।"

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status