|
তেঁতুলিয়ার আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্তির পথে
মুস্তাক আহমেদ, পঞ্চগড়
|
![]() তেঁতুলিয়ার আদিবাসীদের ভাষা বিলুপ্তির পথে তেঁতুলিয়া উপজেলার ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি বিভিন্ন গ্রাম, চা-বাগান, আশ্রয়ণগুলিতে প্রায় ১৫০ টির ও অধিক আদিবাসী পরিবার বসবাস করেন। এদের অধিকাংশই সাওতাল সম্প্রদায়ের ওরাও জনগোষ্ঠী । এছাড়াও এদের মধ্যে তিরকে, টোপ্পো, কেরকেট্রা, মিজ, খালখো, লাকড়া নামের গোত্র দেখা যায়। এ অঞ্চলে বসবাসরত ১৫০ টি পরিবারের প্রায় ৫ শতাধিক আদিবাসী রয়েছে এ উপজেলায়। রয়েছে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি । কিন্তু সঠিক চর্চা ও বিকাশের অভাবে অবহেলিত শত বছরের পুরোনো ভাষা ও সংস্কৃতি। ওরাও জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার নাম কুরুখ ভাষা । প্রায় শত বছর আগে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে ওরাও জাতিগোষ্ঠীরা বসবাস করতো। নীলকরদের অত্যাচারে তারা ঐ সময়ে পালিয়ে আসে এ অঞ্চলে । এরা মুলত জীবিকা নির্বাহ করে চা বাগানে কাজ করে। কুরুখ তাদের নিজস্ব ভাষা হলেও অনেক আদিবাসী জানেনা এর নাম ও ব্যবহার । পরিবারের বয়স্করা নিজেদের মধ্যে প্রায়সময় আংশিক ভাবে কুরুখ ভাষার ব্যবহার থাকলেও ৯৮ শতাংশ পরিবারের সদস্য জানেনা এর সঠিক উচ্চারণ ও বলার কৌশল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ভাষাপ্রযুক্তি গবেষণা পরিষদের মাধ্যমে জানতে পারা যায় কুরুখ ভাষায় ৫ টি কার্ডনাল স্বরধ্বনি এবং ২৬ টি ব্যঞ্জনধ্বনির অস্তিত্ব রয়েছে। কুরুখ ভাষার সাথে বাংলা, হিন্দী ও সাদরি ভাষার মিশ্রিত চর্চা রয়েছে। অনান্য ভাষার বৈশিষ্ট্য ও কৌশলগত উচ্চারণের ফলে কুরুখ ভাষার চারিত্রিক পরিবর্তণ ঘটেছে। ওরাও জাতির মধ্যে নিজস্ব ভাষা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এই জাতিগোষ্ঠী দ্বিভাষিক। শুধুমাত্র কুরুখ ভাষায় কথা বলেন এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। মিনা লাখড়া বাস করেন তেঁতুলিয়ার দর্জিপাড়ায় । মিনা বলেন আমি আমার শুয়ামির সাথে প্রায়শই কুরুখ ভাষায় কথা বলি কিন্তু আমাদের সন্তানেরা এ ভাষার কথাগুলো বুঝতে পারে না। দুএকটা বুঝে অধিকাংশই বুঝে না। আমাদের কাছে কুরখ ভাষা শেখার বই নাই। আমরা আমাদের বাবা মায়ের কাছে এই ভাষায় কথা বলতে শিখেছি আর আমাদের ছেলে মেয়েরা যতদুর শিখছে আমাদের কাছ থেকেই শিখছে । আমরা চাই আমাদের কুরুখ ভাষাটা বেচে থাকুক তাই আমরা আমাদের ছেলে মেয়েদের সাথে এইভাষায় কথা বলার অভ্যাস করছি। শ্যামলী মিজ উচ্চমাধ্যমিক পড়ছেন তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে – গাজীপুর আনসার একাডেমীর হ্যান্ডবল খেলোয়াড় । সুনামের সাথের খেলছেন দেশ ও দেশের বাইরে। শ্যামলী বলেন আমরা যারা তেঁতুলিয়ার আদিবাসী আমাদের নিজস্ব ভাষা কুরুখ ভাষা অথচ আমরা নিজেরাই এ ভাষায় কথা বলতে পারিনা বুঝতেও পারিনা। আমাদের বাবা মারা প্রায়শই এভাষায় কথা বলে আমরা একভাগও বুঝতে পারিনা। আমাদের একটা শতবছরের পুরোনো র্গীজা আছে, কিন্তু নেই কোন ভাষা শেখার ব্যবস্থা । সরকার যদি মাতৃভাষা ইন্সিটটিউডের মাধ্যমে আমাদের ভাষা শেখার জানার ও গবেষনার সুযোগ করে দেয় তাহলে আমাদের ভাষা বিলুপ্তি হওয়ার আগে আবারও জেগে উঠবে। আমরা সমৃদ্ধ হবো। তেঁতুলিয়া সাওতাল সম্প্রদায়ের রতন লাকড়া কাজ করছেন সাওতাল নৃত্য নিয়ে । তাদের একটি দল আছে তেঁতুলিয়ার আদিবাসী নৃত্যের মধ্যে তারাই বর্তমানে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে আছে। রতন লাকড়া বলেন আগে আমরা বিভিন্ন চা বাগানের মালিকের আন্ডারে চা বাগানে খুপড়ি ঘর নির্মান করে থাকতাম। আমাদের নিজস্ব কোন জমি ছিলনা। ঘর ছিলনা তৎকালীণ ইউএনও সোহাগ চন্দ্র স্যার আদের খুঁজে খুঁজে একসাথে করেছেন। ডাহুক নদীর তীরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহার ঘর ও জমি আমাদের দিয়েছেণ। আমরা এখন নিজের একটা পরিচয় পেয়েছি । আমরা এখন ভাল আছি। আমাদের ভাষা শেখার একটা জায়গা তৈরী হলে আমরা নিজেদের আত্মপরিচয়ে সমৃদ্ধ হতে পারবো। শিমন মিজ তেঁতুলিয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রধান , তিনি বলেন আমাদের মৃত্যুর পর তেঁতুলিয়ার ওরাও জাতিগোষ্ঠীর ভাষা কুরুখ বিলুপ্তির পথে। আমরা চাই আদিবাসীদের জন্য আলাদা স্কুল ঘর যেখানে আমাদের বাচ্চারা সাধারন শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে ও শিখতে পারবে। আমাদের র্গীজা ঘরে আগে একজন মাস্টর ছিলেন নাম ছিল বুদু । তিনি মারা যাওয়ার পর আর কোন মাস্টর আমরা পাইনি। এখন র্গীজায় আগের মত পাঠদান হয়না। সরকার যদি আমাদের র্গীজাটাকে পুনরায় মেরামত করে দেন পাশাপাশি মাস্টর নিয়োগ দিয়ে আমাদের ছেলে মেয়েদের ভাষা ও সংস্কৃতি শেখার সুযোগ তৈরী করে দেন তাহলে আমরা আবার আমাদের ঐতিহ্য ফিরে পাব। তেঁতুলিয়া সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী আনিছুর রহমান বলেন তেঁতুলিয়ার আদিবাসীরা এখন আর অবহেলিত নাই। সরকার তাদের জমি দিয়েছে ঘর দিয়েছে। শিক্ষার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। আমরা আদিবাসী সন্তানদের শিক্ষার খরচের জন্য শিক্ষা ট্রাস্ট করে দিয়েছি। তেঁতুলিয়ার অনেক আদিবাসী সন্তানেরা এখন ভাল জায়গায় আছেন। পড়াশুনা, খেলাধুলা, ও চাকুরী গ্রহন করে অনেকেই হয়েছেন সাবলম্বী ও সম্মানীয়। আমরা চাই তাদের মাতৃভাষা টিকে থাকুক হাজার বছর। কুরুখ ভাষাটিকে টিকে রাখতে গেলে সবার আগে আদিবাসীদের এগিয়ে আসতে হবে। তাদের আরও সচেতন হতে হবে নিজেদের মধ্যে । পরিবারের অনান্যদের মধ্যে কথা বলার সময় কুরুখ ভাষার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্র্বাহী অফিসার ফজলে রাব্বি বলেন আমাদের ভাষা সৈনিকেরা ভাষার জন্য জীবন দিয়ে প্রত্যেকটা মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রত্যেকটি ভাষা সমান গুরুত্ব পাবে। আমি চাইবো আদিবাসী সমাজের সাথে আলোচনা করে সমাধান করতে চাই। কিভাবে এই ভাষাটিকে সম্মানের সাথে টিকিয়ে রাখা যায়। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করছে।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
