ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ১৭ মে ২০২৬ ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ কি ফিরছে ?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Sunday, 17 May, 2026, 10:28 PM

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ কি ফিরছে ?

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ কি ফিরছে ?

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে সরকার একদিকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক গতি ফেরানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে রাজস্ব সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ ও দুর্বল আর্থিক খাতের বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছে। এই বাস্তবতায় সরকার আবারও আবাসন খাতে অ প্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। একইসঙ্গে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী অন্তত ২০টির বেশি খাতে কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধা পুনর্বহালের পরিকল্পনাও চলছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অর্থনীতিতে স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং উৎপাদনমুখী খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। তবে এই উদ্যোগ ঘিরে ইতোমধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজ ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলো বলছে, এটি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেওয়ার শামিল হতে পারে।

বাজেট আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণ দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। অর্থাৎ কেউ নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করে বিনিয়োগ করলে পরবর্তী সময়ে সেই অর্থের উৎস নিয়ে কর কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্য কোনো সংস্থা প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ আসতে পারে। তবে কী হারে কর নেওয়া হবে বা কোন কাঠামোয় সুবিধা দেওয়া হবে—তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আরেক কর্মকর্তা বলেন, যদি অর্থের উৎস নিয়ে ভবিষ্যতে তদন্তের ঝুঁকি থাকে, তাহলে কেউ এই সুযোগ নিতে আগ্রহী হবে না। এজন্য পূর্ণ দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

মূলত আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই এই সুবিধা পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের যুক্তি, উচ্চ সুদহার, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রিয়েল এস্টেট খাত মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিলে আবাসন খাতে স্থবিরতা কাটবে এবং সংশ্লিষ্ট শতাধিক শিল্পে নতুন গতি আসবে।

তবে এই উদ্যোগের বিরোধিতাও তীব্র। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের জন্য এই ধরনের সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী হতে পারে।

তার মতে, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুর্নীতির সহায়ক, বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এতে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন, আর দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।

অতীতের অভিজ্ঞতা কী বলছে

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়েই অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ২০২০-২১ অর্থবছরের সিদ্ধান্ত। সে সময় মাত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে এবং পূর্ণ দায়মুক্তির মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়।

সেই বছর রেকর্ড ১১ হাজার ৮৩৯ জন ব্যক্তি প্রায় ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈধ করেন। সরকার প্রায় ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও সিদ্ধান্তটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। কারণ সাধারণ করদাতারা যেখানে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর দেন, সেখানে অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকদের জন্য মাত্র ১০ শতাংশ কর নির্ধারণ করা হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৫ শতাংশ হারে সুবিধাটি আবার চালু করা হলেও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধাপে ধাপে এই দায়মুক্তির বিধান বাতিল করে।

বর্তমানে কেউ অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করতে চাইলে তাকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হয়। তবে দায়মুক্তি না থাকায় বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর অবকাশ ফিরতে পারে ২০টির বেশি খাতে

শুধু কালো টাকা নয়, আসন্ন বাজেটে কর অবকাশ বা ট্যাক্স হলিডে সুবিধাও পুনর্বহালের চিন্তা করছে সরকার। গত বাজেটে প্রায় ৩২টি খাত থেকে এই সুবিধা তুলে নেওয়া হয়েছিল। এবার তার একটি বড় অংশ পুনরায় চালুর আলোচনা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে ওষুধ, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), কৃষি যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিক উপাদান, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, খেলনা শিল্প, টেক্সটাইল যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার, অটোমোবাইল পার্টস, বায়োটেকনোলজি ও ন্যানোটেকনোলজি-ভিত্তিক শিল্পকে কর সুবিধার আওতায় আনা হতে পারে।

এছাড়া অটোমেশন, রোবোটিক্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর উৎপাদন খাতকেও বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনার আলোচনা রয়েছে।

এর আগে এই খাতগুলো প্রথম দুই বছর ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কর ছাড় পেত। তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে ৭৫ শতাংশ, পঞ্চম থেকে সপ্তম বছরে ৫০ শতাংশ এবং অষ্টম থেকে দশম বছরে ২৫ শতাংশ কর ছাড়ের সুযোগ ছিল।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজেএর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অর্থনীতিতে গতি আনতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে পারে—এমন খাতকে কর সুবিধা দেওয়া হলে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।

তবে তিনি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কারণ ঘন ঘন নীতিপরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করে।

বড় হচ্ছে বাজেট, কমছে উন্নয়ন ব্যয়ের সুযোগ

আসন্ন বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আকার ও ব্যয়ের কাঠামো। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ছিল মাত্র ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা। ঠিক দুই দশক পর এবার সেই বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

তবে বাজেটের আকার বাড়লেও অর্থনীতির সক্ষমতা একই অনুপাতে বাড়েনি। ২০০৬-০৭ সালে বাজেট ছিল জিডিপির প্রায় ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এবার তা হতে যাচ্ছে প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বড় হলেও সরকারের ফিসকাল স্পেস বা আর্থিক সক্ষমতা খুব বেশি প্রসারিত হয়নি। বরং পরিচালন ব্যয়, ঋণের সুদ, ভর্তুকি ও সরকারি বেতন-ভাতার চাপ বেড়ে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

বর্তমানে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। একইসঙ্গে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্য খাতে ভর্তুকির চাপও রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে।

নতুন পে-স্কেল: বাড়বে ব্যয়, সঙ্গে চাহিদাও

সরকার আগামী জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। তিন ধাপে এই পে-স্কেল কার্যকর করা হতে পারে।

প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, পরের বছরে বাকি ৫০ শতাংশ এবং তৃতীয় বছরে ভাতাগুলো সমন্বয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, শুধু প্রথম ধাপ বাস্তবায়নেই অতিরিক্ত ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। পুরো বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে পেনশন ব্যয় বাড়বে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ শতাংশ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল।

রাজস্ব সংকট ও আইএমএফের চাপ

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। ফলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে সরকারকে ক্রমেই ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

একদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও দুর্বল সুশাসনের চাপ, অন্যদিকে সরকারের বাড়তি ঋণগ্রহণের কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হচ্ছে। এতে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের  চলমান কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে কর আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাত সংস্কার, ভর্তুকি কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদারের মতো কঠিন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে।

যদিও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, আগামী বাজেটে নতুন করে করহার বাড়ানো হবে না। তবে করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে কর অব্যাহতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এসআরওভিত্তিক এই সুবিধা ব্যবস্থাই বড় অসুখ।

এদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, আগামী বাজেটে ব্যবসা সহজীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের স্বস্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কঠিন ভারসাম্যের বাজেট

সব মিলিয়ে এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে এক কঠিন ভারসাম্যের বাজেট। একদিকে সরকারকে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, ঋণের চাপ ও রাজস্ব ঘাটতি সামাল দিতে হবে।

কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ, কর অবকাশ পুনর্বহাল, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, আইএমএফের সংস্কার শর্ত এবং বাড়তে থাকা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার কোন পথ বেছে নেয়—সেটিই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের অর্থনীতির গতিপথ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বাজেটের আকার বড় হলেই হবে না; প্রয়োজন সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা, কর ব্যবস্থায় ন্যায়সংগত সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা। অন্যথায় বড় বাজেটও কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারবে না।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status