ভারত সীমান্তঘেঁষা কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া এলাকাটি চোরাচালানের জন্য পরিচিত। সম্প্রতি থানা পুলিশের সহযোগিতা পাওয়ায় চোরাকারবারিরা আরও বেপরোয়া। রীতিমতো সীমান্ত এলাকাটি চোরাকারবারিদের জন্য এখন অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। চোরাচালান কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালাতে দুষ্টচক্র থানার ওসিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে। ওসি এখন তালিকা ধরে চোরাকারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা নিচ্ছেন।
সম্প্রতি এরকম একটি তালিকা গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। ৭৩ জনের ওই তালিকায় কারা বর্তমান ওসি অপ্পেলা রাজু নাহাকে কত টাকা করে মাসে তুলে দিচ্ছেন তার বিস্তারিত রয়েছে। গত ১৫ মাস ধরে অপ্পেলা রাজু ব্রাহ্মণপাড়া থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তালিকা অনুযায়ী ওসি অপ্পেলা রাজুই গত ১৫ মাসে এই একটি খাত থেকেই হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় দুই কোটি টাকা।
তালিকায় যাদের নাম আছে তাদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হলে এর সত্যতা পাওয়া যায়। তবে ওসি অপ্পেলা রাজু ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ ব্যাপারে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমিরুল্লাহ বলেন, এভাবে তালিকা ধরে মাসোহারা নেওয়ার সুযোগ নেই। যদি কেউ করে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে শাড়ি, মোবাইল, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, মসল্লাসহ অন্যান্য পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে দেশে ঢুকছে ইয়াবা, গাঁজা, স্কার্প সিরাপ ও ফেনসিডিল। আর মাদক ঢোকার কারণে মাসোহারা অংকটাও তুলনামূলক বেশি। মাসোহারার পরিমাণ ৮০ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সীমান্ত দিয়ে অনেক আগে থেকেই অবৈধ উপায়ে পণ্যসামগ্রী ঢুকছে দেশে। তবে গত দুই বছর থেকে তা অনেক বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে মাসোহারার পরিমাণও। তাছাড়া মামলা, অভিযোগ, তদন্ত, রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজি, অটোরিকশা, পিকআপ, স্ট্যান্ড পরিচালনাসহ নানা খাত থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ সিস্টেমের কারণেই থানার ওসির তহবিলে যুক্ত হচ্ছে।
বিভিন্ন সময় পুলিশ কিছু মাদক আটক এবং উদ্ধার করলেও চোরাই পণ্য পাচার হচ্ছে ফ্রি স্টাইলে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি অপ্লেলা রাজুকে ইন্সপেক্টর থেকে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী পুলিশ সুপার করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী কিছু দিনের মধ্যেই তার বদলি হওয়ার কথা। থানার মুন্সি কনস্টেবল দিদারের মাধ্যমে অধিকাংশ মাসোহারা আদায় করা হলেও বড় চোরাকারবারিরা সরাসরি ওসির নিযুক্ত পাবলিক সোর্সের মাধ্যমে মাসোহারার টাকা পৌঁছে দেন। ওসির নিযুক্ত সোর্স ১০-১২ জন করে চোরাকারবারিকে দিয়ে একেকটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। আর এসব সিন্ডিকেটের প্রধানরাই ছোট ছোট কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা সংগ্রহ করেন। মাস শেষ হলে সব মিলিয়ে একটি মোটা অংক বড় কর্তার কাছে পৌঁছে যায়।
সূত্র জানায়, উপজেলার সীমান্ত এলাকার সেনের বাজার আনন্দপুরের সফিক সিন্ডিকেট কাপড়, আতশবাজি ও কসমেটিক পাচারের জন্য ওসিকে দেন মাসে ৮০ হাজার টাকা, বাগড়া এলাকার ইমরান দেন ২০ হাজার, গঙ্গানগরের ইমরান ৩০ হাজার, হরিমঙ্গলের সাদ্দাম ৩০ হাজার, একই এলাকার গুন্ডি ব্যবসায়ী সুমন ৩০ হাজার, শশীদলের জমির ৩০ হাজার, একই এলাকার জসিম ৩০ হাজার, আনন্দপুরের ফারুক ২০ হাজার, একই এলাকার এলন ২০ হাজার, আবুল ২০ হাজার, মমিন ২০ হাজার, বারেশ্বরের নুরু ১৫ হাজার, কুমিল্লার মনা ৩০ হাজার, ছাতিয়ানির রুহুল আমীন ৩০ হাজার, কোম্পানীগঞ্জের আতশবাজি ব্যবসায়ী দুলাল ২০ হাজার টাকা, কামরুল ১৫ হাজার, কবির ১৫ হাজার, আশরাফুল ২০ হাজার, হাবিব ২০ হাজার, মুকবল ১৫ হাজার, গিয়াস ১৫ হাজার, সেনের বাজারের দুলাল ৫ হাজার, জাবের ৫ হাজার, নাইঘরের রুবেল ৫ হাজার, নাগাইশের রুবেল ১০ হাজার, কংশনগরের কসমেটিকস ব্যবসায়ী ইব্রাহিম ৫ হাজার টাকা, বাঁশতলীর হনুফা ৫ হাজার, কুমিল্লার উত্তম ৫ হাজার, গৌতম ৫ হাজার, বারেশ্বরের রুবেল ১৫ হাজার, ব্রাহ্মণপাড়া বাজারের সিএনজি ফারুক ২০ হাজার, দেবিদ্বারের কাশেম ২০ হাজার, গিয়াস ১০ হাজার, দেউশের ফিরোজ দে ১০ হাজার টাকা। গত ১৫ মাসে এই একটি খাত থেকেই তালিকাভুক্ত চোরাকারবারিরাই ওসিকে দুই কোটি টাকা তুলে দিয়েছেন।
দেবিদ্বারের চোরাকারবারি গিয়াস ওরফে রাসেল বলেন, আমি মাসে ৭ হাজার টাকা করে দেই, ৬ হাজার ওসি স্যারের হাতে দেই আর মুন্সিকে ১ হাজার টাকা করে দেই।
কোম্পানীগঞ্জ এলাকার চোরাকারবারি হাবিব ওরফে আরিফ বলেন, আমি মাসে ১২ হাজার টাকা করে দিতাম তবে আমি র্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর কয়েক মাস ধরে কাজকারবার বন্ধ করে রেখেছি। শশীদলের চোরাকারবারি জসিম উদ্দিন বলেন, আমি সরাসরি টাকা দেই না, অপর কারবারি মোস্তফার মাধ্যমে টাকা দেই।
ব্রাহ্মণপাড়া সদরের চোকারবারি রুহুল আমীন বলেন, আমি একজন ক্যারিয়ার, বড়কারবারিদের মালামাল ক্যারি করি, চোরাই মাল আনার আগেই ওসির সঙ্গে চুক্তি করতে হয়, আমি কুমিল্লার নাঈম ভাইয়ের মাধ্যমে ওসিকে ২০ হাজার টাকা দেই।
আনন্দপুরের চোরাকারবারি সফিক বলেন, যে যেভাবে কাজ করে সেইভাবেই চুক্তি করতে হয়, সম্প্রতি নতুন ওসি তদন্ত এসেছে তাকে ৫ হাজার টাকা দিয়ে পরিচয় হয়ে এসেছি, তা ছাড়া বড় ওসিকে আমি নিজে মাসে ১০ হাজার টাকা করে দেই। আরও কয়েকজন থেকে ৩০ হাজার টাকা আদায় করে দেই, বড় পার্টি হচ্ছে কুমিল্লার বিল্লাল গংরা। সে জানায়, ব্রাহ্মণপাড়া সীমান্তে অসংখ্য চোরাকারবারি আছে যারা মাসোহারা দিয়ে এসব কাজ কাম পরিচালনা করছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি অপ্পেলা রাজু নাহা বলেন, আমি কোনো চোরাকারবারির কাছ থেকে মাসোহারা আদায় করি না, এমন কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না, আমি এ থানায় যোগদান করে মাদকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি, কেউ আমাকে জড়িয়ে কোনো তথ্য দিয়ে থাকলে তা মোটেও সঠিক নয়, আপনারা যাচাই করে দেখতে পারেন কে কাকে টাকা দিচ্ছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ব্রাহ্মণপাড়া-দেবিদ্বার সার্কেল) মোহাম্মদ আমিরুল্লাহ বলেন, মাদক এবং চোরাকারবারের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস নয়, অবৈধ এ কাজের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক আইনের আওতায় আসবে, তাছাড়া কোন পুলিশ সদস্য কিংবা থানার ওসি এবং এসআই জড়িত থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সূত্র: যুগান্তর