শনি, বুধ ও বৃহস্পতিবারে ওটি (অপারেশন থিয়েটার) থাকায় বহির্বিভাগে রোগী দেখা হয় না’। এমন নির্দেশনা ঝুলছে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে। এমন নির্দেশনা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন রোগীরা।
জানা গেছে, সপ্তাহে চারদিন অপারেশন বন্ধ থাকায় রোগীদের বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে। সেখানে দিতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। এতে জিম্মি হয়ে পড়ছেন রোগীরা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে গত সেপ্টেম্বর মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ১১জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ২০জনের। অক্টোবর মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ১৪জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ১৮জনের। নভেম্বর মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ১৪ জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ২০জনের।
অপরদিকে প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে মিলে ভিন্ন চিত্র। ঝালকাঠি মডেল ক্লিনিকে সেপ্টেম্বর মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ৪৫ জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ৪জনের। অক্টোবর মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ৬৭ জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে দুই জনের। নভেম্বর মাসে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ৫৪ জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে একজনের। ডিসেম্বর মাসের ২১ তারিখ বিকেল ৪টা পর্যন্ত সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ৩৪জনের এবং নরমাল ডেলিভারি হয়েছে একজনের।
সদর হাসপাতালের পূর্ব গেইট সংলগ্ন স্কয়ার ক্লিনিক, ফায়ার সার্ভিস মোড়স্থ সদর পুলিশ ফাঁড়ি মার্কেটের দোতলায় সিটি ক্লিনিক, সদর উপজেলা পরিষদ গেইট সংলগ্ন মৌমিতা ক্লিনিকেও তথ্য জরিপ করা হয়।
চারটি প্রাইভেট ক্লিনিকের তথ্যে চলতি ডিসেম্বরের ২১ তারিখ সন্ধ্যা পর্যন্ত গত চার মাসে গড়ে সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে ৪০টিরও বেশি।
এক রোগীর স্বজন জানান, গত বুধবার ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অসুস্থ নারীকে গাইনি বিভাগের চিকিৎসক ডা. এাহমুদুল হাসনকে দেখান। এ সময় তিনি ওই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেন। বৃহস্পতিবার রাতে রোগীর অবস্থা আরো অবনতি হতে হাসপাতালে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের জানানো হলেও তারা আসেন না। পরে হাসপাতালের একজন নার্স তাদের বরিশাল শেরই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে রাতে হাসপাতালে রোগী রাখলে দুর্ঘটনা হতে পারে বলে ভয় দেখান।
তিনি আরো জানান, পরদিন শুক্রবার বরিশাল শেরই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের গাইনি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. খুরশিদ জাহানকে দেখালে তিনি দুপুরের মধ্যেই সিজারিয়ান অপারেশন করার পরামর্শ দেন। সিজারিয়ান না করলে গর্ভে থাকা সন্তান ও মায়ের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে জানান তিনি।
সদর হাসপাতালে যেহেতু শুক্রবারে অপারেশন করা হয় না, তাই প্রাইভেট ক্লিনিকে নিতেই বাধ্য হয়েছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ওই রোগীর স্বজনরা।
স্থানীয় মাহবুবুল ইসলাম জানান, মাতৃত্বকালীন রোগীরা স্পর্শকাতর থাকেন। অসুস্থ হলেই তাদের প্রথম আস্থার জায়গা সদর হাসপাতাল। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কোনো রোগী এলে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য জরুরি বিভাগ খোলা থাকে। কিন্তু জরুরি অপারেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই সদর হাসপাতালে। তখন তারা বরিশাল শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। তাছাড়া শনি, বুধ ও বৃহস্পতিবারে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) চালু থাকে। নির্ধারিত সময়ের আগের দিন ভর্তি না হলে তার অপারেশন করা হয় না।
তিনি আরো জানান, শনিবার সকাল ১০টায় যদি কোনো রোগী আসেন, আর তার অবস্থা যদি গুরুতর হয় তাহলে ঐ রোগী এবং স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। চিকিৎসক ওটিতে থাকায় একদিকে বহির্বিভাগের চিকিৎসক দেখাতে পারছেন না, অপরদিকে অপারেশনও হচ্ছে না। সরকারিভাবে অপারেশন করাতে হলে তাকে ৩দিন অপেক্ষা করতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীর স্বজনরা জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে তারা প্রাইভেট ক্লিনিকে নিতে বাধ্য হন।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের এক কর্মচারী জানান, আমি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী হয়েও আমার স্ত্রীকে সিজারিয়ান অপারেশন করিয়েছি প্রাইভেট ক্লিনিকে। কারণ হাসপাতালের পরিবেশ ও সেবার মান অনুন্নত। দক্ষ জনবল থাকলেও রোগীর প্রয়োজনে যথাসময়ে তাদের ডাকলে তেমন সাড়া মিলে না। ময়লা বিছানা, নোংরা বাথরুম। এতে রোগীর অপারেশন স্থলে ইনফেকশন হবার শঙ্কা থাকে।
ঝালকাঠির সিভিল সার্জন ডা. রতন কুমার ঢালী জানান, সদর হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার শনি, বুধ ও বৃহস্পতিবার খোলা থাকে। শুধুমাত্র সিজারিয়ানই না, অন্যান্য অপারেশনও হয়। বর্তমানে ১শ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে নির্ধারিত সময়ের বাইরে অপারেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। আড়াইশ বেডের হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলছে। সম্পন্ন হলে তখন সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা থাকবে।