শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, 2০২1
দিলরুবা শরমিন
Published : Sunday, 5 September, 2021 at 10:12 AM
বিচারের আগেই বিচার নয়

বিচারের আগেই বিচার নয়

বিচারের আগেই বিচার হাতে তুলে নেওয়ার রেওয়াজ আমাদের দেশে চলমান। যে কোনো একটা ঘটনা ঘটলেই আমরা উন্মুখ হয়ে পড়ি সেই বিষয়ে আমাদের ব্যক্তিগত এবং নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার জন্য। আমরা কেবল আমাদের মতামত প্রকাশ করেই ক্ষ্যান্ত হই না; উপরন্তু আমাদের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি বা আমাদের নিজস্ব মতাতত প্রতিষ্ঠা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। অন্যের যে এ বিষয়ে কোনো মতামত থাকতে পারে এবং সেটি যে ভিন্ন হতে পারে সেটি শুনি না বা মেনে নেই না। অন্যের মতামতকে মূল্যায়ন করার শক্তি, বুদ্ধি, মানসিকতা কোনোটাই নেই আমাদের। এসবই হচ্ছে এক ধরনের স্বৈরাচারী মানসিকতা, যা আমরা ব্যক্তিজীবন থেকে রাষ্ট্রীয়জীবনে চর্চা করে অভ্যস্ত। এত জাজমেন্টাল আমরা যে সচরাচর দেশের প্রচলিত আইনের কথা ভুলে যাই। সমাজের বিষয়টা তো মাথাতেই রাখি না। আদালতের প্রতি, বিচারব্যবস্থার প্রতি এমনকি নিজের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস বা সম্মান বোধ থাকলে এসব আমাদের করার কথা না।

আর এসব করি বিশেষ ক্ষেত্রে যদি সেটি ঘটে কোনো মেয়ের ক্ষেত্রে। মেয়েটির প্রথম যে দোষটা আমরা চোখ বন্ধ করে খুঁজে পাই সেটি হলো, তার চরিত্রের দোষ। পোশাকের দোষ। হোক সে বোরকা পরিহিতা বা আধুনিক পোশাকে সজ্জিতা। তাকে কুপোকাত করার প্রথম অস্ত্র তার চরিত্রহনন করা। তার পোশাক-আশাক, চাল-চলন, কথাবার্তা, আচার-আচরণের চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণে বসে যাই। এমনকি তার ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের নিখুঁত বিচারেও আমরা দ্বিধান্বিত হই না। ঘাঁটতে শুরু করি তার পারিবারিক ইতিহাস। অপরপক্ষ নিয়ে আমরা খুব বেশি চিন্তিত বা বিচলিত নই বা আমাদের নজরেই আসে না বা আমরা ভাবি-ই না যে মেয়েটির এ রকম অবস্থার পেছনে কোনো পুরুষের ভূমিকা আছে।

যে কোনো মামলায় নারী বাদী হোক বা বিবাদী হোক, হোক সে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা আমরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠি কীভাবে এখানে মেয়েটিকে চরিত্রের কালিমা লেপে দেওয়া যায়। মামলার মূল বিষয়বস্তু যাই হোক শেষ অবধি টার্গেট মেয়েটির চরিত্রহনন। এসব কিছুই হতো না যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বেগ পেতে না হতো। যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো বিশ্বাস করে ঘরে বাইরে নারীর প্রতি সহিংসতা বা নির্যাতন, ধর্ষণের জন্য নারী-ই দায়ী সেই ক্ষেত্রে কীভাবে এসব বিচার করা সম্ভব?

বাংলাদেশের সংবিধান, পক্ষে নানা আইন মেয়েদের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে একাধিক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে এটিও আমাদের গাত্রদাহ।

তা হলে কেন আমরা এসব অসভ্য, অশ্লীল, নিম্নমানের মন্তব্য করছি। কোন মেয়েকে কেন কীভাবে কোন সংস্থা গ্রেপ্তার করল আর কে কীভাবে জামিন পেয়ে বের হলো? আইনানুযায়ী গ্রেপ্তারের যেমন কারণ লাগে জামিনের তেমন যুক্তি থাকে। জামিন পাওয়া যে কোনো মানুষের অধিকার। এটি কে নো বিশেষ দয়া নয়। মেয়েদের দুর্বল বা অসহায় ভেবে যে বা যারা এসব কটূ তীর্যক মন্তব্য করেন তারা একটু ভেবে দেখতে পারেন যে ‘মানহানি মামলা’ দুই রকমের। ফৌজদারি আর দেওয়ানি। চাইলে আপনাকেও সেই মামলার আসামি এসব অভিযুক্ত নারীরা করতে পারেন। একটাতে আপনার জেল হবে আরেকটাতে আপনাকে আপনার ভিটা বেঁচে টাকা পরিশোধ করতে হবে।

লেখক : আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত


DMCA.com Protection Status
সম্পাদক ও প্রকাশক: নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, বাড়ি ৭/১, রোড ১, পল্লবী, মিরপুর ১২, ঢাকা- ১২১৬
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
Developed & Maintainance by i2soft