ঢাবি ছাত্র হাফিজুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানাল গোয়েন্দা পুলিশ
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Thursday, 27 May, 2021, 5:34 PM
ঢাবি ছাত্র হাফিজুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ জানাল গোয়েন্দা পুলিশ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এলএসডির (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড) যোগসূত্র পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, হাফিজুর ঘটনার দিন এলএসডি সেবন করেছিলেন। তারপরই বিভ্রম ঘটায় নিজেই নিজেকে হত্যা করেন তিনি।
গত ১৫ মে ঈদের দ্বিতীয় দিন জরুরি কাজের কথা বলে বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার খাড়েরা গ্রামের ইমাম মুজিবুর রহমানের ছেলে হাফিজুর। তারপর থেকে ঢাবির এই ছাত্রের নিখোঁজের খবর আসে তার পরিবার থেকে। পরে নিখোঁজের ৮ দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে তার লাশ শনাক্ত করে পরিবার।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে শাহবাগ থানার ওসি মামুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, ১৫ মে রাত পৌনে ৮টার দিকে ঢামেকের সামনে ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে হাফিজুর নিজের গলা নিজেই কাটতে থাকেন। ওই সময় তিনি বলছিলেন, আমাকে মাফ করে দাও। হাফিজুর মারা গেলেও তখন তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
পরে পরিচয় জানার পর এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজতে নেমে হাফিজুরের বন্ধু রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ ছাত্রকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার একে এম হাফিজ আক্তার জানান, ঢাবি শিক্ষার্থী হাফিজুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বুধবার ঢাকার লালমাটিয়া ও ধানমণ্ডি থেকে সাদমান সাকিব লুপল (২৫), আসহাব ওয়াদুদ তূর্য (২২) ও আদিব আশরাফ (২৩) নামের হাফিজুরের তিন বন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ২০০ ব্লট এলএসডি পাওয়া যায়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হাফিজুর ঈদের পরদিন ঢাকায় ফেরার পর সন্ধ্যায় এক প্রতিবন্ধী রিকশাচালকের সঙ্গে বাজে আচরণ করেছিলেন। এরপর তারা কার্জন হল এলাকায় নেশা করতে বসেন।
গ্রেফতার হাফিজুরের তিন বন্ধুর বরাত দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, এলএসডি গ্রহণের পর বন্ধুদের একজন হাফিজুরকে বলেন, মামা তুমি কাজটা ভালো করনি। এরপর হাফিজুর কার্জন হলের মাঠ থেকে ছুটে বেরিয়ে যান। বন্ধুরা একবার তাকে ধরে এনেছিল। এরপর তিনি আবার বেরিয়ে যান। কয়েকজন রিকশাচালকের পা চেপে ধরে বলেন, আমাকে মাফ করে দাও। এরপরই তিনি ডাব বিক্রেতার কাছ থেকে দা নিয়ে নিজের গলা কেটে আত্মহত্যা করেন। আর হাফিজুরের অবস্থা দেখে ভয়ে কাউকে কিছু না বলে বন্ধুরা পালিয়ে যায়।
জানা গেছে, এলএসডি সেবন করলে এক ধরনের বিভ্রম তৈরি হয়। এটা জিভের নিচে রেখে অথবা ইনজেকশনের মাধ্যমেও নেওয়া যেতে পারে। গ্রেফতার হওয়া হাফিজুরের তিন বন্ধুর কাছ থেকে যে এলএসডি ব্লট উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ, তা ছোট একটি ডাকটিকিটের মতো। এগুলো জিহ্বার নিচে রেখে সেবনের মতো।
ঢাকা মহানগর পুলিশ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, হাফিজুরের বন্ধুদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ’র বহিষ্কৃত ছাত্র সাদমানকে গ্রেফতার করে। তিনি বর্তমানে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ পড়ছেন। জিজ্ঞাসাবাদে সাদমান জানায়- তিনি টেলিগ্রাম অ্যাপে যোগাযোগ করে নেদারল্যান্ডসের এক ব্যক্তির কাছ থেকে পার্সেল সার্ভিসের মাধ্যমে ওই মাদকগুলো এনে প্রতি ব্লট ৩-৪ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। মাদক বিক্রির জন্য তাদের দুটি ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে। একটির নাম ‘আপনার আব্বা’। আরেকটি নাম ‘বেটার ব্রাউনি অ্যান্ড বেয়ন্ড’।
প্রসঙ্গত, ১৫ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ঢাকায় ফেরেন তিনি। সেদিন সন্ধ্যা থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। আট দিন নিখোঁজ থাকার পর গত ২৩ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র হাফিজুরের লাশ শনাক্ত করে পরিবার। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দায়ের কোপে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন তিনি।
হাফিজুর বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিভিত্তিক সংগঠন ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন।