ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বুধবার ২৪ জুন ২০২৬ ১০ আষাঢ় ১৪৩৩
সর্বাধিক ইসরায়েলি বিমান ধ্বংস করেছিলেন যে বাংলাদেশি বৈমানিক
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 18 May, 2021, 6:46 PM

সর্বাধিক ইসরায়েলি বিমান ধ্বংস করেছিলেন যে বাংলাদেশি বৈমানিক

সর্বাধিক ইসরায়েলি বিমান ধ্বংস করেছিলেন যে বাংলাদেশি বৈমানিক

বর্তমান সময়ে যখন ইসরায়েল ফিলিস্তিনে ফের তার বর্বতার মুখোশ উন্মোচন করেছে, ঠিক সেই সময়ে একজন বীর বাংলাদেশির নাম পুনরায় স্মৃতিতে ভেসে উঠছে। তিনি আমাদের গর্বের সাইফুল আজম। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, জর্দান ও ইরাকের বিমানবাহিনীতে বৈমানিকের দায়িত্ব পালন করেছেন ‘লিভিং ঈগল’ খ্যাত সাইফুল আজম। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান আকাশপথে যুদ্ধের ইতিহাসে তিনি সর্বোচ্চ সংখ্যক ইসরায়েলি বিমান ভূপাতিত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে একের পর এক ইতিহাস রচনা করে গেছেন এই বীর বাংলাদেশি। পৃথিবীর ২২ জন ‘লিভিং ঈগলের’ অন্যতম ছিলেন এই বৈমানিক।

১৯৬৭ সালে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শুরু হয় আরবদের এক ভয়াবহ লড়াই। ইতিহাসে এই লড়াই ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন অতর্কিত হামলায় মুহুর্মুহু বোমা ফেলে মিসরের প্রায় সব জঙ্গি বিমান ধ্বংস করে দেয় তখনকার অত্যাধুনিক জেট ফাইটার ‘মিরাজ’ আর ’সুপার মিসটেয়ার’ সজ্জিত ইসরায়েলি বাহিনী।

মিসরে এমন তাণ্ডবের পর ইসরায়েল একই রকম হামলা চালাতে যায় আরব মিত্র জর্দানে। অনেকটা বিনা বাধায় ইসরায়েলি ফাইটার জর্দানে ঢুকে মাফরাক বিমানঘাঁটিতে হামলা শুরু করে। সে সময় প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন কেবল তৎকালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে ডেপুটেশনে আসা দুঃসাহসী বাংলাদেশি তরুণ সাইফুল আজম সুজা

সাইফুল আজমের জন্ম ১৯৪১ সালে পাবনা জেলায়। বাবার কর্মসূত্রে তার শৈশবের কিছু সময় কেটেছিল কলকাতায়। ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় তার পরিবার ফিরে আসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। শিক্ষালাভের জন্য ১৪ বছর বয়সে সাইফুল আজমকে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। ১৯৫৮ সালে তিনি ভর্তি হন পাকিস্তান এয়ার ফোর্স ক্যাডেট কলেজে। দু’ বছর পর ১৯৬০ সালে তিনি পাইলট অফিসার হয়ে শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ওই বছরই জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে সাইফুল আজম যোগ দেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে।

সাইফুল আজমের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ হয় মার্কিন সেনাদের প্রশিক্ষণ বিমান ‘সেসনা টি-৩৭’ বিমান দিয়ে। পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কমিশন পাওয়ার পর প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের লুক এয়ার ফোর্স বেইজে পাঠানো হয় তরুণ অফিসার সাইফুল আজমকে। সেখানে বম্বিংয়ে নিখুঁত নিশানার ট্রেইনিংয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি ‘টপ গান’ উপাধি পান।

এরপর তিনি প্রশিক্ষণ নিতে যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার লুক এয়ারফোর্স বেইসে। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৬৩ সালে দেশে ফিরে সাইফুল আজম যোগ দেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ঢাকার কেন্দ্রে। পরে তিনি প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান করাচির মৌরিপুরের বিমান ঘাঁটিতে। এখানেই সাইফুল আজম ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের প্রশিক্ষক। ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাইফুল আজম পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রনের হয়ে যোগ দেন। এই যুদ্ধে কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সাইফুল আজমকে পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘সিতারা-ই-জুরাত’ এ ভূষিত করা হয়। ১৯৬৬ সালের নভেম্বর মাসে জর্দানের বিমানবাহিনী ‘রয়্যাল জর্দানিয়ান এয়ার ফোর্স’-এ পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রতিনিধি হিসেবে যান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজম। সেখানে তিনি জর্দানের বিমানবাহিনীতে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।

ছয়দিনের যুদ্ধে রয়্যাল জর্দানিয়ান এয়ারফোর্সের একটি হকার হান্টার নিয়ে সেদিন আকাশে উড়ে সাইফুল ফ্রান্সে তৈরি একটি ইসরায়েলি সুপার মিসটেয়ার জেট ভূপাতিত করেন। তার ছোড়া গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আরেকটি ইসরায়েলি ফাইটার পালানোর পথে বিধ্বস্ত হয়।

এমন বীরত্বের জন্য জর্ডানের বাদশাহর কাছ থেকে ‘ওয়াসাম-আল-ইসতিকবাল’ খেতাব পেয়েছিলেন বৈমানিক সাইফুল আজম। পরে মাফরাক বিমানঘাঁটি থেকে সেই যুদ্ধের দুদিনের মাথায় সাইফুল আজমের ডাক পড়ে যুদ্ধের আরেক ফ্রন্ট ইরাকে; সেখানেও ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলেন তিনি।

এক জর্দানি ও দুই ইরাকি বৈমানিককে সঙ্গে নিয়ে বাঙালি যোদ্ধা সাইফুল আজম সেদিন ওড়েন ইরাকি বিমানবাহিনীর হয়ে। পশ্চিম ইরাকের আকাশে ডগ ফাইটে সাইফুল ধরাশায়ী করেন ইসরায়েলের একটি মিরাজ ফাইটারকে। পরে ভূপাতিত করেন ইসরায়েলের ভুতুর বোমারু বিমান। দুই ইসরায়েলি বৈমানিক ধরা পড়ে ইরাকি বাহিনীর হাতে।

শুধু আরব যুদ্ধেই কৃতিত্ব দেখাননি সাইফুল আজম। এর আগে ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তার বীরত্বে আক্রান্ত হয় একটি ভারতীয় ‘ফোল্যান্ড নেট’ জঙ্গি বিমান। সে বিমান থেকে ভারতের ফ্লাইট অফিসার বিজয় মায়াদেবকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করা হয়। সে সময় প্রশিক্ষকের দায়িত্বে থাকাকালীনই সেপ্টেম্বর পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ১৭ নম্বর স্কোয়াড্রনের হয়ে ‘এফ-৮৬ স্যাবরজেট’ জঙ্গি বিমান নিয়ে এ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

২০২০ সালের ১৪ জুন ৭৯ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এই সাবেক গ্রুপ ক্যাপ্টেন। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাইফুল আজমের মৃত্যু হয়। সোমবার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ঘাঁটি বাশারে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শাহীন কবরস্থানে সমাহিত করা হয় তাকে। সাইফুল আজমের মৃত্যু শোকগ্রস্ত করেছিল ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদেরও। ফিলিস্তিনের ইতিহাসবিদ ওসামা আল-আশকার তাকে বর্ণনা করেছেন একজন ‘মহান বৈমানিক’ হিসেবে।

যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতা আর কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাদারিং অব ঈগলস ফাউন্ডেশন বিশ্বের যে ২২ বৈমানিককে ‘লিভিং ঈগল’ সম্মাননা দিয়েছিল, সাইফুল আজম তাদেরই একজন।

২০১৮ সালে ’লিভিং ঈগল: সাইফুল আজম’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্রে ভারতের সেই ফোল্যান্ড নাট বিমান ভূপাতিত করার একটা বর্ণনা দেন এই যোদ্ধা। আকাশে যথাযথভাবে নিশানা ঠিক করতে পারাকে নিজের সাফল্যের মূল কারণ হিসাবে বর্ণনা করে সেখানে তিনি বলেন, ‘আমার টার্গেট স্পটিং ছিল সুচারু, সে কারণে আমি সফল হতাম।’

সাইফুল আজম ১৯৮২ থেকে ৮৪ এবং ১৯৮৭ থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদে তিনি পাবনার একটি আসনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন।

জীবনের শেষ সময়ে নাতাশা ট্রেডিং এজেন্সির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন সাইফুল আজম। এমএএএস নামে একটি ট্রাভেল এজেন্সিও ছিল তার। পেশাগত জীবনে উচ্চশিখরে ওঠার স্বীকৃতি পেলেও সেভাবে প্রচারের আলোয় আসেননি ‘বিনয়ী, প্রচারবিমুখ ও স্বল্পভাষী’ বৈমানিক সাইফুল আজম।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status