মাত্র ২৬ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে মহামারী প্রতিরোধ সম্ভব
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Sunday, 26 July, 2020, 4:19 PM
মাত্র ২৬ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে মহামারী প্রতিরোধ সম্ভব
বিশ্বজুড়ে চলমান করোনা মহামারীতে যে পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার মাত্র ২ শতাংশ ব্যবহার করেই আসছে দিনগুলোতে নতুন কোন মহামারী প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে সেজন্য আগামী ১০ বছর রক্ষা করতে হবে বন্যপ্রাণী আর প্রাকৃতিক বন। সেজন্য ব্যয় করতে হবে করোনা মহামারীতে ক্ষতি হওয়া অর্থের মাত্র ২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের নতুন এ গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, গত এক শতকে ভাইরাস, বন্যপ্রাণী থেকেই মানবদেহে এসেছে। তাই বিরতিহীনভাবে বন্যপ্রাণীর আবাস কিংবা বন নিধন, বন্যপ্রাণী নিধন মানে ভবিষ্যতের জন্য এর ফলাফল খুবই ভয়াবহ।
গবেষণা বলছে, আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বন্ধ করা আর বন রক্ষায় কাজ করার শেষ সময় এটাই। গবেষকদের মতে, আগামী এক দশক বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় ২৬ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করলে ভবিষ্যতে করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী প্রতিরোধ সম্ভব। যেখানে কোভিড নাইনটিন মহামারীতে বিশ্বব্যাপী ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ডলার।
এদিকে, বন সুরক্ষায় আর বন্যপ্রাণী রক্ষায় গুরুত্ব দিলে একই সঙ্গে করোনার পরে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট পরিবেশ বিপর্যয়ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। কার্বন নিঃসরণ কমলে নিয়ন্ত্রণে আসবে জলবায়ু পরিবর্তন।
বিজ্ঞানীরা এরইমধ্যে রোগ প্রতিরোধ, চীনের বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বন্ধসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। বন ধ্বংস ৪০ শতাংশ কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে বন ধ্বংস করায় বনে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রাণী, যেমন বাদুর থেকে এসেছে ইবোলা, সার্স আর কোভিড নাইনটিনের মতো ভাইরাস। বন ধ্বংসের কারণেই নতুন নতুন সব ভাইরাস, মানুষকে সংক্রমিত করছে।
গবেষণা দলের প্রধান প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এন্ড্রিউ ডবসন বলেন, এটা চিন্তা করাই বোকামি যে, এক শতক পর পর মহামারী দেখা দিচ্ছে। পরিবেশের যতো ক্ষতি হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন ততো দ্রুত হচ্ছে, মহামারী ততো ভয়াবহ হচ্ছে।
ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ডুক বলেন, পরিবেশের ক্ষতি কমাতে বিনিয়োগ না করে যদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ইন্সুরেন্স পলিসি করা হয়, সেটা নিজের জন্যেও ভালো হবে না, বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও সুফল আনবে না। চাইলেই মহামারী শুরুর আগেই সেটা রোধ করা সম্ভব।
জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক প্রধান ইঙ্গার এন্ডারসন এ গবেষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, করোনা থেকে মুক্তি পেলেও বন্যপ্রাণী থেকে রোগ ছড়ানোর বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এখনই সতর্ক হলে ভবিষ্যতে কোটি কোটি ডলার বাঁচানো সম্ভব। সেই সঙ্গে এতো ভয়াবহ বিপর্যয়ও রোধ করা সম্ভব। সারাবিশ্ব এখন করোনা ভাইরাসে স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধ, ভ্যাক্সিন তৈরি আর অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কথা ভাবছে। কিন্তু মহামারী যে পরিবেশের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা নিয়ে মানুষের কোন মাথাব্যথা নেই। জাতিসংঘ বলছে, অনেক প্রাণঘাতি ভাইরাস ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারেনি শুধু প্রকৃতির কারণে।
জার্নাল সায়েন্সে প্রকাশিত এ প্রতিবেদন বলছে, পরিবেশ, ওষুধ, অর্থনীতির জন্য অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। কিন্তু বন্যপ্রাণী রক্ষায় কোন বরাদ্দ নেই। উল্টো বিশ্বে বন্যপ্রাণী বাণিজ্য থেকে আয় হয় লাখ লাখ ডলার। তাই এর বিরুদ্ধে নেই কোন জোরালো পদক্ষেপ।
অধ্যাপক ডবসন জানান, বন্যপ্রাণী বাণিজ্যে অনেক দুর্নীতি, যে কারণে অনেক দেশের রাজনীতিবিদই চান না এটা বন্ধ হোক। চীনে বন্যপ্রাণী বাণিজ্য বন্ধ হলেও এই খাত থেকে বছরে আয় হতো ২ হাজার কোটি ডলার। এ খাতে সম্পৃক্ত ছিলো কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। কিন্তু পশু চিকিৎসক ছিলো হাতেগোনা কয়েকজন।
এ বিষয়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের নেচার অ্যাকশন এজেন্ডা প্রধান আকাঙ্খা ক্ষাত্রি বলেন, কোভিড নাইনটিনই দেখিয়েছে, মানুষের জীবন আর অর্থনীতি পুরোটাই পৃথিবীর বাস্তুসংস্থানের সমতার ওপর নির্ভরশীল। যদি মানুষ স্রোতের বিপরীতে যাওয়ার চেষ্টা করে, ক্ষতি হবেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পশু চিকিৎসক স্টিফেন রক জানান, করোনা মহামারীর পর সবাই বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছে। বন্যপ্রাণী রক্ষা নিয়ে আলোচনা হয় ঠিকই, কিন্তু বন্যপ্রাণী রক্ষায় বিশ্বের কোন দেশেই কোন তদারকি ব্যবস্থা নেই। বন্যপ্রাণী আর বন রক্ষাই মূল চ্যালেঞ্জ আর মহামারী থেকে রক্ষার একমাত্র পথ বলেও মনে করেন গবেষকরা।