নিজের দেহে অস্ত্রোপচার করে অ্যাপেনডিক্স বাদ দিয়েছেন এই ডাক্তার
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 29 October, 2019, 4:48 PM
নিজের দেহে অস্ত্রোপচার করে অ্যাপেনডিক্স বাদ দিয়েছেন এই ডাক্তার
যেখানে বসবাস করেন, তার চারিদিকে বরফ আর বরফ। সেখানে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক। সে কারণে নিজের অসুখে নিজেরই চিকিৎসা করা ছাড়া উপায় নেই তার। শুধু চিকিৎসা নয়, নিজের দেহে নিজেই অস্ত্রোপচার করেছিলেন লিওনিড রোগোজোভ। শরীর থেকে কেটে বাদ দিয়েছিলেন অ্যাপেনডিক্স।
মঙ্গোলিয়া এবং চীনের সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্ত থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে পূর্ব সাইবেরিয়ার চিটা ওব্লাস্ট গ্রামে রোগোজোভের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১৪ মার্চ। লেলিনগ্রাদ পেডিয়াট্রিক মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট থেকে তিনি ডাক্তারি পাশ করেন ১৯৫৯ সালে। তার খ্যাতি ছিল অস্ত্রোপচারে।
১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত অ্যান্টার্কটিকায় কর্মরত ছিলেন রোগোজোভ। ১৩ জন বিজ্ঞানী তথা গবেষকের দলে তিনি ছিলেন একমাত্র চিকিৎসক। তাদের কর্মক্ষেত্র ছিল নোভোলাজারেভস্কায়া স্টেশন।
হিমশীতল মেরুপ্রদেশে নোভোলাজারেভস্কায়া স্টেশনে ১৯৬১ সালের এপ্রিল মাসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন রোগোজোভ। প্রথমে দুর্বলতা তারপর বমি, হালকা জ্বর এবং তলপেটের ডানদিকে ব্যথা শুরু হয়।
সম্ভাব্য শুশ্রূষা সবই করেন রোগোজোভ। কিন্তু উপসর্গ ক্রমশ বাড়তে থাকে। নিজে চিকিৎসক হওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন, তার সমস্যা অ্যাপেনডিসাইটিস। অস্ত্রোপচার না করলেই নয়!
অস্ত্রোপচার করতে হলে আরেকটি গবেষণাকেন্দ্রে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সেই মুহূর্তে নোভোলাজারেভস্কায়ার সবথেকে কাছের গবেষণাকেন্দ্র মিরনি ছিল ১৬০০ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যাওয়ার একমাত্র ভরসা বিমান। কিন্তু তীব্র তুষারঝড়ে সে বাহনও ব্যবহারের অযোগ্য ছিল।
রোগোজোভ বুঝলেন নিজের অস্ত্রোপচার নিজেই করতে হবে। তা করতে না পারলে প্রাণ সংশয় আসন্ন। ১৯৬১ সালের ১ মে দুপুর ২টার সময় অস্ত্রোপচারের সময় ঠিক হয়। গবেষণাকেন্দ্রে তৈরি হলো অস্থায়ী অস্ত্রোপচার থিয়েটার। রোগোজোভের পাশে থাকলেন একজন আবহাওয়া-বিজ্ঞানী এবং একজন গাড়িচালক।
আধশোয়া রোগোজোভের সামনে ধরা হলো আয়না। ইনজেকশন দিয়ে তলপেটের নির্দিষ্ট অংশ অবশ করলেন তিনি। ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে বলে লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া। এরপর অস্ত্রোপচার শুরু করলেন তিনি।
আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে এগোতে লাগল রোগোজোভের হাতের ছুরি-কাঁচি। অ্যাপেনডিক্স বাদ দিতে গিয়ে প্রথমে অন্য অঙ্গ ‘সিকাম’-কে আঘাত করে বসেন তিনি। তারপর সেটি সেলাই করে আবার নির্দিষ্ট দিকে এগোতে শুরু করল তার হাতের অস্ত্র।
অবশেষে অ্যাপেনডিক্স দেখতে পেলেন রোগোজোভ। সেটি তখন যথেষ্ট সংক্রমিত। শরীর থেকে সেটি বাদ দিলেন তিনি। বুঝলেন, এই অস্ত্রোপচার না করলে যে কোনো সময় সেটি পেটের ভিতরে ফেটে যেত। তাহলে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি দেখা দিতে পারত।
ক্ষতিগ্রস্ত অঙ্গ বাদ দেওয়ার পর আবার নিপুণ হাতে অস্ত্রোপচারের জায়গা সেলাই করে ফেলেন রোগোজোভ। প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। এর সাতদিন পর সেলাই কাটা হয়। দুই সপ্তাহ পরে পুরনো কাজের ছন্দে ফেরেন চিকিৎসক রোগোজোভ।
চিকিৎসকের এই স্ব-অস্ত্রোপচার শিরানোমে চলে এসেছিল স্বভাবতই। লিওনিড রোগোজোভকে পুরস্কৃত করা হয় ‘অর্ডার অব দ্য রেড ব্যানার অব লেবার’ সম্মানে। সব গবেষণাকেন্দ্রে কর্মরতদের শারীরিক চেকআপ-এ আরো গুরুত্ব দেওয়া হয়।
১৯৬১ সালে লেনিনগ্রাদে ফিরে আসেন রোগোজোভ। এম ডি হিসেবে যোগ দেন লেলিনগ্রাদ পেডিয়াট্রিক মেডিক্যাল ইনস্টিটিউট-এ। যেখান থেকে তিনি ডাক্তারি পাশ করেছিলেন।
এরপর তিনি লেনিনগ্রাদের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর টিউবারকুলার পালমোনোলজি-র বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে লিওনিড রোগোজোভ মারা যান ২০০০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, ৬৬ বছর বয়সে।