|
রেলের টিকিট ছাড়ার আগেই ব্লক, নিয়ন্ত্রণ সহজের হাতে!
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() রেলের টিকিট ছাড়ার আগেই ব্লক, নিয়ন্ত্রণ সহজের হাতে! অডিটে পাওয়া তথ্য বলছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ‘সহজ ডট কম’-এর কর্মীদের কাজ ছিল হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ। টিকিট বিক্রি, আসন সংরক্ষণ, কোটা সমন্বয় কিংবা টিকিট ব্লক ও পুনরায় ছাড়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে তাদের সরাসরি যুক্ত থাকার কথা নয়। অথচ বাস্তবে বিভিন্ন রেলস্টেশনের বিপুলসংখ্যক প্রশাসনিক হিসাব ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার প্রমাণ পেয়েছে অডিট কর্তৃপক্ষ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম ও সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ই-টিকিটিং ব্যবস্থায়। অডিটে ছয়টি সক্রিয় ব্যবহারকারীর তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব হিসাব সহজ ডট কমের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। শুধু তাই নয়, সিলেট স্টেশনে দায়িত্ব পালনকারী ভেন্ডর প্রতিনিধির প্রশাসনিক ড্যাশবোর্ড পরীক্ষা করে অডিট কর্মকর্তারা দেখতে পান, সাধারণ যাত্রীদের জন্য টিকিট উন্মুক্ত হওয়ার এক থেকে পাঁচ দিন আগেই দেশের যেকোনো রুটের টিকিট ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ যাত্রীদের জন্য টিকিট ছাড়ার আগেই নির্দিষ্ট আসন আটকে রাখার সক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের হাতে, যাদের চুক্তি অনুযায়ী টিকিট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকার কথা নয়। অডিটে আরও উঠে এসেছে, বিভিন্ন রেলস্টেশনের প্রায় ১৬৯টি প্রশাসনিক হিসাব সহজ ডট কমের কর্মীরা পরিচালনা করছেন। অথচ এসব হিসাবের মাধ্যমে টিকিট ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে সেখানে ভেন্ডর কর্মীদের প্রবেশাধিকার থাকা কতটা নিরাপদ—এ প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। রেলের অনলাইন টিকিট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ—টিকিট ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট শেষ হয়ে যায়। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত টিকিট পান না। ফলে কালোবাজারি, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে টিকিট বিক্রির অভিযোগও মাঝেমধ্যে সামনে আসে। এই পরিস্থিতিতে টিকিট সাধারণের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার আগেই তা ব্লক করার সুযোগ যদি ভেন্ডর কর্মীদের হাতে থাকে, তাহলে পুরো ই-টিকিটিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে ট্রেনের টিকিট বিক্রি ও ব্যবস্থাপনার জন্য সহজ ডট কমের সঙ্গে চুক্তি করে। যাত্রীদের টিকিটপ্রাপ্তি সহজ ও স্বচ্ছ করাই ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু অডিটে চুক্তির শর্তের সঙ্গে বাস্তব ব্যবস্থাপনার এমন পার্থক্য ধরা পড়ায় সেই উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ই-টিকিটিং ব্যবস্থা আগের কালোবাজারি ব্যবস্থারই নতুন রূপ হয়ে যাচ্ছে কি না, অডিটের তথ্য থেকে সে ধরনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, রেলওয়ে মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের নিজস্ব প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম জনবল দিয়ে অভ্যন্তরীণ নজরদারি ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের হাতে টিকিট ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা হলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অডিটে ওঠা অভিযোগ ও ভেন্ডর কর্মীদের প্রশাসনিক প্রবেশাধিকার সম্পর্কে জানতে সহজ ডট কমের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আমিনুল হক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। মুঠোফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। রেলের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সহজ ডট কমের কর্মীদের দায়িত্ব ছিল মূলত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সচল রাখা। কিন্তু অডিটে যদি সত্যিই টিকিট ব্লক, আসন সংরক্ষণ কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে তাদের প্রবেশাধিকার থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন শুধু চুক্তি লঙ্ঘনের নয়—প্রশ্ন উঠছে পুরো রেল টিকিট ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে। সাধারণ যাত্রীর টিকিট যখন কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়, তখন সেই টিকিট যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ার আগেই কারা তা আটকে রাখছে—অডিটের এই তথ্যের পর সেই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এখন জরুরি হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ১৬৯টি প্রশাসনিক হিসাবের প্রবেশাধিকার কারা ব্যবহার করছেন, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন এবং এসব হিসাব দিয়ে টিকিট ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের পরিবর্তন করা সম্ভব—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে। অডিটের তথ্য সত্য হলে, রেলের অনলাইন টিকিট ব্যবস্থা যাত্রীবান্ধব করার নামে এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে টিকিট ছাড়ার আগেই তা আটকে রাখার ক্ষমতা চলে গেছে ভেন্ডর কর্মীদের হাতে। আর এই সুযোগই ভবিষ্যতে টিকিটের কৃত্রিম সংকট ও কালোবাজারির পথ আরও প্রশস্ত করছে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন। |
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
