|
১২ বছর ধরে ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধ, শুরু স্ত্রীকে হত্যা করে
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() ১২ বছর ধরে ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধ, শুরু স্ত্রীকে হত্যা করে এর মধ্যে রয়েছে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর নারীকে হত্যা। সর্বশেষ ঢাকার আশুলিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী, তার স্বামী ও গর্ভের সন্তান হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন মনিরুজ্জামান। গ্রেপ্তারের পর আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, মনিরুজ্জামান ওরফে মনির হোসেন ওরফে হৃদয় মাতুব্বরের বয়স ৪৪ বছর। তার বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দামদরদি গ্রামে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। স্ত্রীকে হত্যা ছোটবেলা থেকেই মনিরুজ্জামানের আচরণ ছিল উগ্র ও বেপরোয়া। বিয়ের পরও সেই আচরণে পরিবর্তন আসেনি। বরং বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই নিজের স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালে নগরকান্দায় স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার পর পালিয়ে যান মনিরুজ্জামান। এ ঘটনায় নগরকান্দা থানায় তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। পরে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরকান্দা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল কুদ্দুস বলেন, মনিরুজ্জামান বখাটে প্রকৃতির ছিলেন। কারণে-অকারণে প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতেন। পরিবার তাকে বিয়ে দিয়েছিল সংসারে মনোযোগী করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর আশায়। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি ঘুমন্ত স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে পালিয়ে যান। ওই মামলায় তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। চার বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পান মনিরুজ্জামান। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর আবারও গা ঢাকা দেন। স্ত্রী হত্যা মামলায় আদালতে নিয়মিত হাজিরা না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়। আশুলিয়ায় নতুন অপরাধ জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় গিয়ে আত্মগোপন করেন। সেখানে সবজির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। কিন্তু এর পরও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বের হতে পারেননি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। সর্বশেষ আশুলিয়ার জামগড়ায় জোড়া খুনের ঘটনায় তার নাম সামনে আসে। গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে মধ্য আশুলিয়ার জামগড়ার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে নাজমা বেগম (৩৯) ও তার স্বামী আলমগীর কবিরের (৪৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নাজমা ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। খাটের ওপর পড়ে ছিল তার মরদেহ। তার গর্ভের সন্তানও আঘাতের কারণে মারা যায়। অন্যদিকে আলমগীরের মরদেহ পাওয়া যায় একই কক্ষের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় দড়ি প্যাঁচানো অবস্থায়। নাজমা একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। তার স্বামী আলমগীরও আগে পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি বেকার ছিলেন। তাদের দুজনের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায়। এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামসুল আরেফিন বলেন, হত্যাকাণ্ডের শুরুতে পিবিআইয়ের হাতে তেমন কোনো সূত্র ছিল না। পরে গুপ্তচর নিয়োগ করে মনিরুজ্জামানকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। গত ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আলমগীর ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন মনিরুজ্জামান। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাজমার পার্স, সিমসহ মুঠোফোন ও পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, আশুলিয়ায় আত্মগোপনে থাকার সময় আলমগীরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের পরিচয় হয়। তাদের বাসাও ছিল কাছাকাছি। আলমগীর তখন বেকার ছিলেন। অন্যদিকে মনিরুজ্জামান সবজির ব্যবসা করতেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নাজমাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আগে থেকেই তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন মনিরুজ্জামান। বিষয়টি জানতে পেরে আলমগীরের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। গত ২ সেপ্টেম্বর মনিরুজ্জামানকে দাওয়াত দিয়ে নিজেদের বাসায় ডেকে নেন আলমগীর ও তার স্ত্রী। সেখানে যাওয়ার পর নাজমার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আলমগীরের সঙ্গে মনিরুজ্জামানের কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। পিবিআই জানায়, এ সময় নাজমা ঝাঁটা দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। জবাবে মনিরুজ্জামান তার পেটে লাথি মারেন। এতে নাজমা খাটের ওপর পড়ে যান। আঘাতের ফলে তার গর্ভের সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়ে যায় এবং নাজমা ও তার সন্তান মারা যান। এ সময় আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে মনিরুজ্জামানকে আঘাত করেন। পরে মনিরুজ্জামান আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এরপর তার মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন। পরে নাজমার অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন, সিমকার্ড, পরিচয়পত্র ও ব্যবহৃত পার্স নিজের বাসায় নিয়ে যান মনিরুজ্জামান। এ ঘটনায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর নারীকে হত্যা ![]() ১২ বছর ধরে ধর্ষণ-খুনের মতো অপরাধ, শুরু স্ত্রীকে হত্যা করে জিজ্ঞাসাবাদে মনিরুজ্জামান ওই ঘটনার কথাও স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই। ওই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তারের প্রায় আট মাস পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি চলমান থাকা অবস্থাতেই আশুলিয়ার জামগড়ার ওই বাসায় ঢুকে আলমগীর, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমা এবং তাদের গর্ভের সন্তানকে হত্যার ঘটনা ঘটে। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন মনিরুজ্জামানের একের পর এক অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণে তার পরিবারের সদস্যরাও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। মনিরুজ্জামানের বড় বোন তাসলিমা বেগম বলেন, তার ভাই ছোটবেলা থেকেই উগ্র ও অবাধ্য স্বভাবের ছিলেন। তার আচরণ নিয়ে মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা সব সময় অসন্তুষ্ট ছিলেন। সন্তানের আচরণে কষ্ট নিয়ে প্রায় ৪০ দিন আগে তাদের বাবা জব্বার মাতুব্বর মারা গেছেন। তাদের মা বর্তমানে অসুস্থ। তাসলিমা বেগম বলেন, মনিরুজ্জামানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি যে অপরাধ করেছেন, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তার সর্বোচ্চ শাস্তি হলেও পরিবারের কোনো আপত্তি বা আক্ষেপ নেই। তিনি জানান, স্ত্রী হত্যা মামলায় কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতেন না। পরে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দা ছেড়ে চলে যান। এরপর পরিবারের সদস্যরাও তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। মনিরুজ্জামানের প্রথম স্ত্রীর সংসারে একটি মেয়ে রয়েছে। বর্তমানে তার মা মেয়েটির পড়াশোনার দায়িত্ব পালন করছেন। পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগের মধ্য দিয়ে যে অপরাধজীবনের শুরু, পরবর্তী ১২ বছরে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সর্বশেষ আশুলিয়ায় আলমগীর ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নাজমাকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন তিনি। সূত্র: প্রথম আলো
|
| « পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ » |
