|
সৌদি-হুথি তীব্র সংঘাত, ইয়েমেনে ফের বড় যুদ্ধের শঙ্কা?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() সৌদি-হুথি তীব্র সংঘাত, ইয়েমেনে ফের বড় যুদ্ধের শঙ্কা? সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এসব হামলায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। হুথিরা মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি একে ‘বিস্তৃত অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি খাতের একাধিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে আগুনও ছড়িয়ে পড়ে। সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে জাজান তেল শোধনাগার অন্যতম। এই শোধনাগারে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। হুথিদের দাবি, তারা ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে আরামকোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠীটি বলেছে, ইয়েমেনে হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি হামলার জবাব হিসেবে এসব হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে সোমবার হুথিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব ইয়েমেনের আল-জাওফ, আল-বাইদা, মারিব ও তাইজ প্রদেশে বিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সৌদির জ্বালানি স্থাপনায় হুথিদের হামলা আল-জাওফের রাজধানী আল-হাজমের একটি কারাগারে সৌদি বিমান হামলায় সাতজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন বলেও দাবি করে হুথিরা। তবে এ বিষয়ে সৌদি আরব তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর পাল্টা অভিযান ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারও হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান জোরদার করেছে। সরকারি বাহিনী রোববার জানিয়েছিল, তারা হোদেইদা, মারিব ও আল-জাওফে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে। সোমবার তারা স্থল অভিযানও বাড়ায়। আল-জাওফের আল-লাবানাত পর্বতমালার দিকে অগ্রসর হওয়ার দাবি করেছে সরকারপন্থি বাহিনী। একই সঙ্গে, ইয়াতমা এলাকায় রকেট হামলা এবং হুথি যোদ্ধাদের সঙ্গে তীব্র লড়াইয়ের কথা জানানো হয়েছে। আল-বাইদার ধি নাঈম এলাকাতেও অগ্রগতির দাবি করেছে তারা। অন্যদিকে হুথিরা জানিয়েছে, তারা আল-লাবানাতের দিকে সরকারি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দিয়েছে এবং সরকারি বাহিনীর সদস্যদের হতাহত করেছে। তবে উভয় পক্ষের এসব সামরিক দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি বলেছেন, সরকারি বাহিনী আল-জাওফ, আল-বাইদা, তাইজ ও হোদেইদায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইয়েমেনের উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী মেজর জেনারেল সামির আল-সাবরি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, সরকার সানা পুনর্দখলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন বাড়ছে সংঘাত? সৌদি-হুথি সাম্প্রতিক সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে বাব আল-মান্দাব প্রণালি। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হুথিরা জুলাইয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছিল। একই সময়ে তারা বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি আল-মাখা বা মোখা এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিধিনিষেধের কারণে সৌদি আরবকে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। মার্চ থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাব আল-মান্দাব দিয়ে সৌদি আরবের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় আটগুণ বেশি ছিল। ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়েছে। এটি বৈশ্বিক মোট পরিবহনের প্রায় পাঁচ শতাংশ। ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত বাড়ায় মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, ২৩ আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৭২৮ জন নিহত বা আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়েছে তাইজ ও দেশটির পশ্চিম উপকূলীয় এলাকায়। শুধু তাইজ থেকেই বৃহস্পতিবার থেকে আনুমানিক ২১ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার পরিবার রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাস্তুচ্যুতি ও হতাহতের পাশাপাশি ইয়েমেনের দুর্বল অর্থনীতির ওপরও বড় চাপ তৈরি হবে। ইয়েমেন এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ দেশটির স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সংঘাত কি বড় যুদ্ধে রূপ নেবে? বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর স্বার্থও জড়িয়ে গেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক আহমেদ নাগির মতে, পশ্চিম উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রার লক্ষ্য শুধু ভূখণ্ড দখল নয়। এর সঙ্গে লোহিত সাগরের নৌপথের ওপর চাপ বাড়ানোর বিষয়টিও যুক্ত। তবে এই সংঘাতে দ্রুত কোনো পক্ষের চূড়ান্ত বিজয় হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ইয়েমেনের দীর্ঘ ইতিহাস বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত সামরিক বিজয়ের বদলে রাজনৈতিক সমঝোতার পথেই যেতে হতে পারে। সৌদি রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালেদ বাতারফির ধারণা, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার জবাবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। তবে সেটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা কম। অন্যদিকে ইয়েমেন-বিষয়ক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই বাড়বে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ। ফলে সৌদি-হুথি সংঘাতের পরবর্তী ধাপ শুধু ইয়েমেনের রাজনীতি নয়, লোহিত সাগরের নৌপথ এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: আল-জাজিরা |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
