নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর সম্ভাব্য আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমাতে চারটি হিমবাহ হ্রদের পানির স্তর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। প্রায় ৫ কোটি ডলারের এই প্রকল্পে পাহাড়ি এলাকার প্রায় ২৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে জানিয়েছে নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ (ডিএইচএম)। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু কয়েক মিটার পানি কমিয়ে এসব হ্রদের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব নয়।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি নতুন করে সামনে এনেছে। ওই ঘটনায় লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। পরে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নিচে নেমে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।
নেপাল সরকারের নতুন প্রকল্পের আওতায় ভোতেকোশি ও গণ্ডকী অববাহিকার চারটি হ্রদের পানি কমানো হবে। এগুলো হলো সোলুখুম্বুর লুমডিং সো ও হোঙ্গু-২, সংকুয়াসভার লোয়ার বারুন এবং মানাংয়ের থুলাগি।
২০২০ সালের আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপির যৌথ গবেষণায় এসব হ্রদকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ দেশটির সীমানায় রয়েছে।
প্রকল্পটির নাম ‘গ্লফ বা জিএলওএফ সঞ্জীবনী প্রকল্প’। এতে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড থেকে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলার অনুদান দেওয়া হচ্ছে। নেপাল সরকার ও অংশীদার সংস্থাগুলো আরও ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার সংগ্রহ করবে। প্রকল্পটির জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক রাজন ভট্টরাই জানিয়েছেন, এ বছর নির্মাণকাজ শুরু হবে না; আগে নকশা চূড়ান্ত ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হবে।
চারটি হ্রদের পানি কতটা কমানো হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে থো রোলপা ও ইমজা হ্রদের মতো প্রায় একই মাত্রায় পানি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানেই আপত্তি বিশেষজ্ঞদের।
মার্কিন পর্বত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অ্যালটন সি. বায়ার্স বলেন, তিন মিটার পানি কমানোর ধারণাটি যথেষ্ট নয়। থো রোলপা হ্রদের পানি সর্বোচ্চ ২০ মিটার কমানোর মূল পরিকল্পনা থাকলেও বাজেটের কারণে শেষ পর্যন্ত তিন মিটার কমানো হয়েছিল। ইমজার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা ছিল।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিতেশ খাডকা বলেন, একটি হ্রদের পানি দুই বা চার মিটার কমাতে কোটি কোটি ডলার খরচ করে খুব বেশি লাভ হবে না। তাঁর মতে, পানি এমন পর্যায়ে কমাতে হবে, যাতে ভাটিতে অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি হ্রদের জন্য আলাদা গবেষণা করে পানির স্তর কতটা কমানো প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে। শুধু পানি কমানো নয়, হ্রদের পানি বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক বাঁধ শক্তিশালী করা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাও জরুরি।
হিমবাহ বিশেষজ্ঞ জেফরি এস. কারগেল বলেন, পানি কমানোর পাশাপাশি বন্যার সম্ভাব্য পথে বসতি ও অবকাঠামো নির্মাণেও সতর্ক হতে হবে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ স্থান বেছে নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শুধু বড় হ্রদ নয়, ছোট হিমবাহ হ্রদগুলোকেও নজরে আনতে হবে। কারণ নেপালের ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদের বেশিরভাগই এখনো পর্যাপ্তভাবে গবেষণা করা হয়নি।
তাই বিজ্ঞানীদের মতে, হিমবাহ হ্রদের পানি কমানো ঝুঁকি কমানোর একটি উপায় হলেও এটি একা বন্যা মোকাবিলার সমাধান নয়। নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা এবং নিরাপদ অবকাঠামো পরিকল্পনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।