|
‘গোপন তৎপরতার’ অভিযোগে ৫৮ শিক্ষক শনাক্ত, তদন্তে কারা?
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() ‘গোপন তৎপরতার’ অভিযোগে ৫৮ শিক্ষক শনাক্ত, তদন্তে কারা? এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাষ্ট্রবিরোধী ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে শনাক্ত শিক্ষকদের সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে। নীল দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের সংগঠন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, তালিকায় নাম এসেছে সাদা দলের শিক্ষক এবং ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও আক্রোশ থেকেও কেউ কেউ তালিকায় নাম যুক্ত করেছেন বলে তাদের অভিযোগ। যদিও তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তালিকা প্রকাশ করা হবে না। যেসব নাম এসেছে, তাদের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা যাচাই করে তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের পরিচালক স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রবিরোধী ‘গোপন তৎপরতায়’ লিপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিষয় খতিয়ে দেখে করণীয় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় সুপারিশের জন্য প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি শনাক্ত হওয়া শিক্ষকদের সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখবে এবং করণীয় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবে। ভবিষ্যতে আরও কোনো শিক্ষকের নাম শনাক্ত হলে তাদের বিষয়ও একইভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিষয়ে কী ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে এবং তার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, তাও পর্যালোচনা করবে কমিটি। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও আইন অনুষদের ডিন। ইতোমধ্যে কমিটি একটি সভা করে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। কমিটির অন্য দুই সদস্যও সাদা দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অভিযুক্ত ৫৮ শিক্ষকের তালিকায় কারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি, রাষ্ট্রবিরোধী ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তালিকায় থাকা শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন প্রফেসর ড. আজমল হোসেন ভূঁইয়া, প্রফেসর ড. মো. আসাদুজ্জামান, প্রফেসর ড. তাওহিদা রশীদ, প্রফেসর ড. মো. হাসিবুর রহমান, প্রফেসর ড. মাহবুব লিটু, প্রফেসর ড. এস এম আব্দুর রহমান, প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলাম, প্রফেসর ড. বিমান বড়ুয়া ও প্রফেসর ড. শাহাদাত সিদ্দিকী। এছাড়া রয়েছেন প্রফেসর সুব্রত সাহা, প্রফেসর ড. জামিলা এ. চৌধুরী, প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন, প্রফেসর ড. বদরুজ্জামান ভূঁইয়া কাঞ্চন, প্রফেসর ড. মো. হারুনুর রশীদ খান, প্রফেসর ড. শবনম জাহান, প্রফেসর ড. মো. মাসুদুর রহমান, প্রফেসর ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রফেসর ড. কে.এম সাইফুল ইসলাম খান, প্রফেসর ড. মো. আমিনুল হক ভূঁইয়া ও প্রফেসর ড. সুরাইয়া আক্তার। অভিযোগের তালিকায় থাকা অন্য শিক্ষকরা হলেন জেড. এম. পারভেজ সাজ্জাদ, ড. ইশরাত জাহান, এটিএম শামসুজ্জোহা, ড. মন্দিরা চৌধুরী, মো. আক্তারুজ্জামান সিনবাদ, ড. কালিদাস ভক্ত, নাজির খান খোকন, ড. মুশফিক মান্নান চৌধুরী, জাবিদ ইকবাল বাঙালি, ড. মুজিব লেনিন পলাশ, ড. সিদ্ধার্থ দে, ড. জীনাত হুদা ও আবু সারা শামসুর রউফ। ‘তালিকা নিয়ে এখনই মন্তব্য নয়’ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম গণমাধ্যমকে বলেন, কমিটি একটি সভা করেছে। ওই সভায় তালিকাগুলো নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য আরও দুই-একজনকে কমিটিতে কো-অপ্ট করার কথাও আলোচনা হয়েছে। চিহ্নিত শিক্ষকদের সবাই নীল দলের সঙ্গে যুক্ত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য নেই। তার কাছে থাকা ফাইল পরবর্তী সভায় কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হবে। ওই সভার পর এ বিষয়ে আরও ভালোভাবে বলা সম্ভব হবে। ৫৮ শিক্ষক শনাক্তে উদ্বেগ শিক্ষক নেটওয়ার্কের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিরোধী ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে ৫৮ শিক্ষককে শনাক্তের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, কোন আইনে, কীসের ভিত্তিতে এবং কারা ৫৮ শিক্ষককে শনাক্ত করেছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করা দোষের কিছু নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে রাজনীতি ও মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রবিরোধী ‘গোপন তৎপরতা’ কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, কারা করেছে এবং কীসের ভিত্তিতে করেছে, সেটিও দেখতে হবে। এসব ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে একধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, রাষ্ট্রবিরোধী ‘গোপন তৎপরতায়’ জড়িত থাকার অভিযোগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়েও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৮ শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. নাছির আহমদকে আহ্বায়ক এবং রেজিস্ট্রার দপ্তরের সেকশন কর্মকর্তা মো. আবুল মালেককে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জামির হোসেন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেজবাহ-উল আলম সওদাগর। তারা সবাই বিএনপিপন্থী সংগঠন ইউট্যাবের সঙ্গে জড়িত। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহউপাচার্য ড. মো. এমতাজ হোসেনকে আহ্বায়ক এবং অর্থ ও হিসাব বিভাগের উপ-হিসাব পরিচালক ইসরাফুল হককে সদস্যসচিব করা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানেল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাজ্জাত হোসেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন সদস্যের তথ্য অনুসন্ধান কমিটি করা হয়েছে। মেরিন সায়েন্সেস অ্যান্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. শাহাদাত হোসেনকে আহ্বায়ক, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আশরাফুল আজম খানকে সদস্যসচিব এবং রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর মো. কামরুল হোসেনকে সদস্য করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটির অধিকাংশ শিক্ষকই বিএনপিপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তদন্ত কমিটি গঠন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শওকত জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, টেলিগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী কী আলোচনা হয়েছে, তা যাচাই না করে গণমাধ্যমে একটি বিষয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তথ্য অনুসন্ধান কমিটি করলে বিষয়টি আরও সম্মানজনক হতো। অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের আগে কাউকে অভিযুক্ত করা ঠিক নয়। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
