|
যে সমস্ত মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন গবেষকরা
সায়ীদ আবদুল মালিক
|
![]() যে সমস্ত মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন গবেষকরা মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে সাধারণত ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। বড় প্লাস্টিক পণ্য ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়া, সিনথেটিক কাপড়ের তন্তু, গাড়ির টায়ারের ক্ষয়, প্রসাধনী, শিল্পবর্জ্যসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এসব কণা তৈরি হয়। পরে বৃষ্টির পানি, নদী-খাল ও পয়োনিষ্কাশনের মাধ্যমে তা জলাশয়ে পৌঁছায়। মাছ খাবার ও পানির সঙ্গে এসব কণা গ্রহণ করলে সেগুলো তাদের দেহে প্রবেশ করতে পারে। তবে মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেই তা মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, এমন সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছাননি গবেষকরা। বরং মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব কতটা, কোন মাত্রায় তা ক্ষতিকর এবং কীভাবে ঝুঁকি তৈরি করে, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিশ্বজুড়ে গবেষণা চলছে। আড়িয়ল বিলের পাঁচ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের একটি গবেষণায় মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকার অংশজুড়ে বিস্তৃত আড়িয়ল বিলের পাঁচ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মাছগুলো হলো, কই, বাটা, মেনি, গুলশা-টেংরা ও পুঁটি। এর মধ্যে সর্বভুক কই মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে। গবেষণা দলের প্রধান বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান জানান, এসব মাছের মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। মাছের অন্ত্র বা পাকস্থলীতে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা তুলনামূলক স্বাভাবিক। কারণ মাছ খাবার ও পানির সঙ্গে এসব কণা গ্রহণ করতে পারে। মাছের খাদ্যতালিকায় থাকা ছোট মাছ, প্ল্যাঙ্কটন, কাদা-মাটি কিংবা অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমেও প্লাস্টিক কণা শরীরে ঢুকতে পারে। গবেষণাটির জন্য বর্ষা, শীত ও শুষ্ক, তিন মৌসুমে আড়িয়ল বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি পাঁচ প্রজাতির ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় পানি ও তলানি, উভয় ক্ষেত্রেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও তলানিতে এর পরিমাণ তুলনামূলক বেশি ছিল। শীত ও শুষ্ক মৌসুমে অপেক্ষাকৃত বড় আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক কণার উপস্থিতিও পাওয়া যায়। অধ্যাপক শাহজাহানের মতে, মাছের মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মানুষ সাধারণত মাছের নাড়িভুঁড়ি না খেয়ে মাংসপেশিই খায়। শুধু আড়িয়ল বিল নয় মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের চিত্র শুধু আড়িয়ল বিলেই সীমাবদ্ধ নয়। বাকৃবির গবেষক দল এর আগে ব্রহ্মপুত্র, চলনবিল, হাওরাঞ্চল এবং সমুদ্রের মাছ নিয়েও গবেষণা করেছে। এসব গবেষণাতেও বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের মাছ নিয়ে ২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘প্রেভেলেন্স অব মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন কমনলি কনজিউমড ফিশ স্পিসিজ অব দ্য রিভার ওল্ড ব্রহ্মপুত্র, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় পাঁচ প্রজাতির মাছ পরীক্ষা করা হয়। এতে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায় বাইম মাছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, আকার ও ওজনে বড় মাছের অন্ত্রে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক ছিল। ভাটির এলাকার মাছেও এর উপস্থিতি বেশি পাওয়া যায়। চলনবিল ও হাওরাঞ্চলের জলাভূমি নিয়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশীয় ছোট মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়। সেখানে মাইক্রোফাইবার ও বর্ণহীন কণার উপস্থিতি বেশি ছিল। পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন ও পলিস্টাইরিনজাত প্লাস্টিকও শনাক্ত করা হয়। অধ্যাপক শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে বুড়িগঙ্গার দূষিত পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। ওই নদীর মাছেও এসব কণা পাওয়া গেছে। তার মতে, আড়িয়ল বিলের দূষণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিলটির সঙ্গে সংযুক্ত অনেক চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুঁটকিতে বেশি উদ্বেগ উপকূলীয় সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। কুয়াকাটা ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে সংগৃহীত তাজা মাছ ও শুঁটকি নিয়ে বাকৃবির গবেষকদের করা ‘ড্রাইড ফিশ মোর প্রোন টু মাইক্রোপ্লাস্টিকস কনটামিনেশন ওভার ফ্রেশ ফিশ: হায়ার পটেনশিয়াল অব ট্রফিক ট্রান্সফার টু হিউম্যান বডি’ শীর্ষক গবেষণায় শুঁটকিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। শনাক্ত কণার মধ্যে ফাইবারজাত কণার আধিক্য ছিল। অধ্যাপক শাহজাহানের ভাষ্য, সমুদ্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। কারণ স্থলভাগের বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য শেষ পর্যন্ত নদী-নালা হয়ে সমুদ্রে গিয়ে জমা হয়। সেই দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী জলজ প্রাণীর মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলেও মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করতে পারে। ছোট মাছ নাকি বড় মাছ, ঝুঁকি কোথায়? মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রজাতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি বেশি, ছোট না বড় মাছ, এ প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। গবেষকরা বলছেন, ছোট মাছ সাধারণত নাড়িভুঁড়িসহ খাওয়া হয়। ফলে অন্ত্র ও পরিপাকতন্ত্রে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে বড় মাছের ক্ষেত্রে অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি জমার প্রবণতাও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে। অধ্যাপক শাহজাহানের মতে, কোন মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বেশি, তা এককভাবে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। মাছের খাদ্যাভ্যাস, আবাসস্থল, জলাশয়ের দূষণের মাত্রা, মৌসুম এবং মাছের আকারসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর এর উপস্থিতি নির্ভর করতে পারে। মাইক্রোপ্লাস্টিক আসে কোথা থেকে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রধান উৎস দুই ধরনের। কিছু প্লাস্টিক কণা ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষুদ্র আকারে তৈরি করা হয়, যাকে প্রাইমারি মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। ফেসওয়াশ ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার কিছু পণ্যে অতীতে এ ধরনের কণা ব্যবহারের নজির রয়েছে। তবে পরিবেশে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের বড় অংশই আসে বড় প্লাস্টিক পণ্য ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ার মাধ্যমে। প্লাস্টিকের বোতল ও মোড়ক, টেকঅ্যাওয়ে কন্টেইনার, পলিয়েস্টারের পোশাক, টায়ার, রং ও কৃত্রিম ঘাসসহ বিভিন্ন পণ্য থেকে এসব কণা তৈরি হতে পারে। পলিয়েস্টারজাত সিনথেটিক কাপড় ধোয়ার সময়ও ক্ষুদ্র তন্তু পানিতে মিশতে পারে। পরে তা বর্জ্যপানি ও নদীর মাধ্যমে জলাশয়ে গিয়ে জমা হয়। ইউএনইপির তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২০ সালেই প্রায় ২৭ লাখ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে মিশেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানবদেহে কতটা ক্ষতিকর? মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, এমন প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে। খাদ্য, পানীয় পানি ও বাতাসের মাধ্যমে মানুষ এসব কণার সংস্পর্শে আসতে পারে। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অবস্থান ও জীবনযাপনের ধরন অনুযায়ী বছরে অন্তত দশ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারেন। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা, এসব কণা মানবদেহে ঢোকার পর ঠিক কী ধরনের ক্ষতি করে। অধ্যাপক মো. শাহজাহানের মতে, মাছ খাওয়ার মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা মাইক্রোপ্লাস্টিকের একটি অংশ মলমূত্রের সঙ্গে বের হয়ে যেতে পারে। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে ন্যানোপ্লাস্টিক হলে তা রক্তপ্রবাহ ও বিভিন্ন টিস্যুতে পৌঁছাতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ১৯৯০ সালের পর থেকে বিশ্বে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ বৃদ্ধির প্রবণতা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বিভিন্ন অঞ্চলে দূষণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলে উঠে আসে। একই সময়ে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার খবর সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে চীনের এক গবেষণায় জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা রোগীদের হাড় ও কঙ্কাল পেশির নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। এর আগে ইতালির গবেষকেরা হৃদ্রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু রোগীর ক্যারোটিড ধমনিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে আরেক গবেষণায় মানব মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়। ওই গবেষণায় ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে তুলনামূলক বেশি প্লাস্টিক পাওয়ার কথা বলা হলেও, মাইক্রোপ্লাস্টিকই যে ওই রোগের কারণ—এমন সিদ্ধান্ত গবেষণাটি দেয়নি। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষক স্টেফানি রাইটও সতর্ক করেছেন, গরম পানি বা তাপের সংস্পর্শে প্লাস্টিক থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমন বাড়তে পারে। তবে মানুষের জন্য কোন মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক ক্ষতিকর, এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। ফলে বাংলাদেশের নদী-জলাশয়ের মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে পরিবেশদূষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু এটিকে সরাসরি মাছ খাওয়ার বিপজ্জনক প্রমাণ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। বরং গবেষণার বর্তমান ফলাফল বলছে, প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, নদী-জলাশয়ের দূষণ কমানো এবং খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রবেশ নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণাই এখন জরুরি। কারণ মাছের শরীরে যে কণা আজ শনাক্ত হচ্ছে, তার উৎস শেষ পর্যন্ত মানুষেরই তৈরি ও ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যরে সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
