|
ভূরুঙ্গামারীতে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত
মানুষের দুঃখদশা পরিদর্শন করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক
আহম্মেদুল কবির, কুড়িগ্রাম
|
![]() মানুষের দুঃখদশা পরিদর্শন করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক গতকাল ৫ মে শনিবার বিকেলে ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কুদরত-এ-খুদা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাকির হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা বেনজীর রহমান এবং ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমৃত দেবনাথসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গত ৩দিনে কালজানি নদীর ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত নদীগর্ভে গেছে ১শত বসতভিটা, শত শত মানুষ এখনও ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে, কেউবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের কান্নায় আকাশ- বাতাশ ভাড়ী হয়ে উঠেছে। শিলখুরি ইউনিয়নের উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা মোমেনা বেগম কান্না জড়িত কণ্ঠে জেলা প্রশাসককে জানালেন, নিজের থাকার ঘরটা চোখের সামনে নদীতে চলে গেল। এখন কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব—কিছুই জানি না। তার মতো শত শত মানুষ এখনো কালজানি নদীর ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ বসতভিটা হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে, কেউবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, গত ৩দিনে দুই গ্রামের অন্তত ১শতটি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ধলডাঙ্গায় ৭০টি এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া উত্তর ধলডাঙ্গা এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪শত মিটার এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গায় ১ হাজার ৬০ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। নদীর প্রবল স্রোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা বিলীন হচ্ছে। শিলখুরি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইউসুফ হোসেন বলেন, গত এক বছরে কালজানি নদী বাম তীর থেকে গড়ে প্রায় ১শত মিটার ভেতরে ঢুকে পড়েছে। এতে গত এক বছরে প্রায় ১ হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী উত্তর ধলডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় ও এলাকার বউবাজারও নদীভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। ভাঙনের শিকার উত্তর ধলডাঙ্গা গ্রামের তোজাম্মেল হক, ময়েন উদ্দিন, সাহেজ উদ্দিন ও মনির হোসেন এবং দক্ষিণ ধলডাঙ্গার আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুল জলিল, হাফিজুর রহমান ও সুরমান আলীরা জানান, প্রতিদিন নদী তাদের জীবনের নিরাপত্তা কেড়ে নিচ্ছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। ভাঙনকবলিত ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আনসার আলী বলেন, প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন তার বাড়িতে এসে ভিড় করছেন। কেউ সহায়তা চাইছেন, কেউ ভাঙন ঠেকানোর আকুতি জানাচ্ছেন। মানুষের অসহায়ত্ব দেখে তিনিও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। উত্তর ধলডাঙ্গায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আহাজারি দেখে জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। নারী-পুরুষেরা তাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন প্রশাসনের কাছে। ক্ষতিগ্রস্ত আনোয়ারা বেগম ও আকলিমা বেগম বলেন, ‘ভিটেমাটি হারিয়ে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। একপাশে নদী, আরেকপাশে ভারতীয় সীমান্ত। আমরা যাব কোথায়? দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে- বলে দাবি করেন তারা। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘যতটুকু ভাঙন হয়েছে, হয়েছে। এখন আর যাতে কালজানি নদী মানুষের বসতভিটা কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রোববার থেকে ভাঙন প্রতিরোধে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।’ তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ২ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হবে। প্রয়োজনে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, 'রোববার থেকেই কাজ শুরু হবে। প্রথম ধাপে ২ হাজার জিও ব্যাগ ফেলা হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনে আরও ব্যাগ সরবরাহ করা হবে।’ চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। কিন্তু ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো ক্ষতিপূরণ পায় না। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসসহ নদীবিধৌত দেশগুলোতে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হয়। অথচ আমাদের দেশে মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। প্রয়োজনে সংসদে আইন পাস করে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে।’ সীমান্তঘেঁষা ধলডাঙ্গার মানুষ এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাত নামলেই বাড়ে উদ্বেগ। নদীর গর্জন শুনলেই ছুটে যান তীরে। কেউ ঘরের আসবাব সরিয়ে রাখছেন, কেউ আগেভাগেই নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন গবাদিপশু। আতঙ্কে কাটছে কালজানির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরো ধলডাঙ্গা এলাকার মানুষজনের। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
