|
হামে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু কি অবধারিত ছিল?
নতুন সময় প্রতিবেদক
|
![]() হামে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যু কি অবধারিত ছিল? হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে শুরু থেকে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে, প্রাদুর্ভাব কমাতে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। তারপরও কিছুই যেন মানছে না এই সংক্রমণ। বাবা-মা’র কোল খালি করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে সন্তানেরা। কোনোভাবেই যখন মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না, তখন প্রশ্ন এই পাঁচ শতাধিক মৃত্যু কি অবধারিত ছিল? বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা নেওয়ার পর বা প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমণের পর শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। সেই হিসেবে টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে এতদিনে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি তৈরি ধীরগতিতে হচ্ছে বা যথাযথভাবে হচ্ছে না। বিশেষ করে তীব্র অপুষ্টি, ডায়রিয়া, প্রোটিনের ঘাটতি এবং দুর্বল পুষ্টি পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। ফলে তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার পর একসঙ্গে দুটি প্রাণের আলো এসেছিল রুমার জীবনে। এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে চলছিল তার স্বপ্নের সংসার। হঠাৎ করেই হামে মৃত্যু হয় তার একমাত্র কন্যার। একমাত্র ছেলেটিও হামে আক্রান্ত । সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ আকুতিটুকু করছিলেন তিনি। তাই মৃত মেয়েকে রেখেই ছেলেকে ঢাকায় চলে আসেন তিনি। ছেলেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটুকু করছেন তিনি। রুমার মতো এমন ঘটনা ঘটেছে আরও অনেক মায়ের সঙ্গেই। আর এখন যারা ভর্তি আছেন তাদের মধ্যেও আতঙ্ক বিরাজ করছে। কখন যেন তার আদরের সন্তানের অনেকেই জানেন না কী হবে। তবে সবার প্রত্যাশা, তাদের সন্তান সুস্থ হয়েই ফিরবে বাড়ি। হাসপাতালগুলোতে একটা চাপা আর্তনাদ ভর করেছে। একই হাসপাতালে একজন শিশু মারা গেলে আরেক মা আঁতকে ওঠেন। প্রাদুর্ভাবের উৎপত্তি রাজশাহী অঞ্চল রাজশাহী অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় গত জানুয়ারিতেই হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। প্রথমদিকে রাজশাহী ও পার্শ্ববর্তী চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শিশুরা আসতে শুরু করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অজ্ঞাত রোগে ৩৩ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হলে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় সারা দেশে। তবে সেসময় অনেক শিশুর মৃত্যুর কারণ হাম নয় বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। তবে রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, প্রথমে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী শিবগঞ্জ ও গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এই জেলায় হামে শিশুর মৃত্যু হয়েছে বেশি। কোন বিভাগে কত মৃত্যু হাম ও হামের উপসর্গে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এই সময়ের মধ্যে হাম সন্দেহে ১৬৪ এবং নিশ্চিত হামে ৫০ মৃত্যু হয়েছে, অর্থাৎ ২১৪ মৃত্যু হয়েছে এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে। এরপরই আছে রাজশাহী বিভাগ, এখন পর্যন্ত হাম সন্দেহে ৭৯ এবং নিশ্চিত হামে ২ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এছাড়া চট্টগ্রামে হাম সন্দেহে ৪২ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০ জন, বরিশালে হাম সন্দেহে ৩১ এবং নিশ্চিত হামে ১৯ জন, সিলেটে হাম সন্দেহে ৪৯ এবং নিশ্চিত হামে ৩ জন, ময়মনসিংহে হাম সন্দেহে ৩৫ জন এবং নিশ্চিত হামে ২ জন, খুলনায় হাম সন্দেহে ২১ জন এবং রংপুরে হাম সন্দেহে ৫ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হামে মৃত্যুতে শীর্ষে বাংলাদেশ হামে পাঁচ শতাধিক মৃত্যুকে বিশ্বে শীর্ষ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছে ২০২৬ সালে। বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এই বছর বাংলাদেশ হামে মৃত্যুর শীর্ষে। একই সময়কালে হাম ও উপসর্গে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে সুদানে। সেখানে মারা গেছে ৩৭১ জন। ২০২৬ সালে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুতে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে আছে পাকিস্তান। দেশটিতে হামে অন্তত ৭১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের কিছু অঞ্চলে আবার হাম রোগের পুনরুত্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে হামের এ নতুন প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, কাজাখস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সুদান ও ক্যামেরুনসহ বহু দেশে নতুন করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। টিকা না দেওয়ায় হামের প্রাদুর্ভাব দেশে দীর্ঘদিন হামের টিকা ক্যাম্পেইন হয়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালের ডিসেম্বরের দিকে হামের টিকা ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়। চার বছর পর পর এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কোথা থাকলেও দেশে অস্থিরতার কারণে ২০২৪ সালে এবং পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারে গাফেলতিতে টিকা ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়নি বলে মনে করে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেছেন, হাম রুবেলা যে ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন এটা চার বছর পর পর হয়। একটা ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে, ২০২১ সালের জানুয়ারির দিকে। তখন ছিল কোভিডকালীন সময় এবং আমরা যে ডেটাগুলো দেখছি, সেই সময় যে সরকার দায়িত্বে ছিল, তারা ডেটা টেম্পারিংয়ে সাংঘাতিক ওস্তাদ ছিল। বিভিন্ন রকম ডেটা টেম্পারিং তারা করেছে। ওই সময় যে হামের কাভারেজের ডেটা আমি অন্তত এইটুকু বলতে পারি, এটা সঠিক না। তখন হামের কাভারেজ যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, সেটা হয়নি। ইনকমপ্লিট কাভারেজের চার বছর পরে যে আরেকটা টিকা রাউন্ড সেটা হওয়ার কথা ছিল ২০২৪-২৫ সালে। বিভিন্ন কারণে সরকারের দুর্বলতা, তাদের অদক্ষতার কারণে সেই টিকার ক্যাম্পেইন একেবারেই হয়নি। এ কারণে আজ আমরা এই ডিজাস্টারের মধ্যে জাতিগতভাবে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, প্রত্যেক বছর দুইবার ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন করার কথা। গত বছরের প্রথমার্ধে একটা ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন হয়েছিল। তারপরে কোনো ক্যাম্পেইন হয় নাই এবং ভিটামিন এ নাই। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় হামের টিকার কোনো মজুত ছিল না। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের পর দেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি না হওয়া এবং টিকার তীব্র ঘাটতি বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ বলেও জানান তিনি। লক্ষ্যমাত্রার অতিরিক্ত টিকা দিয়েছে সরকার হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির পর সরকার জরুরি ভিত্তিতে টিকা কিনে হামের টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে। ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার কথা থাকলেও গত ৫ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত ১ কোটি ৮২ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ জনকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। যারা বাদ পড়েছে তাদেরকে প্রচারণার মাধ্যমে টিকা নিতে আসতে অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলেন, টিকা ব্যবস্থাপনায় কোনো ভুল বা অব্যবস্থাপনা হয়ে থাকলে তা তদন্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে সংকট কাটার পর কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দোষী ব্যক্তি নির্ধারণের চেয়ে এই মুহূর্তে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাকেই সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে । শিশুদের পুষ্টিতে জোর হামে এতো শিশুর মৃত্যুতে পুষ্টিহীনতা একটা কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য ভিটামিন এ খাওয়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হামে আক্রান্ত শিশুদের মায়েরা বেশিরভাগ পুষ্টিহীনতায় ভুগছেন এবং পুষ্টির ঘাটতি হামে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। স্বাস্থ্য মন্ত্রী জানান, এ কারণে শিশুরা হামের সঙ্গে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্তদের সঠিকভাবে আইসোলেশন করতে না পারায় এর মাত্রা বেড়েছে। নানা সমস্যার কারণে হাম এবার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জর্জরিত করেছে। ২০২০ সালের পর দেশে হামের কোনো টিকা দেয়া হয়নি উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এ বছরই সরকার দায়িত্ব নিয়ে শিশুদের টিকার আওতায় নিয়ে আসছে। চলমান হাম প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এ সপ্তাহের মধ্যে ইউনিসেফ থেকে এক কোটি ভিটামিন এ ক্যাপসুল পাবে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, পুষ্টির ব্যাপারে দায়িত্ববোধ বাড়ালেই হামসহ সকল ব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। হটস্পট ৩০ জেলায় সংক্রমণ কমছে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের আওতায় ৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার পর সংক্রমণ প্রবণ এলাকাগুলোতে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় ক্যাম্পেইন চালানো হয়েছে, সেখানে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, শিশুকে টিকা দেয়ার পর তার শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সময় লাগে এক মাস। এ মধ্যবর্তী সময়ে অর্থাৎ চার-পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিদিন ১১০০-১২০০ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এমনটিই অন্তত দেখা যাচ্ছে। তবে টিকাদান কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর হামে আক্রান্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করবে। আগামী ২০ জুন পর্যন্ত আমরা তার হার দেখতে পাব। এর পরবর্তী সময়ে আমরা হাম নিয়ন্ত্রণের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবো- এমন সম্ভাবনা আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ জানান, হামে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ অপুষ্টি। যেসব শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে, তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় হামের জটিলতা দ্রুত বাড়ছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
