|
ডিসি জাহিদের উদ্যোগে প্রথা ভেঙে দাম কমানোর ঘোষণা ব্যবসায়ীদের
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() ডিসি জাহিদের উদ্যোগে প্রথা ভেঙে দাম কমানোর ঘোষণা ব্যবসায়ীদের চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মূল্যহ্রাস করে ‘ফেস্টিভ সেল’ চালুর লক্ষ্যে সোমবার (১৮ মে) সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে এক ব্যতিক্রমী প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক নিজেই। প্রেস কনফারেন্সে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, সুপারশপ প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসক বলেন, “আপনারা জানেন, প্রতিবছরই উৎসবকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে একটি সংস্কৃতি চালু রয়েছে—উৎসব এলেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। অথচ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উৎসব মানেই ছাড়, মূল্যহ্রাস ও মানুষের জন্য বাড়তি সুযোগ। কিন্তু আমরা চলি উল্টো পথে।” তিনি বলেন, “উৎসব কখনো একা করা যায় না। উৎসব মানে সবাইকে নিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করা। সমাজের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত, ধনী—সবাই মিলে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করবে, সেটাই হওয়া উচিত।” জাহিদুল ইসলাম মিঞা অভিযোগ করে বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী উৎসবকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করেন। “আমি তাদের ব্যবসায়ী বলি না, রাষ্ট্রের শত্রু বলি,” বলেন তিনি। তবে তিনি জানান, অধিকাংশ ব্যবসায়ীই এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে খাতুনগঞ্জ, রেয়াজউদ্দিন বাজার, টেরিবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী ও চট্টগ্রামের বড় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো উদ্যোগটির পাশে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বপ্ন, আগোরা, দ্যা বাস্কেট, খুলশী মার্ট, শপিং ব্যাগসহ বিভিন্ন সুপারশপের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। ফলাফলও মিলেছে দ্রুত। জেলা প্রশাসক জানান, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, আটা, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ২ থেকে ৫ শতাংশ ছাড় এবং কিছু পণ্যে ৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য কমানোর ঘোষণা এসেছে। এ সময় তিনি নতুন একটি স্লোগানও ঘোষণা করেন— “উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ।” তবে এই প্রেস কনফারেন্স কোনো একদিনের আয়োজন নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি ও ছয় মাসেরও বেশি সময়ের প্রচেষ্টা। জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে আসছিলেন। এরই অংশ হিসেবে সোমবার সকালে বৃষ্টিভেজা আবহাওয়া ও যানজট উপেক্ষা করে তিনি খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজারে যান। ট্রাকের ভিড়ে আটকে থাকা সড়ক পায়ে হেঁটে পার হয়ে অংশ নেন খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মতবিনিময় সভায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও জেলা প্রশাসকের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তারা জানান, মানুষের স্বস্তির জন্য পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে ব্যবসায়ীরাও কাজ করবেন। এদিকে ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা যথাসময়ে পরিশোধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। বিজিএমইএর চট্টগ্রাম পরিচালক এনামুল আজিজ চৌধুরী বলেন, “শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মানবিক ও নৈতিক দায়িত্বও বটে। বিজিএমইএ সবসময় শ্রমিকবান্ধব শিল্প পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” তিনি জানান, সদস্যভুক্ত কারখানাগুলোকে ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিজিএমইএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রামের প্রায় ৩৪০টি কারখানার মধ্যে ৩০২টি ইতোমধ্যে এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও রেয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আলহাজ মো. ছালামত আলী জানান, আগামী ২২, ২৩ ও ২৪ মে নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা পণ্যে বিশেষ মূল্যছাড় দেওয়া হবে। খুচরা পর্যায়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা পর্যায়ে পণ্য যাওয়ার পরও যেন নির্ধারিত মূল্য কার্যকর থাকে, সে জন্য বাজার কমিটি ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কঠোরতা দেখানো নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদযাপন করতে পারবে।” চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য নতুন এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে অন্তত এবার ঈদের আগে একটি নতুন বার্তা স্পষ্ট—উৎসব শুধু মুনাফার নয়, উৎসব মানুষেরও। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক, সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মো. হাসান ইকবাল চৌধুরী, শিল্পাঞ্চল-৩-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইদুর রহমান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, এনএসআই ও ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিরা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর চট্টগ্রাম পরিচালক এনামুল আজিজ চৌধুরী, বিকেএমইএর পরিচালক আব্দুল বারেক, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য এস এম সেলিম, প্রাণ ট্রেডিং লিমিটেডের অপারেশন ম্যানেজার আশিক উল্লাহ চৌধুরী, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও রেয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আলহাজ মো. ছালামত আলী,টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান, এবং ইপসার হেড অব অ্যাডভোকেসি মো. আলী শাহীন।
|
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
