ই-পেপার সোমবার ● ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ● ৫ অক্টোবর ২০২৬ ● ২০ আশ্বিন ১৪৩৩
যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পিছু হটল চীনের ‘বাণিজ্যিক সুপারঅস্ত্র’?
নতুন সময় প্রতিবেদক
প্রকাশ: Monday, 5 October, 2026, 9:31 PM

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পিছু হটল চীনের ‘বাণিজ্যিক সুপারঅস্ত্র’?

যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পিছু হটল চীনের ‘বাণিজ্যিক সুপারঅস্ত্র’?

চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছিল, চীন এমন এক ‘বাণিজ্যিক সুপারঅস্ত্র’ তৈরি করছে, যা বিশ্বজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ওপর বেইজিংকে নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যভাণ্ডার এনে দিতে পারে। সেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নাম লগইঙ্ক (LOGINK)।

চীনের রাষ্ট্রসমর্থিত এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বন্দর, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য এক জায়গায় এনে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা। কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে লগইঙ্কের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন, জাহাজ চলাচল ও লজিস্টিকস-সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত আদান-প্রদান করার পরিকল্পনা ছিল।

কিন্তু সেই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প এখন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লগইঙ্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব থমকে গেছে, আন্তর্জাতিক একটি সামুদ্রিক তথ্যসংগঠন থেকে এটি বাদ পড়েছে এবং চীনের ভেতরেই বকেয়া বিল ও অন্যান্য আর্থিক দায় নিয়ে একের পর এক মামলায় জড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের ২০ জনের বেশি নৌপরিবহন খাতের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকার এবং আদালতের নথি পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অফিস যেন পরিত্যক্ত
সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের এক প্রতিবেদক চীনের উপকূলীয় শহর ওয়েনঝৌতে লগইঙ্কের কার্যক্রম পরিচালনাকেন্দ্রে গিয়ে দেখেন, সেখানে কার্যত কোনও কার্যক্রম নেই।

অফিসের আলো বন্ধ, অভ্যর্থনা ডেস্ক ফাঁকা এবং কম্পিউটারের তারও খুলে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কেউ অফিসটি ব্যবহার করছে না- এমনই চিত্র দেখা যায় সেখানে।

লগইঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন ও ই-মেইল করা হলেও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।

তবে গত জুনে চীনা পরিবহন মন্ত্রণালয় একটি নীতিপত্র প্রকাশ করে। সেখানে লগইঙ্ক-কে আরও বেশি অভ্যন্তরীণ তথ্যের উৎসের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়।

অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম সংকুচিত হলেও চীনের অভ্যন্তরে এর তথ্যভিত্তি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা এখনও রয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল লগইঙ্ক?
বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ, বন্দর ও পণ্য পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য নিয়ন্ত্রণকে বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এই খাতের অবকাঠামো ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিযোগিতা চলছে। লগইঙ্ক ছিল সেই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা ছিল, লগইঙ্কের মাধ্যমে চীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চলাচলকারী পণ্যের ধরন, পরিমাণ, মূল্য এবং পরিবহনপথ সম্পর্কে এমন সব বাণিজ্যিক তথ্য পেতে পারে, যা সাধারণভাবে জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না।

এসব তথ্য চীনা কোম্পানিগুলোকে পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছিল ওয়াশিংটন।

আরও বড় উদ্বেগ ছিল সামরিক পণ্য পরিবহন নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেছিলেন, বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ইউক্রেন ও তাইওয়ানে পাঠানো মার্কিন অস্ত্রসহ সংবেদনশীল সামরিক চালানও নজরদারিতে আনা সম্ভব হতে পারে।

তবে লগইঙ্ক ঠিক কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করত এবং তার পরিমাণ কত ছিল, তা কখনও প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানায়নি।

২০২৪ সালে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতরে দেওয়া এক নথিতে লগইঙ্কের কর্মকর্তা লি ঝাও দাবি করেন, বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনের ওপর ধারাবাহিক নজরদারি চালানো কিংবা সংবেদনশীল বাণিজ্যিক তথ্য সংগ্রহ করার মতো সক্ষমতা লগইঙ্কের নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
ওয়াশিংটনের চাপ লগইঙ্কের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মনে করছেন।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কংগ্রেসীয় কমিশন লগইঙ্ক নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে প্ল্যাটফর্মটির আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

ওই প্রতিবেদনের পর মার্কিন আইনপ্রণেতারা লগইঙ্কের বিরুদ্ধে আরও সরব হন। কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে লগইঙ্কের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাদের মধ্যে ছিলেন মার্কো রুবিও, যিনি বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাদের আশঙ্কা ছিল, লগইঙ্কের অবাধ সম্প্রসারণ হলে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ‘ধমনী’গুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

২০২৩ সালের শেষ দিকে তৎকালীন মার্কিন কংগ্রেস সদস্য মিশেল স্টিল আন্তর্জাতিক বন্দর তথ্যব্যবস্থা সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেমস অ্যাসেসিয়োশন (আইপিসিএসএ)-কে লগইঙ্কের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানান।

এ সময় মার্কিন কংগ্রেস এমন একটি আইনও পাস করে, যার আওতায় পেন্টাগনকে লগইঙ্ক-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা থেকে বিরত রাখা হয়। একই সঙ্গে মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোকে লগইঙ্ক ব্যবহার থেকে নিরুৎসাহিত করার জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

‘বাণিজ্য সমাধান’ থেকে নিরাপত্তাঝুঁকি
লগইঙ্কের (LOGINK) পূর্ণ নাম ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন অ্যান্ড লজিস্টিক পাবলিক ইনফরমেশন প্লাটফর্ম। প্রায় দুই দশক আগে চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের স্থানীয় সরকার পণ্য পরিবহনের সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এটি চালু করে।

বন্দর, ট্রাক ও বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য একটি প্ল্যাটফর্মে এনে সহজে অনুসন্ধানযোগ্য করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

পরবর্তী সময়ে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকেরা প্রকল্পটির গুরুত্ব উপলব্ধি করেন এবং লগইঙ্কের নিয়ন্ত্রণ চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নেওয়া হয়।

২০১০ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের সঙ্গে পণ্য পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের চুক্তি করে চীন। এর মাধ্যমে লগইঙ্ক ওই দুই দেশের জাতীয় লজিস্টিকস তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়।

কয়েক বছর পর হংকংভিত্তিক একটি লজিস্টিকস প্ল্যাটফর্মের সঙ্গেও চুক্তি করে লগইঙ্ক। চীনা প্রতিষ্ঠানটি তখন দাবি করেছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে তারা বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি জাহাজ ট্র্যাকিং তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।

২০১৫ সালে জাতিসংঘের একটি কমিশনে চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক উপস্থাপনায় লগইঙ্ক-কে এমন একটি ‘ওয়ান-স্টপ’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, যা বিশ্বের বিভিন্ন লজিস্টিকস তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও ভাটা
আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি ছিল জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে লগইঙ্কের তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা। তবে সেটিও এখন কার্যত থেমে গেছে।

দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লগইঙ্কের মাধ্যমে যে তথ্য বিনিময় করা হতো, তার পরিধি যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলের আশঙ্কার তুলনায় অনেক সীমিত ছিল।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মূলত জাহাজ কখন বন্দরে আসছে ও ছাড়ছে এবং পণ্য ওঠানো-নামানোর তথ্যই বিনিময় করা হতো। পণ্যের ভেতরের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হতো না।

তারপরও ২০২৪ সালে চীন হঠাৎ একটি নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে। কারণ হিসেবে ‘অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির’ কথা বলা হয়েছিল। এরপর তিন দেশের মধ্যে আর কোনও বৈঠক হয়নি।

জাপানের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, একপর্যায়ে টোকিও লগইঙ্কের তথ্য পাওয়ার সুযোগও হারায়। এক বছরেরও বেশি সময় আগে সেই প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যায় এবং এরপর চীনা অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।

আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকেও বাদ
লগইঙ্ক ২০২২ সালে আইপিসিএসএ-এর একটি আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। এর মাধ্যমে বিভিন্ন বন্দরের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে পণ্য ও কাস্টমস-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা ছিল।

মার্কিন কমিশনের প্রতিবেদনে তখন বলা হয়েছিল, এই প্রকল্পে লগইঙ্কের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক বন্দরের সঙ্গে চীনা প্ল্যাটফর্মটির সহযোগিতা প্রায় দ্বিগুণ করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগও স্থায়ী হয়নি।

সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির মতে, সদস্যপদ ফি পরিশোধ বন্ধ করে দেওয়ার পর ২০২৪ সালে লগইঙ্কের আইপিসিএসএ সদস্যপদ শেষ হয়ে যায়।

আইপিসিএসএ-এর মহাব্যবস্থাপক ইঙ্গা মর্টনও নিশ্চিত করেছেন, লগইঙ্ক এখন আর সংগঠনটির সদস্য নয়। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ের ওই প্রকল্প বর্তমানে স্থগিত এবং নিষ্ক্রিয়।

এর কাছাকাছি সময়েই লগইঙ্কের ওয়েবসাইটও অকার্যকর হয়ে যায়। ওয়েব আর্কাইভে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য ২০২৪ সালের জুনের।

ইউরোপেও ব্যর্থ সম্প্রসারণ
ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরগুলোতেও লগইঙ্কের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

পর্তুগালের সবচেয়ে বড় বন্দর সিনেসের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২০১৭ সালে লগইঙ্ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। লক্ষ্য ছিল দুই পক্ষের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সম্ভাবনা যাচাই করা।

কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র আনা রিতা রোসা রয়টার্সকে জানান, সেই সমঝোতা থেকে উল্লেখযোগ্য কোনও ফল পাওয়া যায়নি।

ইউরোপের সবচেয়ে বড় বন্দর রটারডামের ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পোর্টবেসও ২০১৯ সালে লগইঙ্কের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও প্রাথমিক আলোচনার পর্যায় পেরোয়নি।

বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি জানান, ২০২২ সালের শুরুতে ডাচ সরকারের পক্ষ থেকে সম্পর্কটি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর পোর্টবেস চীনা প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে আর সহযোগিতার পথে এগোয়নি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপই এসব সিদ্ধান্তের কারণ ছিল কি না, সে বিষয়ে পোর্টবেস, সিনেস বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনও মন্তব্য করেনি।

চীনের ভেতরেই আইনি ও আর্থিক সংকট
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি চীনের ভেতরেও লগইঙ্ক আইনি ও আর্থিক সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছে।

কোম্পানির তথ্যভান্ডার কিচাচার নথি অনুযায়ী, ওয়েনঝৌতে লগইঙ্কের কার্যক্রম পরিচালনাকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ৩৯টি আদালতি দাবি বা মামলা হয়েছে। এসব দাবির মোট আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ ডলার।

মামলাগুলোর কিছু শ্রমসংক্রান্ত বিরোধ, আবার কিছু বকেয়া ইউটিলিটি বিলের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে নথিতে দেখা গেছে।

মামলাকারীদের মধ্যে রয়েছে চায়না মোবাইলের একটি স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তারা ‘সেবা প্রদানের চুক্তি নিয়ে বিরোধের’ অভিযোগে লগইঙ্কের বিরুদ্ধে মামলা করে।

পরবর্তীতে আদালত লগইঙ্ক-কে চায়না মোবাইলকে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়। তবে সেই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা আদালতের নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

লগইঙ্ক যে ভবনটিতে কাজ করত, সেটি নিয়েও বিরোধ দেখা দিয়েছে। নথি অনুযায়ী, ওই শিল্পপার্ক পরিচালনাকারী রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান লগইঙ্কের বিরুদ্ধে সম্পত্তির ইজারা নিয়ে মামলা করেছে। মে মাসে এ বিষয়ে আদালতে শুনানিও হয়েছে।

‘সুপারঅস্ত্র’ এখন কোথায়?
লগইঙ্কের আন্তর্জাতিক পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে এর পিছু হটার সময়টি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের সঙ্গে মিলে যায়।

ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে মিত্র দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লগইঙ্ক থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মনে করেন, বেইজিং নিয়ন্ত্রিত কোনও প্ল্যাটফর্মকে বৈশ্বিক সামুদ্রিক তথ্যের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র’ তৈরি করতে দেওয়া যাবে না।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব সরকারি ব্যবস্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোয় লগইঙ্কের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে এবং মিত্র ও শিল্পখাতের অংশীদারদেরও বিষয়টিকে একই গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।

২০২২ সালে লগইঙ্ক নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসীয় কমিশনের প্রতিবেদন তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যান্ডাল শ্রাইভার মনে করেন, লগইঙ্কের পতনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নাম প্রকাশ করে সতর্ক করার’ কৌশল ভূমিকা রেখেছে।

তবে চীনের জন্য এটি কেবল একটি প্রযুক্তি প্রকল্পের ব্যর্থতা নয়। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের অবকাঠামো ও তথ্যব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের যে বৃহত্তর কৌশল বেইজিং গ্রহণ করেছিল, লগইঙ্ক ছিল তারই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

আজ সেই প্ল্যাটফর্মের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বগুলো থমকে গেছে, ওয়েবসাইট অন্ধকার, সদস্যপদ হারিয়েছে এবং চীনের ভেতরে একের পর এক মামলায় জর্জরিত। অথচ ওয়েনঝৌর সেই পরিত্যক্ত অফিসের দেয়ালে এখনও ঝুলছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একটি স্লোগান- ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রত্যয়।

লগইঙ্কের বর্তমান দশা তাই প্রশ্ন তুলছে- বৈশ্বিক বাণিজ্যের তথ্যনিয়ন্ত্রণে চীনের উচ্চাভিলাষ কি সাময়িকভাবে থেমে গেছে, নাকি এটি কেবল কৌশল বদলে নতুন পথে এগোনোর প্রস্তুতি? 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status