ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
সোমবার ১৮ মে ২০২৬ ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বিশ্বের সব জায়গায় একসাথে কমছে কেন জন্মহার; দায় কি স্মার্টফোনের?
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Monday, 18 May, 2026, 1:43 PM

বিশ্বের সব জায়গায় একসাথে কমছে কেন জন্মহার; দায় কি স্মার্টফোনের?

বিশ্বের সব জায়গায় একসাথে কমছে কেন জন্মহার; দায় কি স্মার্টফোনের?

ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যাবিদ আনা রটকির্চ উল্লেখ করেন, যেসব তরুণ দম্পতি সবচেয়ে বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে যৌন সমস্যাও বেশি দেখা যায়।

জনসংখ্যাগত যে ধস আমাদের সময়কে সংজ্ঞায়িত করছে, তা আরও দ্রুতগতিতে এবং আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশে প্রতিটি নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার দুই দশমিক এক-এর "প্রতিস্থাপন হার"-এর নিচে নেমে গেছে। এ হারটি মূলত একটি দেশের অভিবাসী বা বহিরাগতদের আগমন ছাড়া জনসংখ্যাকে স্থিতিশীল রাখতে চেষ্টা করে। ৬৬টি দেশে এই গড় হার এখন দুই থেকে নেমে একের কাছাকাছি। কিছু দেশে, নারী প্রতি সন্তান জন্মদানের সবচেয়ে সাধারণ সংখ্যাটি হলো শূন্য।

এই পতনের গতি এবং বিস্তৃতি—উভয়ই সব ধরনের প্রত্যাশাকে ভুল প্রমাণ করছে। মাত্র পাঁচ বছর আগে জাতিসংঘ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় তিন লাখ ৫০ হাজার শিশুর জন্ম হবে। কিন্তু সেটি ছিল ৫০ শতাংশেরও বেশি অনুমান কারণ প্রকৃত সংখ্যা ছিল মাত্র দুই লাখ ৩০ হাজার।

উচ্চ ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে জনসংখ্যা হ্রাসের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করলেও গত ১০ বছরে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে।

জনসংখ্যার রেকর্ড থেকে শুরু করে গুগল অনুসন্ধান পর্যন্ত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, জন্মহার কমার পেছনে অনেক কারণ থাকলেও সাম্প্রতিকতম এই তীব্র পতন আমাদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সাথে সম্পর্কিত বলে মনে হচ্ছে।

এখন বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলই এর প্রভাবে আক্রান্ত। কিছুদিন আগেও অতি-নিম্ন এবং দ্রুত হ্রাসমান জন্মহার প্রধানত ধনী দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল, কিন্তু অনেক উন্নয়নশীল দেশের প্রজনন হার এখন অনেক বেশি সচ্ছল দেশগুলোর তুলনায় কম।

২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো মেক্সিকোর জন্মহার যুক্তরাষ্ট্রের নিচে নেমে গেছে—পরবর্তীতে ব্রাজিল, তিউনিসিয়া, ইরান এবং শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো এখন ধনী হওয়ার আগেই বুড়িয়ে যাচ্ছে।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা
জনসংখ্যার বার্ধক্য কর্মশক্তিকে সংকুচিত করে এবং উৎপাদনশীলতা ও জীবনমানের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে—১৯৯০-এর দশক থেকে জাপানের স্থবিরতা প্রায় পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় কম জন্মহারের মাধ্যমে, যা তাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে ছোট করেছে।

পেনশন ও সেবাখাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ে এবং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কমে যায়। এর ফলে সমাজে অবক্ষয়ের অনুভূতি তৈরি হয়, যা প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাবিরোধী রাজনীতিকে উসকে দেয়।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে শীর্ষ গবেষকদের একজন জেসুস ফার্নান্দেজ-ভিয়াভের্দে বলেন, 'জন্মহার হ্রাস আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।' তার মতে, প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার উৎসই জন্মহারের পতন। তিনি বলেন, 'অন্য সবকিছুই এর পরিণতি।'

ইলন মাস্কের মতো কেউ না হলেও—যিনি মনে করেন কমে যাওয়া জন্মহার 'সভ্যতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি'—এটি বোঝা কঠিন নয় যে, এই প্রবণতা ইতোমধ্যেই বিশ্বের বহু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

কেউ কেউ আশা করেন, কম জনসংখ্যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মহার কমলেও আগামী কয়েক দশকে কার্বন নিঃসরণে এর প্রভাব খুবই নগণ্য হবে।

অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ সন্তান নিতে না চাওয়ার কারণে নয়, বরং চাইলেও সন্তান নিতে না পারার কারণে জন্মহার কমছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশেও অধিকাংশ তরুণ-তরুণী এখনও প্রায় দুইটি সন্তান চাওয়ার কথা বলে—যেখানে এখন বেশিরভাগ নারীর সন্তানসংখ্যা শূন্য।

অর্থাৎ, লক্ষ্য ও বাস্তবতার মধ্যে একটি 'প্রজনন ব্যবধান' তৈরি হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে আধুনিক জীবনের নানা বাধা ও হতাশা—যার মধ্যে আমাদের বাসস্থান এবং ক্রমশ আমাদের মোবাইল ফোনও রয়েছে।

চিরস্থায়ী একাকী জীবন
আগের দশকগুলোতে বিশ্বের জন্মহার কমেছিল কারণ দম্পতিরা কম সন্তান নিচ্ছিল। এখন প্রধান কারণ হলো—দম্পতির সংখ্যাই কমে যাচ্ছে।

গত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বিয়ে ও একসঙ্গে বসবাসের হার যদি অপরিবর্তিত থাকত, তাহলে আজ দেশটির মোট জন্মহার ১০ বছর আগের তুলনায় বেশি হতো।

জনসংখ্যাবিদ স্টিফেন শ'র একটি অগ্রগামী গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশে মায়েরা গড়ে যত সন্তান জন্ম দিচ্ছেন তা স্থিতিশীল আছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাড়ছেও। কিন্তু যে নারীরা কোনো সন্তানই নিচ্ছেন না—তাদের হার গত ১৫ বছরে দ্রুত বেড়েছে।

এই প্রবণতার সঙ্গে সাধারণত যে ধারণাগুলো জড়িত, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—নারীরা সন্তানের আগে কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন, অথবা অনেক অর্থ থাকা সত্ত্বেও দম্পতিরা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।


কিন্তু বহু দেশে দেখা যাচ্ছে, কম শিক্ষিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যেই জন্মহার ও সম্পর্ক গঠনের হার সবচেয়ে দ্রুত কমছে। বিপরীতে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিতদের মধ্যে সম্পর্ক গঠন ও সন্তান নেওয়ার হার কিছু ক্ষেত্রে স্থিতিশীল বা বাড়তির দিকে। মনে হচ্ছে পরিবার গঠন এখন 'কে-আকৃতির' বিভাজনে পরিণত হয়েছে।

ধনী দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও এই প্রবণতা ঠেকাতে পারেনি। ১৯৮০-এর দশক থেকে উন্নত দেশগুলো শিশু ভাতা, ভর্তুকিযুক্ত শিশুসেবা এবং মাতৃত্ব-পিতৃত্বকালীন ছুটিতে মাথাপিছু ব্যয় তিনগুণ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাবাদের অংশগ্রহণও বেড়েছে। তবুও জন্মহার প্রতি নারী ১.৮৫ থেকে কমে ১.৫৩-এ নেমেছে।

অনেকেই স্বেচ্ছায় নিঃসন্তান একাকী জীবন বেছে নেন। কিন্তু সামগ্রিক তথ্য বলছে, সমাজে অংশীদার খুঁজে পাওয়া ও সন্তান নেওয়ার হার কমছে—যদিও মানুষ তা চায়। এটি বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায় এবং এর সঙ্গে বাড়ছে একাকীত্ব ও সম্পর্কসংক্রান্ত হতাশা।

বাসস্থান ও অর্থনীতি
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি ধনী দেশে পরিবার গঠনের বড় বাধাগুলোর একটি হলো আবাসন সমস্যা।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশক থেকে এই দেশগুলোর প্রজনন হার হ্রাসের অর্ধেক কারণই আবাসন মালিকানা কমে যাওয়া এবং মা-বাবার সাথে বসবাসকারী তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের অভাব অন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির পথেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু সাম্প্রতিক দ্রুত পতন বা এর বৈশ্বিক বিস্তার কেবল এটুকু দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।                    
উদাহরণস্বরূপ, উত্তর ইউরোপীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মা-বাবা বা ফ্ল্যাটমেটদের সাথে থাকার পরিবর্তে একা থাকা তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও প্রজনন হার হ্রাস পেয়েছে।

এমনকি যখন দম্পতিরা তাদের নিজস্ব জায়গায় যাওয়ার সামর্থ্য রাখে, তখনও তাদের আলাদা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। বেশ কয়েকটি দেশে, একসাথে থাকা শুরু করা মানুষেরা এখন সন্তান নেওয়ার চেয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার দিকে বেশি ঝুঁকছে, যা ঐতিহাসিক নিয়মের একটি তীব্র বিপরীত রূপ।

অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণগুলোও চূড়ান্ত প্রমাণ হতে ব্যর্থ হচ্ছে।

সাম্প্রতিক জনসংখ্যার পতন ঘটেছে এমন দেশেও, যেগুলো বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আবার এমন দেশেও যেগুলো প্রায় অক্ষত ছিল। একইভাবে এটি ধীরগতির পশ্চিম ইউরোপ এবং দ্রুতবর্ধনশীল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া—উভয় অঞ্চলেই দেখা গেছে।

অনেকে তরুণদের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা বলেন। কিন্তু যদিও তরুণদের আয় আগের প্রজন্মের তুলনায় পরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে, তবুও এগুলো ধীরে ধীরে ঘটেছে—যা হঠাৎ জন্মহার পতনের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হলো তরুণ নারী-পুরুষের পরিবর্তিত অবস্থান। এখন মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে এবং কম শিক্ষিত তরুণ পুরুষেরা প্রায়ই নারী সঙ্গীদের তুলনায় কম আয় করছে। এতে সম্পর্ক গড়ার হিসাব বদলে যাচ্ছে। কিন্তু এটিও ধীরে ধীরে ঘটেছে এবং সব অঞ্চলে সমানভাবে প্রযোজ্য নয়।

আপনার পকেটে থাকা ডিভাইস জনসংখ্যার জন্য হুমকি
শুধু অর্থনৈতিক ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন গবেষকেরা। তারা এখন নতুন এক অপরাধীর দিকে আঙুল তুলতে শুরু করেছেন—ডিজিটাল যন্ত্র ও প্ল্যাটফর্ম, যা বিশ্বের তরুণদের জীবনে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছে।

সিনসিনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাথান হাডসন ও হার্নান মস্কোসো-বোয়েদো গত মাসে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে জন্মহারকে চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক বিস্তারের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

যেসব এলাকায় দ্রুতগতির মোবাইল সংযোগ আগে পৌঁছেছে, সেসব এলাকাতেই জন্মহার আগে এবং দ্রুত কমেছে। গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন তরুণদের পারস্পরিক সময় কাটানোর ধরন বদলে দিয়েছে, সামনাসামনি মেলামেশা কমিয়ে দিয়েছে এবং এর ফলে জন্মহার ভেঙে পড়েছে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের গবেষণায় দেখা গেছে, একই প্রবণতা অন্যান্য দেশেও রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ায় কিশোর ও তরুণদের জন্মহার ২০০০-এর দশকের শুরুতে মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল, কিন্তু ২০০৭ সালের পর থেকে দ্রুত কমতে শুরু করে।

ফ্রান্স ও পোল্যান্ডে একই প্রবণতা শুরু হয় প্রায় ২০০৯ সালে, আর মেক্সিকো, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২০১২ সালে। ঘানা, নাইজেরিয়া ও সেনেগালে জন্মহারের যে ধীর পতন ছিল, তা ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে।

এই প্রতিটি পরিবর্তনের সময় স্থানীয় বাজারে স্মার্টফোনের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল—যা মোবাইল অ্যাপ নিয়ে গুগল অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়েছে।

দেশের পর দেশ স্মার্টফোন চালুর পর জন্মহার কমে গেছে—আগের প্রবণতা যেমনই হোক না কেন। বয়স যত কম, পতন তত বেশি যা স্মার্টফোন ব্যবহারের ধাঁচের প্রতিচ্ছবি।

নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মেলিসা কিয়ার্নি বলেন, 'এটি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য যে আধুনিক ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যা রোমান্টিক সম্পর্ক গঠনের হার কমিয়ে দিয়েছে।'

হাডসন ও মস্কোসো-বোয়েদোর এই ধারণা—যে মুখোমুখি সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়াই মূল কারণ—তা বহু দেশের তথ্য দ্বারা সমর্থিত। দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের সামনাসামনি সামাজিক মেলামেশা ২০ বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ছবি: রয়টার্স

জনসংখ্যাবিদ লাইম্যান স্টোন বলেন, 'যে মানুষকে আপনি বিয়ে করবেন তাকে খুঁজে পেতে অনেক মানুষের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যদি আপনি অনেক কম সামাজিক যোগাযোগ করেন, তাহলে উপযুক্ত মানুষ খুঁজে পেতে অনেক বেশি সময় লাগে—অথবা আদৌ পাওয়া যায় না।'

তিনি আরও বলেন, 'আপনি যদি বাস্তব জীবনে সমবয়সীদের সঙ্গে বেশি সময় কাটান, তাহলে সম্ভাব্য সঙ্গী সম্পর্কে আপনার প্রত্যাশা বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি আপনি সময় কাটান সামাজিক মাধ্যমে, তাহলে আপনার মানদণ্ড এক কৃত্রিম স্বাভাবিকতার ধারণার ওপর দাঁড়ায়।'

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
ফিনল্যান্ডের জনসংখ্যাবিদ আনা রটকির্চ উল্লেখ করেন, যেসব তরুণ দম্পতি সবচেয়ে বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে যৌন সমস্যাও বেশি দেখা যায়।

তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয়—এবং এসব মাধ্যমে তুলে ধরা জীবনধারা ও মূল্যবোধ—তরুণদের স্থায়ী সম্পর্ক গঠনের পথ কঠিন করে তুলেছে।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালিস ইভান্স বলেন, কোনো সংস্কৃতিতে নারী-পুরুষের ভূমিকা যত বেশি ঐতিহ্যনির্ভর, স্মার্টফোনের প্রভাব সেখানে জন্মহারের ওপর তত বেশি।

তথ্যও সেটিই দেখায়। মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকায় গত দশকে জন্মহার সবচেয়ে বেশি কমেছে। আবার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কম জন্মহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। দক্ষিণ এশিয়ায়, যেখানে নারীদের ইন্টারনেট ব্যবহার তুলনামূলক সীমিত, সেখানে কম মানুষ অবিবাহিত থাকেন।

ইভান্স 'সাংস্কৃতিক লাফিয়ে অগ্রগতি'র কথা উল্লেখ করে বলেন, 'ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক বিশ্বের তরুণ নারীদের ঐতিহ্যগত কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে সম্পর্ক নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ানোর সুযোগ দিয়েছে—যার জন্য তাদের পুরুষ সঙ্গীরা অনেক সময় প্রস্তুত নয়।'

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তরুণ নারী-পুরুষের মধ্যে যে নতুন আদর্শগত বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা স্মার্টফোন যুগের একটি ঘটনা এবং এটি বিশেষ করে অ-স্নাতক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি। এই গোষ্ঠীতে নারীরা বামপন্থার দিকে ঝুঁকেছেন, পুরুষেরা নয়—এবং সম্পর্ক ও জন্মহার দুটোই ভেঙে পড়েছে।

একটি সম্ভাবনা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আবাসন সংকট বা নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক অবস্থান বদলের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার প্রতি মানুষের প্রতিক্রিয়াকে আরও তীব্র ও স্থায়ী করে তোলে। ফলে ধীরে চলা পরিবর্তনগুলো হঠাৎ ঢেউয়ের মতো মনে হয়, অর্থনৈতিক উদ্বেগ বাড়ে এবং অনিরাপত্তা ও উৎকণ্ঠার স্থায়ী অনুভূতি তৈরি হয়—যা সন্তান নেওয়ার ইচ্ছাকে নিরুৎসাহিত করে।

সম্পর্ক ও জন্মহারের ওপর নতুন যোগাযোগপ্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে তত্ত্ব অবশ্য স্মার্টফোন যুগে নতুন নয়।

২০০১ সালে গবেষক রবার্ট হর্নিক ও এমিল ম্যাকঅ্যানানি দেখেছিলেন, জন্মহার কমার সঙ্গে টেলিভিশন মালিকানার সম্পর্ক আয় বা শিক্ষার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।

এক দশক পরে এলিয়ানা লা ফেরারা ও অন্যদের এক গবেষণায় দেখা যায়, ছোট পরিবারকে কেন্দ্র করে নির্মিত টেলিভিশন ধারাবাহিক দেখলে নারীরা কম সন্তান নেন। আর ২০১৮ সালে অ্যাড্রিয়েন লুকাস ও নিকোলাস উইলসন দেখান, টেলিভিশনের মালিকানা দম্পতিদের যৌনসম্পর্ক কমিয়ে দেয়।

যেহেতু স্মার্টফোনের ব্যবহার টেলিভিশনের তুলনায় আরও বেশি এবং আরও একাকী ধরনের, তাই এর প্রভাবও অনেক বড় হতে পারে।

সমাধানের সময়
আধুনিক জীবনযাত্রার গভীরে থাকা এই প্রবণতার মোকাবিলা কীভাবে করা উচিত?

সরকারগুলোকে অবাস্তব সমাধানের লোভ সংবরণ করতে হবে—সর্বোপরি, স্মার্টফোনকে তো আর সমাজ থেকে বিলুপ্ত করা যাবে না। যেমনটি স্টোন বলেন, 'কারও চোখ খারাপ হলে আমরা তার বংশাণু ঠিক করি না: আমরা তাকে চশমা দিই।'

অন্যদিকে, তরুণ দম্পতিদের নিরাপদ ও উপযুক্ত আবাসন দিলে তারা পরিবার গঠনে বেশি আগ্রহী হন—এমন প্রমাণ প্রচুর রয়েছে।

সন্তান নেওয়ার জন্য আর্থিক প্রণোদনা বা 'শিশু বোনাস'ও জন্মহার কমার প্রবণতা কিছুটা ঠেকাতে পারে—তবে সেটি যথেষ্ট বড় হতে হবে।

কিন্তু সরকারি সম্পদ সীমিত। অর্থনৈতিক কারণ একাই জনসংখ্যাগত পতন নির্ধারণ করে না। আর সুখী দম্পতিদের সন্তান নিতে উৎসাহিত করার নীতি হয়তো যথেষ্ট নয়, যখন ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষের সঙ্গীই নেই।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কমে যাওয়া জন্মহার সম্ভবত তরুণদের একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং অবনতিশীল মানসিক সুস্থতার বৃহত্তর সংকটের অংশ।

প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্ভাব্য সম্পর্ক বিবেচনায় নিলে, এই প্রবণতা উল্টে দেওয়ার সবচেয়ে বড় আশা হতে পারে আমাদের ডিজিটাল অভ্যাস পরিবর্তন করা—হোক তা সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে কিংবা সরকারি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

সন্তান নেওয়ার প্রবণতা কমে যাওয়ার বিষয়টি বাদ দিলেও, বিচ্ছিন্ন ও হতাশ এক প্রজন্মকে আবার কাছাকাছি নিয়ে আসাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status