ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
বৃহস্পতিবার ১৪ মে ২০২৬ ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩
স্বামীর মৃত্যু নিয়ে লিখলেন বই, সেই হত্যার দায়েই যাবজ্জীবন শাস্তি হলো মার্কিন নারীর
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Thursday, 14 May, 2026, 12:26 PM

স্বামীর মৃত্যু নিয়ে লিখলেন বই, সেই হত্যার দায়েই যাবজ্জীবন শাস্তি হলো মার্কিন নারীর

স্বামীর মৃত্যু নিয়ে লিখলেন বই, সেই হত্যার দায়েই যাবজ্জীবন শাস্তি হলো মার্কিন নারীর

স্বামীর মৃত্যুশোকে শিশুদের জন্য বই লিখেছিলেন। সেই স্বামীকেই খুনের দায়ে প্যারোল-বিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলো আমেরিকার ইউটাহ-র বাসিন্দা কৌরি রিচিনসের। 

বুধবার কৌরিকে যাবজ্জীবনের এই সাজার রায় দেন বিচারক রিচার্ড ম্রাজিক। খুনের অভিযোগে এটিই সর্বোচ্চ সাজা। কাকতালীয়ভাবে বুধবারই ছিল কৌরির নিহত স্বামী এরিক রিচিনসের ৪৪তম জন্মদিন।

চলতি বছরের শুরুতে টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে এই মামলার শুনানি চলে। ২০২২ সালের মার্চে স্বামী এরিককে বিষ প্রয়োগে হত্যার অভিযোগে ৩৬ বছর বয়সি কৌরিকে দোষী সাব্যস্ত করে আট সদস্যের জুরি। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে, ভালোবাসা দিবসেও এরিককে খুনের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এছাড়াও স্বামীর জীবনবিমা-সংক্রান্ত জালিয়াতি ও প্রতারণার দায়েও তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

সাজা ঘোষণার সময়ে বিচারক ম্রাজিক বলেন, 'যাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তারা মুক্ত থাকলে সমাজের পক্ষে সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।' যাবজ্জীবনের পাশাপাশি অন্যান্য অপরাধের দায়েও কৌরিকে পরপর সাজা খাটার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। 

বিচারক সাজা পড়া শুরু করলে কৌরিকে নিজের আইনজীবীর দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিস্মিত হয়ে ভ্রু কোঁচকাতে দেখা যায়।

সাজা ঘোষণার আগে নিজের তিন নাবালক পুত্রের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ বিবৃতি পাঠ করেন কৌরি। টিস্যু দিয়ে চোখ-নাক মুছতে মুছতে তিনি বলেন, 'তোমাদের বোঝানো হয়েছে যে, তোমাদের বাবাকে খুন করা হয়েছে, আমি তাকে তোমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছি। এ কথা সম্পূর্ণ ভুল। ডাহা মিথ্যা।' 

দীর্ঘ শুনানিতে ওই দম্পতির তিন ছেলের লেখা চিঠি পড়ে শোনান তাদের থেরাপিস্টরা। ছেলেরা বলেছে, মা জেল থেকে ছাড়া পেলে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে ভুগবে। 

মেজো ছেলে (আদালতে তার নাম 'এ.আর' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে) লিখেছে, 'তুমি আমার আর ভাইদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছ। আমি চাই না তুমি জেলের বাইরে আসো। কারণ, তুমি বাইরে থাকলে আমি নিরাপদ বোধ করব না। আমাদের সঙ্গে যা করেছ, তার জন্য তুমি একবারও ক্ষমা চাওনি। আমি চাই না তুমি আর কাউকে আঘাত করো।'

এরিকের পরিবারের অন্য সদস্যরাও বুধবার আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তারাও বিচারকের কাছে কৌরির প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবনের আহ্বান জানান। 

সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলে কৌরি রিচিনসের সাজার মেয়াদ কমানোর আবেদন জানান তার আইনজীবীরা। কৌরির আইনজীবী ওয়েন্ডি লুইস বলেন, বিচারক যদি এমন সাজা দেন যেখানে প্যারোলের কোনো সুযোগ থাকবে না, তবে সেই সিদ্ধান্ত আর বদলানো যাবে না। 

কৌরির স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও বিচারকের কাছে সাজা লঘু করার আবেদন জানান। তারা বলেন, কৌরি একজন 'নিবেদিতপ্রাণ মা' ও 'সহৃদয় প্রতিবেশী'। 

কৌরি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আবেগাপ্লুত নিহত এরিকের প্রিয়জনেরা, ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ। ছবি: ডেভিড জ্যাকসন
কৌরির আইনজীবীরা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালতে আবেদন এবং নতুন করে বিচার শুরুর আবেদন জানানোর পরিকল্পনা করছেন।

বিচারক অবশ্য জানিয়েছেন, ইউটাহ-র বোর্ড অভ পার্ডনস অ্যান্ড প্যারোলের হাতে কৌরিকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যদি অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে বোর্ড নিশ্চিত হয় যে তিনি সমাজের নিরাপত্তার জন্য আর বিপজ্জনক নন, তবেই সেই পথ প্রশস্ত হতে পারে।

কী ঘটেছিল?

২০২২ সালের ৪ মার্চ ভোরে ইউটাহর কামাস-এ নিজের বাড়ি থেকে ৩৯ বছর বয়সি এরিক রিচিনসের মরদেহ উদ্ধার হয়। 

পুলিশকে দেওয়া জবানবন্দিতে কৌরি বলেছিলেন, সেদিন রাতে তার আবাসন ব্যবসার একটি সাফল্য উদযাপন করতে তারা দুজনে মদ্যপান করেছিলেন। এক ছেলে স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়ায় রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ তিনি ছেলের ঘরে ঘুমোতে যান। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর মাস্টার বেডরুমে ফিরে দেখেন, বিছানায় স্বামীর মৃতদেহ পড়ে রয়েছে।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উঠে আসে, এরিকের মৃত্যু হয়েছে ফেন্টানিল ওভারডোজে। তার রক্তে ওই মাদকের পরিমাণ ছিল প্রাণঘাতী মাত্রার প্রায় পাঁচগুণ। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ওই রাতেই কৌরি কৌশলে স্বামীর পানীয়ের সঙ্গে মাদক মিশিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও বিচার চলাকালীন এই তত্ত্বের পক্ষে জোরালো কোনো প্রমাণ পেশ করা যায়নি।

১৩ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণে সামিট কাউন্টি অ্যাটর্নির কার্যালয় ৪০ জনেরও বেশি সাক্ষীকে তলব করেছিল। এই তালিকায় এরিকের পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে মাদক কারবারি, কৌরির প্রেমিক ও এক বেসরকারি গোয়েন্দা ছিলেন। অন্যদিকে আত্মপক্ষ সমর্থনে কোনো সাক্ষীকেই ডাকেনি বিবাদী পক্ষ।

মামলার প্রধান সাক্ষী, কারমেন লাউবার নামক এক হাউসক্লিনার আদালতে বলেন, ২০২২ সালের শুরুর দিকে তিনি কয়েক দফায় কৌরির কাছে বেআইনি মাদক বিক্রি করেছিলেন। কৌরির মুঠোফোনের টাওয়ারের অবস্থান বিশ্লেষণ করেও দেখা গেছে, হত্যাচেষ্টা এবং বিষপ্রয়োগে হত্যাসহ মাদক কেনাবেচার দিনগুলোতে তিনি নির্দিষ্ট ওই সব এলাকার আশপাশেই উপস্থিত ছিলেন।

অন্য সাক্ষীরা বলেন, কৌরি রিচিনসের দাম্পত্য জীবনে 'তিক্ত' হয়ে উঠেছিল। এছাড়া তিনি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন। প্রসিকিউটরদের দাবি, এসব কারণেই স্বামীকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। 

কৌরির প্রেমিক রবার্ট জশ গ্রসম্যান এদিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আদালতে তাদের দুজনের আদানপ্রদান করা অসংখ্য প্রেমালাপের বার্তা জনসমক্ষে আনা হয়। 

স্বামীর মৃত্যুর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে গ্রসম্যানকে এক বার্তায় কৌরি লিখেছিলেন: 'আমি তোমার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কাটাতে চাই। ও (এরিক) যদি শুধু চলে যেত আর তুমি এখানে থাকতে! জীবনটা কত সুন্দর হতো! আমি তোমাকে ভালোবাসি।'

বন্ধুমহলে কৌরির ভাবমূর্তি সফল ব্যবসায়ীর হলেও, ফরেন্সিক অ্যাকাউন্ট্যান্টের তথ্য বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। তার দাবি, কৌরি ঋণের চক্রে এমনভাবে ফেঁসে গিয়েছিলেন যে তার আবাসন ব্যবসা তখন 'ধুঁকছিল'। অন্যদিকে এরিক রিচিনসের নামে প্রায় ২২ লাখ ডলারের একাধিক বিমা পলিসি ছিল। এর মধ্যে একটি বিমার জন্য কৌরি জালিয়াতি করে আবেদন করেছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রসিকিউটর ব্র্যাড ব্লাডওয়ার্থ তার চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপনে বলেন, 'তিনি এরিক রিচিন্সকে খুন করেছেন এবং তার পরেই বিমার টাকা আদায়ের জন্য আবেদন করেছেন।' কেবল এই ঘটনাই নয়, ২০২২ সালের ভালোবাসা দিবসে স্বামীকে বিষ প্রয়োগে হত্যাচেষ্টার অভিযোগেও কৌরি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ওই বিমা পলিসি কার্যকর হওয়ার ঠিক দশ দিন পরেই সেই হত্যাচেষ্টা করা হয়। মামলার নথিতে বলা হয়েছে, সেদিন কৌরির দেওয়া স্যান্ডউইচ খাওয়ার পরেই এরিক দুই বন্ধুকে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তার শরীর খুব খারাপ লাগছে এবং তার মনে হচ্ছে তিনি মারা যাবেন। 

এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

তদন্তকারীরা কৌরির মুঠোফোন ঘেঁটে তার অপরাধী মানসিকতার একাধিক প্রমাণ পেয়েছেন। দেখা গেছে, তিনি ইউটাহর নারী কারাগার, বিমার টাকা আদায় এবং ফোনের তথ্য দূর থেকে মুছে ফেলার বিষয়ে ইন্টারনেটে খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। 

তার সার্চ হিস্ট্রিতে ছিল— 'ফেন্টানিলের কয় ডোজ প্রাণঘাতী', 'কৌরি রিচিনসের সম্পত্তির পরিমাণ কত' এবং 'বিষপ্রয়োগে মৃত্যু হলে ডেথ সার্টিফিকেটে কী লেখা হয়'।

তদন্ত চলাকালীন নিজের উপর থেকে নজর ঘোরাতে কৌরি একটি কৌশলের আশ্রয় নেন বলেও উল্লেখ করেন প্রসিকিউটররা। স্বামীর মৃত্যুর এক বছর পরে তিনি শিশুদের জন্য একটি বই লেখেন। 'আর ইউ উইথ মি?' নামের সেই বইটির বিষয়ে কৌরির দাবি ছিল, বাবার মৃত্যুশোকে ভেঙে পড়া তার তিন সন্তানকে মানসিকভাবে সামলে তুলতেই তিনি এটি লিখেছেন। 

গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০২৩ সালের এপ্রিলে একটি স্থানীয় টিভি অনুষ্ঠানে বইটির প্রচারণা চালানোর সময় কৌরি বলেছিলেন, 'শারীরিকভাবে পাশে না থাকলেও ও (এরিক) আমাদের সঙ্গেই আছে। বাবা এখনও আছে, শুধু তার উপস্থিতির ধরনটা বদলে গেছে।'

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status