|
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কী বার্তা দিচ্ছে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ?
নতুন সময় ডেস্ক
|
![]() ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কী বার্তা দিচ্ছে দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ? সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে পরবর্তী হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে ভারত তার কূটনৈতিক কর্মধারায় একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল। একজন পেশাদার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিবিদকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়ার দীর্ঘদিনের রীতি থেকে বেরিয়ে এসে ভারত হয়ত এটাই বোঝাতে চাইছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিছক আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা আর যথেষ্ট নয়, প্রকাশ্য রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়াও প্রয়োজন। ভারতের জন্য ঢাকা সাধারণ কোনও কূটনৈতিক পদায়নের জায়গা নয়। এখানে কূটনৈতিক মিশনের নেতৃত্ব দিতে দিল্লি বরাবরই ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের সেরা কর্মকর্তাদের বেছে নিয়েছে। ভারতের ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ কৌশল এবং বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতির প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদকে দূত করে পাঠানো তাদের কূটনীতির সুর ও পদ্ধতির ক্ষেত্রে নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। মিস্টার ত্রিবেদীর রাজনৈতিক পথচলাও বর্ণিল ও তাৎপর্যময়। তিনি কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের আমলে রেলমন্ত্রী ছিলেন। পরে তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। শেষে যোগ দেন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বের বিজেপিতে। ফলে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিচরণ করার অভিজ্ঞতা তার হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—যে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বহুবার ভারতের বাংলাদেশনীতিকে প্রভাবিত করেছে; কখনো আবার সীমাবদ্ধ করেছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি, যা দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় বারবার এই চুক্তির উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। ফলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যে সমস্যার সমাধান করা যেতে, তা ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক জটিলতার এক জটিল ধাঁধায় পরিণত হয়েছে। সেই ধাঁধার সমাধান করতে বাংলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে মিস্টার ত্রিবেদীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে। এর ফলে রাতারাতি কোনো অগ্রগতি হয়ত হবে না, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, বিশেষ করে মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ১৮ মাসে দুই দেশের মধ্যে যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কমিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে। মিস্টার ত্রিবেদীকে বেছে নেওয়ার পেছনে তিস্তার বাইরেও বৃহত্তর একটি উদ্দেশ্য রয়েছে, আর তা হল প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার নানা ক্ষেত্র নিয়ে ব্যস্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে আরও গতিশীল করা। শেখ হাসিনার আমলে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জ্বালানি বাণিজ্য, যোগাযোগ প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ওই সময় অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাও বিস্তৃত হয়। তবে ওই ইতিবাচক বাতাবরণের মধ্যেও সীমান্ত উত্তেজনা, বাণিজ্যে ভারসাম্যের অভাব এবং ঢাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যায়ক্রমিক উদ্বেগ অস্বস্তির কাঁটা হয়ে থেকে গেছে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্পষ্টতই আনাড়ি মুহাম্মদ ইউনূস এবং সমভাবে অযোগ্য ও অপরিণত তার সহযোগীদের নেতৃত্ব ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন একটি স্থিতিশীল ও মজবুত সম্পর্কে গুরুতর ধাক্কা দিয়ে গেছে। সে সময় ভারত সম্পর্কে তার প্রকাশ্য মন্তব্যগুলো প্রায়শই ছিল আলঙ্কারিক, যা প্রায় দুই দশক ধরে অনেক যত্নে গড়ে ওঠা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বোঝাপড়ার কাঠামোকে চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় একজন রাজনৈতিক দূত তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারেন। পেশাদার কূটনীতিকরা অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতার বেড়াজালে আটকে যান। কিন্তু মিস্টার ত্রিবেদীর মতো একজন রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারেন, বয়ান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং এমন মাত্রার নমনীয়তা দেখাতে পারেন, যা অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক চ্যানেলগুলোতে থাকে না। বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হতে পারে, যেখানে বাস্তবতার চেয়েও বাইরের প্রভাবের ধারণা অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। সর্বোপরি, নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মিস্টার ত্রিবেদী এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হবেন, যার কথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী শুনবেন এবং খুব সম্ভবত ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও তার তুলনামূলক সহজে যোগাযোগের সুযোগ থাকবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার মন্ডেলকে রাষ্ট্রদূত করে টোকিওতে পাঠিয়েছিলেন। একইভাবে তিনি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্যারিস মিশনের দায়িত্বে রাখেন ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধু পামেলা হ্যারিমানকে। তাদের দুজনেরই হোয়াইট হাউসে সরাসরি যোগাযোগ ছিল, যা তাদের দায়িত্ব পালনে সহায়ক হয়েছিল। ভারতেও এরকম উদাহরণ রয়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার মন্ত্রী মর্যাদায় লন্ডনের ইন্ডিয়া হাউসে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানও ওয়াশিংটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিশনে রাজনৈতিক নিয়োগের পরীক্ষা চালিয়েছে। মালিহা লোধি ওয়াশিংটন, লন্ডন ও জাতিসংঘে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ সরকার আশির দশকে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও সাংবাদিক সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাশিমকে মস্কোতে পাঠিয়েছিল। বাংলাদেশের সাবেক স্পিকার (১৯৯১-৯৬) শেখ রাজ্জাক আলী ২০০০ সালের শুরুর দিকে হাই কমিশনার হয়ে লন্ডনে গিয়েছিলেন। অবশ্য এ ধরনের রাজনৈতিক নিয়োগের ঝুঁকিও রয়েছে। বারিধারায় ভারতীয় হাই কমিশনের সুবিস্তৃত কমপ্লেক্সে বসে কাজ করার সময় মিস্টার ত্রিবেদীর ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। অতিরিক্ত রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা অনেক সময় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে গভীর বিতর্ক চলমান। ফলে তার মেয়াদের সাফল্য শুধু তার কর্মকাণ্ডের ওপর নয়, বরং সেই কর্মকাণ্ডকে কী চোখে দেখা হচ্ছে তার ওপরও নির্ভর করবে। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এ অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে তীব্রতর করেছে। এর জবাবে ভারত সাধারণত সংযোগ, অভিন্ন ইতিহাস এবং ভৌগোলিক নৈকট্যের ওপর গুরুত্ব দেয়। এবার একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিল্লি হয়ত আরও জোরালোভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগ্রহের কথাই বলতে চাইছে, আর সেটা সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে সম্পৃক্ততা গভীর করার মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তিগুলো পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব একটা নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাজনিত প্রয়োজন দুই দেশকে এমনভাবে যুক্ত করে রেখেছে, যা ব্যক্তিবিশেষের নিয়োগের ঊর্ধ্বে। তবে যেটা বদলাতে পারে, সেটা হল সম্পৃক্ততার ধরন। তা হয়ে উঠতে পারে আরও রাজনৈতিক, আরও তাৎক্ষণিক এবং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল। এই পরিবর্তন তিস্তা, বাণিজ্যসংক্রান্ত জটিলতা বা বৃহত্তর কৌশলগত সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব অগ্রগতি আনবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদকে বেছে নিয়ে ভারত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে; তা হল গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা কূটনীতির প্রচলিত রীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে প্রস্তুত। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
ভূরুঙ্গামারীতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর বাড়িতে লুটপাট-অগ্নিসংযোগ, অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি
বাগমারায় ভবানীগঞ্জ দলিল লেখক সমিতির নামে চাঁদাবাজির অভিযোগে বিক্ষোভ
বাঘাইছড়িতে দমকা হাওয়ায় গাছ পালা ভেঙ্গে জনদুর্ভোগ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় যান চলাচল স্বাভাবিক
ফুলবাড়ীতে সামাজিক সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বহুপক্ষীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত
