|
বগুড়ায় অস্থিসার করতোয়ার প্রাণ ফেরাতে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার প্রকল্প
নতুন সময় প্রতিনিধি
|
![]() বগুড়ায় অস্থিসার করতোয়ার প্রাণ ফেরাতে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার প্রকল্প এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ৬ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, প্রায় ১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ করা হবে। বগুড়ার শিবগঞ্জ, সদর, শাজাহানপুর, দুপচাঁচিয়া, আদমদীঘি, গাবতলী, ধুনট, শেরপুর এবং গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জসহ মোট ৯টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। সম্পূর্ণ দেশীয় অর্থায়নে এটি পরিচালিত হবে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে একনেক সভার জন্য ১৭টি প্রকল্পের তালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, করতোয়া নদী পুনঃখনন করা হলে এর সঙ্গে যুক্ত ইছামতী নদী ও গজারিয়া নদী-তেও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরে আসবে। এতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, তীর ভাঙন প্রতিরোধ এবং দখল-দূষণ কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার জানান, বর্তমানে নদীটি প্রায় মৃত অবস্থায় রয়েছে এবং এতে দুর্গন্ধ ছড়ায়। প্রকল্পের আওতায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দুই তীরে বাঁধ নির্মাণ ও কিছু স্থানে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এই নদীপথে খুলনা থেকে নৌকায় পণ্য পরিবহন হতো এবং জেলেদের জীবিকা নির্ভর ছিল নদীটির ওপর। তবে আশির দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের ফলে নদীর উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যায়, যা এর অবক্ষয়ের প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। ![]() বগুড়ায় অস্থিসার করতোয়ার প্রাণ ফেরাতে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার প্রকল্প ইতিহাসখ্যাত করতোয়া নদীর উৎসমুখ গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে জলকপাট নির্মাণের পর থেকে পানিপ্রবাহ না থাকায় নদীমুখ ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে আছে। নদীটির শহরের ভেতরের অংশে যে যেখানে পেরেছে দখল করেছে। ভবনও নির্মাণ করেছেন অনেকে। একদিকে উজানে পানিশূন্যতায় প্রবাহ বন্ধ, অন্যদিকে ভরাট আর দখলের ফলে নদীটি এখন মৃতপ্রায়। বর্ষাকাল ছাড়া পানি পাওয়া যায় না নদীতে। বগুড়া পাউবো সূত্রে জানা যায়, ২০০১ সালে ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে করতোয়া নদীর উন্নয়নে প্রথম উদ্যোগ নেয় সরকার। সে সময় নদীর দূষণ ঠেকানো ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রেখে শহরের সৌন্দর্যবর্ধন ছিল মূল লক্ষ্য। প্রথম ধাপে ২০০২ সালে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীর চেলোপাড়া থেকে নাটাইপাড়া অংশে তীর সংরক্ষণ করে মাটি ভরাট করতে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। পরে সেখানে গাছ ও রোড লাইট স্থাপন করা হয়। এরপর ২০০৬ সালে করতোয়াকে নিয়ে আবার ১৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাবনা দেয়া হয়। তখন পাউবো, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পৌরসভা যৌথভাবে নদী উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের আওতায় নদীর পূর্ব তীরে ১০ দশমিক ৬ কিলোমিটার ও পশ্চিম তীরে ৯ দশমিক ১৭ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়। এ ছাড়া প্রকল্পে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাড়ে ৪৭ কিলোমিটার নদী পুনর্খনন, নদীর বিভিন্ন বাঁকে পানিপ্রবাহ নির্বিঘ্ন করতে আরও এক কিলোমিটার খনন ছাড়াও রাবার ড্যাম নির্মাণ, ঢাল উন্নয়ন, ঘাট নির্মাণ, চারটি জলকপাট (স্লুইস গেট) নির্মাণসহ করতোয়াসংলগ্ন সুবিল খালে ছয়টি বক্স কালভার্ট ও ৪০০টি খুঁটি নির্মাণ করার প্রস্তাব ছিল। দুই বছরের সমীক্ষা শেষে ২০০৮ সালে প্রকল্প প্রস্তাবনাটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এরপর এর আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ২০১০ সাল থেকে ‘করতোয়া বাঁচাও আন্দোলন’-এর ব্যানারে স্থানীয়রা নদী রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু করতোয়াই নয়, দেশের অন্যান্য নদী রক্ষায়ও এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। ২০১১ সালে ‘করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্প’ শিরোনামে নতুন করে উদ্যোগ নেয় পাউবো। পরে ২০১৮ সালে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকল্প প্রস্তাবনা দেন তৎকালীন বগুড়া পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ। এতে করতোয়াসহ বগুড়ার গজারিয়া ও ইছামতী নদী সংস্কারে ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জের খুলসি থেকে বগুড়ার শেরপুর পর্যন্ত করতোয়ার ১১৯ কিলোমিটার নদী উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। তবে এই প্রকল্পটিও পরিকল্পনা কমিশনে গিয়েই মুখ থুবড়ে পড়ে। এদিকে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মৃত করতোয়া নদীর প্রাণ ফেরাতে নতুন করে প্রকল্প হাতে নেয়। এর ফলশ্রুতিতে প্রায় ২৩০ কিলোমিটারজুড়ে নদীটি খননের জন্য ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তাব গ্রহন করে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৪ হেক্টর ভূমি অধিগ্রহণ, ৬ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, প্রায় ১ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ করা হবে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে। বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, গোবিন্দগঞ্জ থেকে বগুড়ার শেরপুর পর্যন্ত পুনঃননের প্রকল্পের চিন্তা করছে সরকার। এখনও এটি একনেকে পাস হয়নি। আগে যে ২৮ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হয়েছিল সেটির কোনো কাজ করা হবে না। কিন্তু বাকি কিলোমিটার কাজ করতে গিয়ে যদি ওই ২৮ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সংস্কার প্রয়োজন লাগে তাহলে সেটি করা হবে। বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, করতোয়া নদী পুনর্খননের মাধ্যমে এর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি নদীর তীর সংরক্ষণ এবং কিছু স্থানে বিনোদন ও শিশুদের খেলার মাঠ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। |
| পূর্ববর্তী সংবাদ | পরবর্তী সংবাদ |
