ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
রোববার ৭ জুন ২০২৬ ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি
দীপক সরকার,বগুড়া
প্রকাশ: Wednesday, 4 June, 2025, 10:56 AM

অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি

অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি

মুসলমানদের ধর্মীয় দ্বিতীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা তথা কোরবানি ঈদের আর মাত্র তিন দিন বাকি। এ ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে বগুড়ার কামার পল্লীর লোকজন। সারাক্ষণ শোনা যাচ্ছে ‘টুং-টাং’ শব্দ। কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত লোহা পিটিয়ে টুং টাং শব্দে দেশী প্রযুক্তির দা, বটি, ছুরি, কুড়াল ও চাপাতি তৈরির কাজ করতে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন কর্মকাররা। জেলার সদর উপজেলা ছাড়াও সারিয়াকান্দি, ধুনট, শেরপুর, নন্দীগ্রাম, গাবতলী, শাহজাহানপুর ও সোনাতলার ক্রেতারাও প্রতিনিয়ত আসছেন এখানকার কামারপল্লী ও বাজারে। প্রায় সবকটি বাজারে কামারের দোকানগুলোতে এমনই দৃশ্য দেখা যায়। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য অনেকে আগে থেকেই অর্ডার নিয়ে রাখা দেশীয় ছোট অস্ত্র বানাতে বেশ উৎসব মুখর ব্যস্ত সময় কাটাতে হতো। কিন্তু এবার অনেকটাই ভিন্ন সুর। এবার দেশীয় তৈরি দা-ছুরির স্থান দখল করেছে বিদেশি ছুরি-চাপাতি। এবারের ঈদে অনেকেই কুরবানি দিচ্ছেন না।

আর এসব কারণেই এবার কামারশালায় নতুন ক্রেতা কম। তবে পুরনো দা-বটি-চাকুতে ধার দিয়ে নিচ্ছেন কুরবানিদাতারা। এছাড়াও অনেকেই সারাবছর অযত্নে, অবহেলায় মরিচা পড়া বটি-দা ও চাকু ধার দিয়ে নিচ্ছেন ভ্রাম্যমাণ সানদারদের কাছ থেকে। একসময়ের সারা বছর ব্যস্ত থাকা কামারশালাগুলো এখন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে পড়েছে; চীন-ভারত থেকে আমদানি করা চকচকে, হালকা ও ধারালো হাতিয়ারগুলোর কাছে। এসব বিদেশি হাতিয়ার তুলনামূলকভাবে দেখতে আকর্ষণীয় এবং দামেও কিছুটা সস্তা হওয়ায় ক্রেতারা সেগুলোর দিকেই ঝুঁকছেন বেশি। শুধুমাত্র কোরবানি ঈদ এলেই প্রাণ ফিরে পান এই শিল্পের সুনিপুণ কারিগররা।

সময়ের সাথে ব্যস্ততা বাড়ে মৌসুমি বিক্রেতাদেরও। ঈদের দু’একদিন আগে শহরের রেলওয়ে ঘুমটির ওপর এবং চাঁদনী বাজার এলাকায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। শহরের যেসব স্থানে পুরোনা পদ্ধতির কামারশালা ছিল তা অনেকগুলো এখন আর নেই। ম্প্রতি সরেজমিনে বগুড়া শহরের বিভিন্ন মোড়, চেলোপাড়া, ১নং রেলগুমটি, ২নং রেলগুমটি, ৩নং রেলগুমটি, কাঁচা লোহার জন্য ভাংড়ি পট্টি, কাঁঠাল তোলা, চেলোপাড়া, কলোনিসহ কয়েকটি এলাকায় বিক্রি হচ্ছে পশুর চামড়া ছাড়ানো, গোস্ত কাটা, জবাই করার বিভিন্ন ধরনের ছোট ও বড় ছুরি, রামদা, চাকু, বঁটি, কাঠের গুঁড়ি। বগুড়ার বাজারে বেশির ভাগই বেচাকেনা হচ্ছে দেশী ছুরি। এছাড়া চীনের ও বার্মার কথা বলে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন নামের প্যাকেট ছুরি। দেশীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন মানের ছোট ছুরি ২০-৬০ টাকা, একটু বড় ১’শ-১৫০, রামদা সাড়ে ৩’শ-৬’শ, বঁটি বিভিন্ন মানের আকারের ৫০-৪’শ, চাপাতি  সাড়ে ৩’শ-৬শ, বড় ধারালো পশু জবাইয়ের ছুরি ৫’শ থেকে ১ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বার্মিজ ও চীনের তৈরি সিলভার রঙের মান অনুযায়ী চকচকে চাপাতি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকায়। চায়না ছোট ছুরি ১’শ, পশু জবাই করার ছুরি ৩’শ-৬’শ, দা ৩’শ থেকে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে।

অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি

অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি

এদিকে শহরের চাঁদনী বাজার এলাকায় রেডিমেট ছুরি বিক্রি হচ্ছে ১শ’ থেকে ৬শ’ টাকায়। সাইজ অনুযায়ী দা বিক্রি হচ্ছে ৩শ’ থেকে ২৫শ’ টাকায়। এখানকার দা-বটি-ছুরি বিক্রির স্থায়ী দোকানদাররাও জানান, প্রতি বছরের মতো এবার এই শিল্পের লোকজন খুব একটা ব্যবসা করতে পারবেন না, কারণ এবার এখন পর্যন্ত মানুষ দোকানে নতুন হাতিয়ার কিনতে খুব একটা ভিড়ছেন না। তবে তারা আশাবাদী ঈদের আগের দিন বেচাকেনা বাড়বে। দোকানের সামনে সারি সারি ছুরি, চাপাতি, দা ও বঁটি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আকার ও ওজন অনুযায়ী প্রতিটির দামও ভিন্ন। ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১৫০ টাকায়, দা ২০০ থেকে ৪৫০ টাকায় এবং বঁটি ২৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। চাহিদা বুঝে অনেক কারিগর আবার কাস্টম ডিজাইনেও সরঞ্জাম তৈরি করছেন।

তবে সদর উপজেলা শহরের মালতীনগরের বকসিবাজার এলাকায় এখনও শ্যামল ও গৌর কর্মকারের কামারশালা এবং বাদুরতলা রেলঘুমটির পশ্চিম পাশে দুলালেরর কামারশালা, সারিয়াকান্দি, শেরপুর, ধুনটসহ অন্যান্য উপজেলা এখনও কয়েকটি কামারশালা টিকে আছে। এর মধ্যে সারিয়াকান্দি উপজেলার কারিগর মোহন কর্মকার বলেন, “ঈদের এক মাস আগে থেকেই কাজের চাপ বাড়ে। তবে ঈদের ১০-১৫ দিন আগে তো কাজের ভিড়ে দম ফেলারও সময় মেলে না। সকাল থেকে রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করেও সব অর্ডার সময়মতো ডেলিভারি দিতে হিমশিম খেতে হয়। সাধারণ সময়ে দিনে ৫-১০টি দা বা ছুরি তৈরি করলেও, ঈদের সময় সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ২০-২৫টিতে।”

মোহন কর্মকার বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষরাও এই পেশায় ছিলেন। আমরাও করছি। কিন্তু এখনকার তরুণরা আগ্রহ হারাচ্ছে। কারণ, কষ্ট অনেক, আয় তুলনামূলক কম। সরকারি সহায়তা পেলে হয়তো এই পেশা আবার মর্যাদা ফিরে পাবে।”নন্দীগ্রাম উপজেলার রবী চন্দ্র কর্মকার বলেন, কোরবানির কাজে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রের মধ্যে নতুন বঁটি প্রকারভেদে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা, দা ১ হাজার থেকে ১২ টাকা, ৮ ইঞ্চি থেকে ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত চাকু তৈরির মজুরি ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। এছাড়া ছোট আকৃতির ছুরি ৫০ থেকে দেড়শ টাকা দামে বিক্রয় হচ্ছে। পুরনো যন্ত্রপাতি শান দিতে ছোট ছুরি থেকে শুরু করে বড় ছুরি ও চাপাতি সান দেয়ার জন্য ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

নন্দীগ্রাম বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত দা-ছুরি বিক্রেতা বিদ্যুৎ কর্মকার বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে লৌহজাত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানো ছুরি প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, দা এক হাজার টাকা থেকে ১৫শ টাকা, বটি ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা, বড় ছুরি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা, চাপাতি ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। ছুরি কিনতে আসা রাজু আহমেদ জানান, ঈদের আর মাত্র ৩দিন বাকি। একটু আগেই পশু জবাইয়ের সরঞ্জাম কিনতে এসেছি। তবে গত বছরের চেয়ে এবার ছুরি, চাকু, বটির দাম অনেকটাই বেশি। দাম বেশি হলেও কিনতে তো হবেই।

অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি

অনেকটাই কম কামারশালায় ব্যস্ততা বগুড়ায় বাজারে দেশি দা-ছুরির জায়গা দখলে বিদেশি চাকু-চাপাতি

অপরদিকে জেলার শেরপুর উপজেলার পৌর শহরের শিশুপার্ক, গোসাইপাড়াসহ উপজেলার বনমরিচা, ভবানীপুর, রানীরহাট, মির্জাপুর, শেরুয়া বাজার, ছোনকা ও সীমাবাড়ি বাজার এলাকায় দা, চাকু, বড় ছুরি বিক্রি শুরু হয়েছে। শেরপুর পৌর শহরের শিশুপার্ক এলাকার কামার বীরেন কর্মকার বলেন, এখন ব্যস্ত সময় পার করছি। এ বছর আশানুরুপ ক্রেতা মিলছে না। শহরের বারদুয়ারী হাটে দা, ছুরি, চাকু ও বঁটির বেচাকেনা চলছে ঢিমেতালে।

দোকানমালিক কালাচাঁদ মহন্ত ও রতন কর্মকার বলেন, এক কেজি ওজনের লোহার তৈরি একটি দা তাঁরা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়, ১২ ইঞ্চি লম্বা চাকু ১৩০ টাকায়, ১০ লম্বা ৫০ টাকায় ও ১ কেজি ওজনের বঁটি তাঁরা ২৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে ব্যয়ের দিক দিয়ে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। কারিগররা জানান, লোহার পাত, কাঠের হাতল, কয়লা ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ। এতে লাভ কমে গেছে বলে জানান অনেকেই।

শেরপুর পৌর শহরের উত্তরসাহা এলাকার শিক্ষক মোজাফ্ফর আলী তার দা এবং পশু জবাই করার ছুরি ধার দিয়ে নিয়েছেন ৫শ’ টাকায়। দাম একটু বেশি হলেও পিটিয়ে কাটার উপযোগী করে নিলাম। বগুড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা  ডা. মো. আনিছুর রহমান জানান, আসন্ন ঈদুল আজহা সামনে রেখে জেলার ১২টি উপজেলার ৭ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪২টি বিভিন্ন ধরনের পশু প্রস্তুত কোরবানিযোগ্য করে তুলেছেন খামারিরা। তবে চাহিদার চেয়ে ৩৮ হাজার ৪৩২টি কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। মজুত পশুর মধ্যে ষাঁড় এক লাখ ৯৩ হাজার ৫৯৯টি, বলদ গরু ৪২ হাজার ৭৪৬টি, গাভি ৮০ হাজার ৪২৬টি, মহিষ দুই হাজার ৩০৪টি, ছাগল তিন লাখ ৮০ হাজার ৬৩২টি ও ভেড়া ৪৭ হাজার ১৪০টি।


পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status