ই-পেপার সোমবার ১৪ নভেম্বর ২০২২
ই-পেপার |  সদস্য হোন |  পডকাস্ট |  গুগলী |  ডিসকাউন্ট শপ
শুক্রবার ১৯ জুন ২০২৬ ৫ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লাচ্ছা সেমাই উৎপাদিত হয় ঈদে বগুড়ায় লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে!
দীপক কুমার সরকার, বগুড়া
প্রকাশ: Thursday, 27 March, 2025, 11:23 AM

প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লাচ্ছা সেমাই উৎপাদিত হয় ঈদে বগুড়ায় লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে!

প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লাচ্ছা সেমাই উৎপাদিত হয় ঈদে বগুড়ায় লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে!

পবিত্র ঈদুল ফিতর আসতে আর সপ্তাহ খানেক বাকী। মুসলিম সম্প্রদায়ের এই বৃহত্তম উৎসব উপলক্ষে সারাদেশের ন্যায় বগুড়ায় বিভিন্ন কারখানায় লাচ্চা সেমাই তৈরির প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে। রমজানের শুরু থেকে তাদের তৈরী এসব প্রসিদ্ধ পণ্য কে কার আগে বাজার ধরতে পারে সে প্রতিযোগিতার কমতি নেই।
আটার সাথে ডালডা অথবা ঘিয়ের মিশিয়ে বিশেষভাবে মোলাম করে তৈরি হয় এক  মিষ্টিজাতীয় খাদ্য। এটির নাম লাচ্ছা  সেমাই। এ খাদ্যদ্রব্য ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন অপূর্ণতার সামিল। এর উৎপত্তি বগুড়ায় না হলেও প্রায় ৫ দশক ধরে এই জেলায় তৈরি লাচ্ছা সেমাইয়ের সুখ্যাতি ছড়িয়েছে সারাদেশে। শুধু দেশই নয় তাছাড়া এবার দেশের বাইরে সৌদি আরব, কাতার, ইয়েমেনে আকবরিয়ার লাচ্ছা সেমাই যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। বাণিজ্যিকভাবে ওসব দেশে বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে। মানুষের চাহিদার সঙ্গে দক্ষ কারিগরের সহজলভ্যতা এই সুনামকে আরও বিস্তৃত করেছে।

বগুড়ার লাচ্ছা সেমাই স্বাদ, গুণগত মান ও খ্যাতির দিক থেকে অন্যসব এলাকার চেয়ে আলাদা। এবার সেই  সেমাই দেশের গ-ি ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লাচ্ছা সেমাই উৎপাদিত হচ্ছে, যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ যাচ্ছে দেশের বাইরে।

শত বছরের ঐতিহ্য বহন করছে বগুড়ার লাচ্ছা সেমাই। এখানকার কারিগররা বিশেষ কৌশলে সুস্বাদু ও মচমচে লাচ্ছা তৈরি করেন। প্রতিটি কারখানায় দৈনিক শতাধিক টন সেমাই উৎপাদন হচ্ছে। এ খাতে প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক নিয়োজিত।

এই সময়টায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনেক মৌসুমী কারিগররা যুক্ত হন। তারা জানান, লাচ্ছা সেমাইয়ের মূল উৎপত্তি পাকিস্তানে। মূলত দেশ স্বাধীনের আগে বিহারীদের হাত ধরে এদেশে লাচ্ছার প্রচলন শুরু হয়। বগুড়ার অধিকাংশ কারিগররা তাদের কাছে থেকেই লাচ্ছা তৈরি শিখেছেন। পঞ্চাশের দশকে সৈয়দপুরে প্রচুর লাচ্ছা তৈরি হতো। সেখানকার কারিগরদের কাছ থেকে শিখে বগুড়ায় চালু করা হয়। এরপর কালক্রমে বগুড়াই হয়ে উঠে উত্তরবঙ্গের লাচ্ছা সেমাই তৈরি ও বিক্রির ঘাঁটি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি সেমাই কারখানা রয়েছে বগুড়া শহরের মাদলা, বেজোড়া, ঢাকন্তা, শ্যাওলাকান্দি, বনানী, সুলতানগঞ্জপাড়া, চেলোপাড়া, নারুলী ও বৃন্দাবনপাড়ায়। চাহিদার কারণে এখন সাদা সেমাই তৈরি হচ্ছে শেরপুর, ধুনট, শাজাহানপুর, কাহালু, নন্দীগ্রাম, শিবগঞ্জ, দুপচাঁচিয়া ও গাবতলী উপজেলায়।
সবমিলিয়ে জেলায় প্রায় চার শতাধিক সেমাই কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে সাদা  সেমাই। অনেকে শুধু দুই ঈদে সেমাই তৈরি করেন। আবার অনেকে সারা বছর কারখানায় সেমাই তৈরি ও বিক্রি করেন। সেমাই উৎপাদনকারীরা বলছেন, প্রতিটি কারখানায় মৌসুমে গড়ে ৪০-৫০ লাখ টাকার লাচ্ছা ও সেমাই বিক্রি হয়। সে হিসাব অনুযায়ী এক মাসে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সেমাই বিক্রির লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট এন্ড কনফেকশনারী দ্রব্য প্রস্তুতকারক সমিতির ‘উত্তরবঙ্গ পরিষদ’ এর তথ্যমতে, বগুড়ায় প্রকারভেদে তিন ধরণের লাচ্ছা সেমাই তৈরি হয়। সয়াবিন, ডালডা এবং ঘিয়ে ভাজা। জেলায় প্রতিবছর রমজান মাসে অন্তত ৪শতাধিক কারখানায় লাচ্ছা সেমাই উৎপাদন হয়। এরমধ্যে ব্র্যান্ডের কারখানা ৮ থেকে ১০টি। যারা গুনগতমান বজায় রেখে মোড়কজাত করে এই সেমাই বাজারে বিক্রি করে। বাকিগুলো ননব্র্যান্ড বা সাধারণ প্রতিষ্ঠান। তারা খোলা এবং বাঁশের খাচিতে করে লাচ্ছা সেমাই বাজারে বিক্রি করেন। এসব ননব্র্যান্ড লাচ্ছা সেমাইয়ের অধিকাংশ ব্যবসায়ীই মৌসুমী। বগুড়ায় তৈরি সাদা সেমাই ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, পাবনা, দিনাজপুর, রংপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলায় সরবরাহ হচ্ছে।

বগুড়ার রাজাবাজার ও ফতেহ আলী বাজার ঘুরে দেখা যায়,  নন ব্র্যান্ডের লাচ্ছা ডালডায় ভাজা প্রতি ৫’শ গ্রাম সর্বনি¤œ ১৮০টাকা থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত ব্র্যান্ডের সয়াবিনে ভাজা লাচ্ছা প্রতি কেজি ১৬০ টাকায় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। ব্র্যান্ডের ডালডায় ভাজা লাচ্ছা ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা, ঘিয়ে ভাজা ৮০০  থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বাজারে। বগুড়ার ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে আকবরিয়া,  চিনিপাতা, শ্যামলী, এশিয়া, ফুড ভিলেজ, কোয়ালিটি, নাহিদ এন্ড নাইম ফুড সহ আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ডালডায় ভাজা, ঘিয়ে ভাজা এবং প্রিমিয়াম কোয়ালিটির লাচ্ছা সেমাই বিক্রি করে থাকে। তিন ধরনের লাচ্ছা সেমাই বিক্রি হয়ে থাকে। ঘি, ডালডা ও সয়াবিন তেলে ভাজা সেমাই। এ ছাড়া এগুলো মোটাদাগে দুভাগে ভাগে বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা। ব্র্যান্ড আর নন ব্র্যান্ড।
রাজা বাজার এলাকার সাদা সেমাই ব্যবসায়ীরা জানান, সময়মতো কারিগর পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও বেশি মজুরি দিতে হয়। তবে ময়দার দাম এ বছর কমেছে। যে কারণে লাভ বেশি হচ্ছে। আর দামের বিষয়টি হচ্ছে শুকানো এবং সেমাইয়ের গুণাগুণের ওপর। তাছাড়া পাইকারি ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো কুরিয়ারের মাধ্যমে সেমাই পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।

বগুড়ার শেরপুর শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার এক ব্যবসায়ী মো. আব্দুল হাবিব বলেন, লাচ্চা সেমাই এবার খুবই মানসম্মত। বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী লাচ্ছা সেমাই পেয়ে ক্রেতারা সন্তুষ্ট। ঘিয়ে ভাজা সেমাই ৮০০ টাকা কেজি। নন ব্র্যান্ড ১২০ টাকা থেকে ২০০ টাকা কেজি।

লাচ্ছা সেমাই বিক্রিতে এগিয়ে রয়েছে বগুড়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠান আকবরিয়া। এ প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই রয়েছে। ডালডায় ভাজা ৪০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেট ১৫০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা।  ঘিয়ে ভাজা ৪০০ গ্রাম ওজনের প্যাকেট সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৩’শ থেকে ৭’শ টাকায়। এশিয়ার ঘিয়ে ভাজা সেমাই বিক্রি হচ্ছে ৮’শ থেকে ১৩’শ টাকা কেজি। শ্যামলীর  ৫’শ গ্রাম সেমাই ৫২০ টাকা। সাদা ১২০ টাকা, ভাজা লাচ্ছা  সেমাই ১৫০ টাকা কেজি, ফুড ভিলেজের ৪-৫’শ গ্রাম লাচ্ছা সেমাই ১২০ থেকে ৪৩০ টাকা প্যাকেট। কোয়ালিটির ঘিয়ে ভাজা ৫’শ গ্রাম ৪০০টাকা আর ডালডায় তৈরী ১৪০ টাকা। খাজা বেকারীর লাচ্ছা সেমাই ৫’গ্রাম ডালডা ও সয়াবিনে ভাজা ১৩০ টাকা, সাউদিয়ার লাচ্ছা ১৫০ থেকে ৪২০ টাকা। আনন্দ লাচ্ছা সেমাই ৫’শ গ্রাম ওজনের দাম ১১০ টাকা, শাম্পা ঘিয়ে ভাজা লাচ্ছা সেমাই ৫’শ গ্রাম ওজনের দাম ৫০০ টাকা ডালডায় তৈরী ১৩০ টাকায়। খোলা অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে ১২০টাকা কেজিতে। এছাড়াও হরেক রকম ব্র্যান্ডের লাচ্ছা সেমাই বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে।

শেরপুর উপজেলার গোপালপুর এলাকায় গড়ে উঠা নাহিদ এন্ড নাঈম ফুডের মালিক আলহাজ¦ মো. হেলাল উদ্দিন জানান, সাদা ও লাচ্ছা সেমাই তৈরি করে উত্তরাঞ্চলে সরবরাহ করছেন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ঈদের আগে সেমাইর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ সময় শ্রমিককে দিনরাত পরিশ্রম করে অর্ডার পূর্ণ করা হয়। তবে এবছর ময়দার দাম কিছুটা কমলেও বাড়তিতে রয়েছে তেল ও ডালডার দাম।

বগুড়ার শ্যামলী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের বেকারি শাখার ব্যবস্থাপক কীর্ত্তণ কুমার দাস বলেন, ডালডা লাচ্ছা আছে ২৪০ টাকা আর প্রিমিয়াম লাচ্ছা ২৬০ টাকা। এটা আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। তবে এবার ঈদ উপলক্ষ্যে বাজার তেমন একটা জমে ওঠেনি। গত বছর দৈনিক আমাদের যেখানে ৮০-৯০ হাজার টাকার লাচ্চা সেমাই বিক্রি হতো। কিন্তু এবার হয়তো একটু বেশী বিক্রি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি দ্রব্য প্রস্তুতকারক সমিতি উত্তরবঙ্গ পরিষদের সভাপতি ও আকবরিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান আলী আলাল জানান, তার বাপ-দাদার পূর্বপুরুষেরা কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন। শত বছর আগে বগুড়ায় আসেন তারা। ওই সময় থেকেই অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি সেমাই তৈরি শুরু করেন। সময়ের ব্যবধানে সেমাই উৎপাদনে বগুড়ার বিখ্যাত দইয়ের মতো ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন তারা। তাইতো বগুড়ার লাচ্ছা সেমাই তৈরিতে দেশসেরা। এখানে প্রচুর দক্ষ কারিগর রয়েছে।

বগুড়ায় ঈদকে ঘিরে দেড় মাস ধরে মৌসুমীসহ অন্তত ৪ শতাধিক ব্যবসায়ী লাচ্ছা উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতি কারখানায় গড়ে ১০ জন করে কারিগর ধরলে জেলায় আড়াই হাজার মানুষ এ কাজে নিয়োজিত। স্থানীয় ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ে অনেক কোম্পানি সেমাই তৈরি করে নিয়ে যায়। লাচ্ছার চাহিদা কমে না, বরং প্রতি বছরই বাড়ে। গত বছরে জেলা থেকে ৪৫০থেকে ৪৮০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। এবার সেই ব্যবসার পরিমাণ অন্তত ৫০০কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। তাছাড়া এবার দেশের বাইরে সৌদি আরব, কাতার, ইয়েমেনে আকবরিয়ার লাচ্ছা সেমাই যাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। বাণিজ্যিকভাবে ওসব দেশে বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে।

জেলা বিসিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক একেএম মাহফুজুর রহমান জানান, বগুড়ায় তৈরি সেমাইয়ের মান উন্নত হওয়ায় ড্যানিশ, বনফুলসহ বেশ কিছু ব্র্যান্ড বিসিক এলাকায় কারখানা স্থাপন করেছে। তারা স্থানীয় দক্ষ কারিগরদের ব্যবহার করে মানসম্মত লাচ্ছা উৎপাদন করছেন। জেলায় প্রায় শত শত কোটি টাকার ব্যবসা হয়। তবে  আগামীতে এই খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ







  সর্বশেষ সংবাদ  
  সর্বাধিক পঠিত  
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ
সম্পাদক : নাজমুল হক শ্যামল
দৈনিক নতুন সময়, গ্রীন ট্রেড পয়েন্ট, ৭ বীর উত্তম এ কে খন্দকার রোড, মহাখালী বা/এ, ঢাকা ১২১২।
ফোন: ৫৮৩১২৮৮৮, ০১৯৯৪ ৬৬৬০৮৯, ইমেইল: info@notunshomoy.com
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি: এমদাদ আহমেদ | প্রকাশক : প্রবাসী মাল্টিমিডিয়া কমিউনিকেশন লি.-এর পক্ষে কাজী তোফায়েল আহম্মদ | কপিরাইট © দৈনিক নতুন সময় সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
DMCA.com Protection Status