১৪ বছরে স্বামীসহ পরিবারের ৬ জনকে হত্যা, নিশানায় ছিল আরও অনেকে
নতুন সময় ডেস্ক
প্রকাশ: Tuesday, 18 May, 2021, 6:49 PM
১৪ বছরে স্বামীসহ পরিবারের ৬ জনকে হত্যা, নিশানায় ছিল আরও অনেকে
কী ঠাণ্ডা দুটো চোখ! কী শান্ত মেজাজ!যাকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না এই মানুষটার মধ্যে ভয়ঙ্কর একটা রূপ লুকায়িত আছে। পুলিশি হেফাজতে জলি জোসেফকে জেরা করতে করতে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিলেন দুঁদে পুলিশ কর্তারাও। স্বামী-সহ নিজের পরিবারের ছ’জনকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া জলির চোখে মুখে ছিল না কোনো অনুসুচনা। প্রতিটা খুনের গল্প সুনিপুণ ভাবে ব্যাখ্যা করে যাচ্ছিল জলি। এতটুকুও ঠোঁট কাপেনি তার। কেরলের কোঝিকোড়ের বাসিন্দা এই গৃহবধূই ভারতের অন্যতম ভয়ঙ্কর নারী সিরিয়াল কিলার।
২০০২ সাল থেকে ২০১৬। এই ১৪ বছরে একের পর এক খুন করে গেছেন জলি জোসেফ। কোঝিকোড়ের এসপি কেজি সিমন জানিয়েছিলেন, জলির নিশানায় ছিল আরও কয়েকজন। ঠিক সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করলে, আরও অনেকের প্রাণ যেত।
জলির প্রতিটা খুনই ছিল পরিকল্পনামাফিক। মৃতদেহ এমন ভাবে রাখা হয়েছিল যাতে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ভ্রম হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই অপরাধ লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল জলি। তার হাবভাবেও কোনওদিন অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। পুলিশ জানিয়েছে, মেধা আর ক্ষুরধার বুদ্ধিই ছিল সিরিয়াল কিলার জলি জোসেফের মূল হাতিয়ার।
কোঝিকোড়ের সম্ভ্রান্ত ক্যাথলিক পরিবারের সদস্য জলি। ৪৭ বছরের এই সিরিয়াল কিলার জানিয়েছেন, প্রথম খুনটা তিনি করেন ২০০২ সালে। প্রথম শিকার ছিলেন তার শাশুড়ি আন্নামা টমাস। ৫৭ বছর বয়সী আন্নাম্মা আচমকাই মারা যান। গোটা ঘটনাটা এমনভাবে সাজিয়েছিলেন জলি যাতে মনে হয় তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কোনো প্রমাণ না থাকায় তদন্ত শুরু হলেও সেটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। তার ঠিক ছ’বছর পর ২০০৮ সালে আন্নাম্মার স্বামী টম মারা যান। বলা হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে টমের মৃত্যু হয়েছে।যে কারণে সন্দেহ হয়নি পুলিশেরও।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, দুটি খুনের মাঝে অনেকটা সময় রাখতেন জলি যাতে পুলিশ কোনও রকম যোগসূত্র খুঁজে না পায়। তবে কথায় আছে পাপ কখনও চাপা থাকে না। সত্যের উন্মোচন একদিন না একদিন হয়ই।
শেষরক্ষা হয়নি জলিরও।জলি তৃতীয় খুন করে ২০১১ সালে। ৪০ বছর বয়সে একই ভাবে মৃত্যু হয় আন্নামা টমাস ও টমাসের ছেলে অর্থাৎ অভিযুক্ত জলির স্বামী রয় টমাসের। এ বার টনক নড়ে পুলিশের। মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।এসময় রিপোর্টে বিষক্রিয়ার বিষয়টি উঠে আসে। তবে সুত্র পেলেও প্রমাণের কমতি থাকায় আর তদন্ত সে ভাবে এগোয়নি। সাইরো-মালাবার গির্জার অধীনস্থ সমাধিক্ষেত্রে তাদের চার জনকেই কবর দেওয়া হয়।
রয় টমাসের মৃত্যুর ঠিক দু’বছর পর, ২০১৬ সালে টমাসের খুড়তুতো ভাই শাজু-র স্ত্রী এবং দু’বছরের মেয়ে অ্যালফনসার মৃত্যু হয়। পর পর মৃত্যুতে বিপর্যস্ত পরিবার এ বার পুলিশের দ্বারস্থ হয়। তদন্ত শুরু হয় জোরকদমে। এরই মধ্যে শাজুর সঙ্গে দ্বিতীয় বার বিয়ে হয় জলির। শ্বশুর রয় টমাসের উইল মাফিক সমস্ত সম্পত্তির উপর নিজের মালিকানা দাবি করে জলি।এসময় বাধ সাধেন জলির দেবর মোজো। তাকেও খুন করে জলি।
এদের সবার মৃত্যুই হয়েছে আকস্মিক ভাবে। সব ক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিল জলি। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক, এতগুলো মৃত্যু নিয়ে কারওরই মনে বড় কোনও সন্দেহের উদ্রেক হয়নি।
সম্প্রতি জলির প্রথম স্বামী রয় থমাসের এক আমেরিকা প্রবাসী ভাই রোজোর সন্দেহ হয়। সেই পুলিশে অভিযোগ করে। তার পর ধীরে ধীরে তদন্তে উঠে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রহস্যের গভীরতা এতটাই বেশি যে, কেরল পুলিশকে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করতে হয়েছিল। সেই সিটেরই এক তদন্তকারী বলেন,‘‘ গল্পের ডঃ জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের বাস্তব রূপ এই জলি।”
রহস্যমৃত্যুর জট খুলতে গিয়ে কবর খুঁড়ে নিহতদের মৃতদেহের ফরেন্সিক পরীক্ষা হয়। তাতে দেখা যায়, মৃত্যুর আগে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু খেয়েছিলেন। প্রত্যেকের শরীরে সায়ানাইডের অস্তিত্ব মেলে।তদন্তকারীরা জানান, প্রতিটা খুনই সায়ানাইড খাইয়ে করেছিলেন জলি। প্রতিটি খুনের সময় জলি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
এ ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে জলির পরিচিত এম ম্যাথিউ এবং প্রাজু কুমারকে।রয়ের দেহে মেলা সায়ানাইডের উৎস খুঁজতে গিয়েই প্রাজু কুমার এবং এম ম্যাথিউ নামে দুজনের হদিশ পায় পুলিশ। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন— গয়না তৈরির কারখানার কর্মী প্রাজু সায়ানাইড পৌঁছে দিত ম্যাথিউয়ের কাছে। ম্যাথিউয়ের কাছ থেকে তা পেত জলি। শুরু হয় জলিকে জেরা। প্রথমে জলি সমস্তটাই অস্বীকার করে। সুলেখা নামে ওই গ্রামেরই এক বাসিন্দা সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, গ্রেফতারের আগের দিনও জলি গোটা দিন তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছে। কোনও সময়তেই তাকে উদ্বিগ্ন মনে হয়নি। তত দিনে জলিকে বেশ কয়েক বার জেরা করেছে পুলিশ।
পুলিশের জেরায় জলি স্বীকার করেছে যে রয় ছাড়াও, বাকি পাঁচজনকে একই ভাবে খাবারের সঙ্গে সায়ানাইড মিশিয়ে মেরেছিল সে। এমন পরিমাণে সায়ানাইড সে দিত, যাতে শরীরে বাইরে থেকে বিষের কোনও লক্ষণ দেখা না যায়। মনে হয় স্বাভাবিক মৃত্যু। নিজের ননদকে একই ভাবে মারার চেষ্টার কথাও স্বীকার করেছে জলি।
কেবল মাত্র পরিবারের মধ্যে নয়। জলির হত্যাকাণ্ডের কথা প্রকাশ্যে আসার পর সেখানকার স্থানীয় কংগ্রেস নেতা পি রামকৃষ্ণনের মৃত্যুর তদন্তের দাবি তোলেন তার ছেলে এম রোহিত। তার দাবি, রামকৃষ্ণণেরও একই রকম ভাবে মৃত্যু হয়েছিল। রোহিত পুলিশকে জানিয়েছেন, তার বাবার রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ছিল। সেই সূত্রে তিনি একটি বিউটি পার্লারে যেতেন। ওই পার্লারে নিয়মিত যাতায়াত ছিল জলিরও। রোহিতের অভিযোগ, তার বাবার মৃত্যুর পিছনেও হাত থাকতে পারে সিরিয়াল কিলার জলির।
সিটের তদন্তকারীদের আশঙ্কা, আরও তথ্য উঠে আসবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু তাঁরা এখনও নিশ্চিত নন, একের পর এক হত্যার মোটিভ নিয়ে। কেন পর পর খুন করেছে জলি? প্রাথমিক ভাবে পুলিশ মনে করেছিল, সম্পত্তির জন্য খুন। কিন্তু পরে সেই মোটিভ জোরাল হয়নি। পুলিশ, জলির মানসিক বিকারের সম্ভবনাও খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের একাংশের ধারণা, খুনের পিছনে মনোবিকার কাজ করতেও পারে। তবে পুলিশ হেফাজতেও জলির অবিচলিত, শান্ত আচরণ অবাক করেছে পুলিশকে।
জলির সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গিয়ে অদ্ভুত কিছু তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। কেরলের উপকূলবর্তী কোঝিকোড় শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে জলিদের কুডাথাই গ্রাম। আশে পাশের আর পাঁচটা গ্রামের মতোই খুব সাধারণ। সেখানকার সবাই এক ডাকে চেনেন জলিকে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজি(এনআইটি)-র শিক্ষিকা হিসাবে তার পরিচয় ছিল এত দিন। জানা গিয়েছে গোটা এলাকা তাকে এনআইটির শিক্ষিকা হিসাবে জানলেও, আসলে জলি বাণিজ্য শাখায় স্নাতক। এনআইটির সঙ্গে তার কোনও যোগ নেই। কিন্তু জলি রোজ সকালে নিজের গাড়ি চালিয়ে কোঝিকোড় চলে যেত। সবাই জানত সে এনআইটিতে যায়।
পুলিশ জানতে পেরেছে নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কিত নথি জাল করেছে জলি। এনআইটি-র জাল পরিচয় পত্রও তৈরি করেছিল। গ্রামের অনেকেই পুলিশকে জানিয়েছেন, জলিকে তারা বিভিন্ন সময়ে কোঝিকোড়ের এনআইটি ক্যাম্পাসে দেখেছেন। কিন্তু জলি যে এনআইটিতে যুক্ত নন, সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত। কিন্তু পুলিশের এখনও অজানা, প্রতিদিন সকালে এনআইটি যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় কাদের সঙ্গে সময় কাটাতো জলি।
এর পাশাপাশি, ভীষণ ভাবে ধার্মিক নারী হিসেবেই গোটা গ্রামে জলির পরিচয় ছিল এত দিন। গোঁড়া রোমান ক্যাথলিকদের বাস ওই গ্রামে। জলি কোনও রোববার গির্জায় প্রার্থনায় যোগ দেয়নি, এমনটা মনে করতে পারেন না কেউ। কিন্তু আচমকাই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো গোটা গ্রাম জানতে পারল, সেই ‘শিক্ষিকা’, ধার্মিক জলিই একে একে নিজের স্বামী, শ্বশুর, শাশুরি-সহ পরিবারের ৬ জনকে হত্যা করেছে। ননদকে খুনের চেষ্টা করেছে। এবং আরও দুই নাবালককেও খুন করার পরিকল্পনা করেছিল সে।